- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর যুদ্ধস্মৃতি

সুব্রত কুমার দাশ খোকন, শাল্লা
বীর মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ সরকারের বয়স এখন ৭৬। বলরামপুর গ্রামে তাঁর আদিনিবাস হলেও এখন বসবাস করেন সুখলাইন গ্রামে। তাঁর বাবার নাম জগত চন্দ্র সরকার। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শুরুতেই রেডিওতে অনবরত ঘোষণা হতে থাকে পূর্ব বাংলার ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের নির্বিচারে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যা করছে। এ ঘোষণা যখনই তিনি শুনতেন তখনই তাঁর শরীরের রক্ত টগবগ করত। ২৪ বছরের তরুণের পাকিস্তানিদের এ অন্যায় অত্যাচার সহ্য করতে পারছিলেন না। মূলত এ কারণেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।
জগদীশ সরকারের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তিনি বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। মাকে বললে মুক্তিযুদ্ধে যেতে রাজি হবে না, তাই মাকে না বলেই ১৯৭১ সালের জুনের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্যে ভারতে মেঘালয় হয়ে বালাট ক্যাম্পে যান। সেখানে তাঁরা প্রায় তিনশ জন তখনকার বালাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশীষ রায় চৌধুরীর নিকট দেখা করেন। তিনি তাঁদের নিয়ে মেঘালয়ের শিলংয়ের কাছাকাছি মুক্তাপুর সাব-সেক্টর বেইস-এ ভারতীয় ক্যাপ্টেন লাল সিংয়ের কাছে নিয়ে যান। সাব-সেক্টরে তাঁরা একশ জন রিক্রোট হন। লাল সিংয়ের অধীনে ২১ দিন ট্রেনিং নেন। ট্রেনিং শেষে ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর সি.আর দত্তের অধীনে জৈন্তা ও সিলেটে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন।
জগদীশ সরকার বলেন, আমাদের কাজ ছিল গোপনে পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণ করা। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে জৈন্তা আর্মি ক্যাম্প আক্রমণের উদ্দেশ্যে সারা রাত একটি ডোবার মধ্যে জারমুনির ফেনা (কচুরিপানা) মাথায় দিয়ে জলের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ভোর তিনটার দিকে আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়েছি। আমরা আমাদের অপারেশন শেষ করে নিরাপদে চলে আসতে সক্ষম হলেও আমরা আমাদের এক সহযোদ্ধাকে হারিয়েছি। যুদ্ধের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা পাকিস্তানি দালাল মন্ত্রী আসমত আলীকে তার মায়ের অনেক টাকার লোভ দেখানো সত্ত্বেও নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ বাড়িতে ফিরে এসে ১৯৭৩ সালের দিকে আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রাম মুরাদপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খালিয়াজুরিতে শিক্ষকতার চাকুরি নিই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর পূর্ব পরিচিত ১৫ জন আমার বাড়িতে আশ্রয় নেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই লোক জানাজানি হওয়াতে স্থানীয় প্রশাসনের ভয়ে তাঁদের সঙ্গে আমিও প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগদান করি এবং ভারতে গারো হিলসের সাব-ডিভিশনের তোরার কাছে আবারও ট্রেনিং করি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ আরও বলেন, আমাদের ডিফেন্স ছিল ভারতে মহেষখোলার কাছে নেত্রকোনার কলমাকান্দার কেশবপুর গ্রামের আমাদের ডিফেন্স কোম্পানি কমান্ডার সুকুমার সরকারের অধীনে। আমিসহ ৩০০ জনের প্রতিরোধ বাহিনী ভারত বর্ডারের কাছাকাছি থেকে তখনকার বাংলাদেশের জিয়া সরকারের আর্মি, বিডিআর ও পুলিশের বিরুদ্ধে প্রায় এগার মাস প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছি। আমাদের এই প্রতিরোধ যুদ্ধে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দিরাইয়ের নিরানন্দ মারা গেছে। এরপর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর ভারতের ক্ষমতায় আসে মেরারজি দেশাই। ক্ষমতায় আসার পর আমাদেরকে বাংলাদেশের জিয়া সরকারের নিকট হস্তান্তর করে দেয়। বাংলাদেশ সরকার আমাদের ঢাকা দক্ষিণের ইছা নদীর পাড়ে ভারত চলে যাওয়া হিন্দুদের পরিত্যাক্ত বাড়িতে প্রায় ৩ বছর পুর্নবাসন করে। এসময় আমাদের নানা ধরনের ট্রেনিং করানো হয়। মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছি দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে, তারপর মুজিব হত্যার পর প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিয়েছি শেখ মুজিবকে ভালোবাসার কারণেই।
জগদীশ সরকার বলেন, প্রতিরোধ বাহিনীতে যাওয়ার ফলে চাকুরি হারিয়েছি। এরপর আস্তে আস্তে জীবিকার কারণে জমি জামা বিক্রি করে যখন কোনো উপায়ান্তর নেই, তখন শেখ হাসিনা ভাতার ব্যবস্থা করেছেন, ঘর দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ছেলের চাকুরি হয়েছে। প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২০ সালের জানুয়ারিতে হাসিনা সরকার চেকের মাধ্যমে ১ লাখ টাকার অনুদান দিয়েছে। কোনোকিছুর বিনিময়ে নয়, নিজের তাগিদে ও বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে যুদ্ধে গিয়েছি, প্রতিরোধ বাহিনীতে গিয়েছি। তারপরেও বিনিময়ে পেয়েছি অনেক। বর্তমানে একটাই আফসোস শাল্লায় মুক্তিযোদ্ধাদের বসার কোনো অফিস নেই। শাল্লাতে ২০১৬ সালে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েও কতৃপক্ষের গাফলতির কারণে নির্মাণ শেষ না হওয়াতে ভবন এখনও আমাদের নিকট হস্তান্তর হয়নি। কর্তৃপক্ষের বার বার আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে আমাদের আকুতি।

  • [১]