- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

একজন এরশাদ আলী মোড়ল

জাহাঙ্গীর আলম
সময়টা ১৯৭১ সালের ২০ মে। খুলনা জেলার চুকনগর গ্রাম, ভদ্রা নদীর পাড়। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বর্বরতম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল এখানে। একসঙ্গে এ অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার হিন্দু-মুসলমান নর-নারী ও শিশুকে সেদিন হত্যা করেছিল পাক বাহিনী। পাকিস্তানের দোসর এদেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলসামস বাহিনী সেই নৃসংশ হত্যাযজ্ঞে সরাসরি সহযোগিতা করেছিল। চুকনগরের প্রতিটি বাড়ি থেকে সব বয়সের নারী-পুরষকে ধরে এনে দাঁড় করিয়েছিল একটি মন্দিরের সামনে। সেদিন সেই মন্দিরের উঠোন শ্মশানে পরিণত হয়। হত্যাযজ্ঞের একদিন পর সেই শ্মশানে লাশের স্তুপে নিজের পিতাকে খুঁজতে আসেন গ্রামের এক সাধারণ কৃষক এরশাদ আলী মোড়ল। অনেক পুরুষ মহিলার লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি তার পিতার লাশ না পেয়ে চলে যাওয়ার সময় একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ালেন। পেছনে ফিরে এসে দেখেন যে মহিলাদের লাশ পড়ে আছে তার মধ্যে একজন মহিলার বুকের উপর হামাগুরি দিয়ে একটি শিশু দুধ পানের চেষ্টা করছে। তিনি শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন এবং মহিলাটির দিকে তাকালেন । দেখলেন মহিলাটির হাতে ধবধবে সাদা শাঁখা, মাথায় রক্তরাঙা সিঁদুর। বুঝতে বাকি রইলো না মহিলাটি সনাতন ধর্মের। শিশুটির বয়স আনুমানিক ৬ মাস। কন্যা শিশু। তিনি বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সনাতন ধর্মের সাথে মিল রেখে নাম রাখলেন রাজকুমারী সুন্দরীবালা। ঘরের কোণে ঠাকুরঘর উঠানে তুলসী গাছ এবং শেখানো হয় গীতা পাঠ। একই ঘরে মাগরিবের আযান ও উলো ধ্বনি একসাথে হয়। এযেনো মানুষ ও মনবতার এক অমর গাঁথা দৃষ্টান্ত। রাজকুমারী সুন্দরীবালা ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠেন। একসময়  হিন্দুরীতি মেনে এক হিন্দু সম্প্রদায়ের পাত্রের কাছে তাঁর বিয়ে দেন।এই অসাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টান্ত যিনি স্থাপন করলেন সেই মহান মানুষটিকে আমরা বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী-দক্ষিণ এশীয় সাম্প্রদায়িকতা ও সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক কনভেনশনে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করি। জয় হোক এরশাদ আলী মোড়ল ও রাজকুমারী সুন্দরীবালার। জয় হোক অসাম্প্রদায়িকতার, জয় হোক মানবতার। এই মহামানবকে নতশিরে বিন¤্র শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক: সা.সম্পাদক জেলা সংসদ ও সদস্য, কেন্দ্রিয় সংসদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
ও সহকারী সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর।

  • [১]