ইকবাল কাগজী
একজন প্রবাসী লিখেছেন, ‘একমাত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব হতভাগ্য কৃষকের কান্না মুছে দিতে পারে’। তাঁর লেখার প্রেক্ষিতটা হাওরাঞ্চলের বিশেষ করে সুনামগঞ্জের সাম্প্রতিক হাওরডুবি। উদ্ভূত ও বিদ্যমান সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান তিনি চান, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এখানে তিনি সত্যিকার অর্থেই অকৃত্রিম ও নিখাদ। দেশের সকল মানুষের কথা জানি না, তবে হাওরপাড়ের কৃষকরা যে এই হাওরডুবিতে ফসলহানির ক্ষতির একটা স্থায়ী সমাধান মনেপ্রাণে চান, এতে কোনও কৃত্রিমতা নেই।
বাঁধভাঙার সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে সুনামগঞ্জের প্রিয় মানুষ এই প্রবাসীর সঙ্গে বোধ করি কারও কোনও দ্বিমত থাকতে পারে না। যদি কারও থাকে তবে তিনি মানুষ নামের অবান্তর। এমন দুর্নীতিবাজ এই দেশে আছে, যে-দুর্বৃত্ত হাওররক্ষা বাঁধের টাকা মেরে বড় লোক হয়ে উঠেছে এবং উঠছে, এবং সে-চায় প্রতিবছর বাঁধের টাকা মেরে খেয়ে আরও বড়লোক হবে এবং সে বৃহৎ পুঁজির মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, যাতে সমাজের সিংহভাগ সম্পদের মালিকানা তার একার ভাগে গিয়ে পড়ে, ‘হতভাগ্য কৃষকের কান্না’ যাতে কোনও দিনই না থামে। কৃষকের কান্না যত বাড়বে তার ততো সুখ বাড়বে। এই জন্য সে নিজের কোলে ঝুল টানার বন্দোবস্ত করতে ব্যস্ত আছে প্রতিনিয়ত। তার পক্ষে যে যতোই গলাবাজি করুন, সে অবশ্যই দুর্নীতিবাজ। এমন দুর্নীতিবাজও বোধ করি উল্লেখিত ‘বাঁধভাঙার সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে’র সম্মুখিন হয়ে দ্বিমত পোষণ করার সাহস করবে না, যদিও মনে মনে গাল পাড়বে।
যে-কোনও বিবেচনায় হাওরে অব্যাহত দুর্নীতি বন্ধের বা এর একটা স্থায়ী সমাধানের প্রশ্নটা স্বাভাবিক, এর একটা সমাধান হতেই হবে। কিন্তু কী উপায়-প্রকারে ? সমাধানের প্রকারটা নিয়েই যতো গ-গোল ও দ্বিমত কিংবা বিরোধিতা। কিন্তু কার্যত হাওররক্ষাবাঁধে দুর্নীতি নির্মূল করার কাজ বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুরূহ এবং কষ্টসাধ্য তো বটেই। মান্যবর প্রবাসী সমাধোনের কাজটা ‘বর্তমান সরকার দলীয় নেতাদের’ উপর ন্যস্ত করতে চান। তাঁর পক্ষ থেকে এটাকে সাধু সিদ্ধান্ত মনে করাটা স্বাভাবিক হতেই পারে। কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তাঁর মতের বিপরীতে ভিন্নমতও থাকতে পারে এবং তাঁর মতামতটাসহ অন্যের মতামতেরও যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করা বিভ্রান্তিসঞ্জাত যে-কোনও ক্ষতি এড়ানোর জন্য জরুরি।
তিনি লিখেছেন, ‘এমনতর প্রাকৃতিক বিপর্যয় তথা জল দানবকে আটকাতে প্রয়োজন বর্তমান সরকার দলীয় নেতাদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোর প্রচেষ্টা।’ খুব উত্তম প্রস্তাব। এই ‘উত্তম প্রস্তাব’-এর মধ্যে যে ‘প্রয়োজন’-এর কথা আছে, সেই সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনটি বাংলাদেশের সরকার আগেই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন। অর্থাৎ ‘সরকার দলীয় নেতাদের নেতৃত্বে’ই ইতোমধ্যেই হাওররক্ষা বাঁধের প্রকল্পগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে, ‘জল দানবকে আটকানো’র প্রচেষ্টায়। খোঁজ নিলে বোধ করি এমন কোনও একটিও পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) পাওয়া যাবে না যে-পিআইসিটি ‘সরকার দলীয় নেতাদের নেতৃত্বে’র নিয়ন্ত্রণের বাইরে অস্তিত্বশীল। সুতরাং প্রবাসী মান্যবরের রূপকল্পানুসারে ‘জল দানবকে আটকাতে’ বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবটি পেশ করার বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই সরকার ‘কৃষকের কান্না’ থামানোর ‘রূপকল্পটি’ কার্যকর করে আসছেন এবং কার্যত সে-রূপকল্পের ব্যর্থতার আড়ালে কৃষক ব্যাপক ও লাগামছাড়া কাঠামোগত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। উদাহরণ দিচ্ছি। একজন লিখেছেন, ‘ধান কৃষকের হলেও তার ফয়দা ভোগ করছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী, খাদ্য প্রশাসন, মিলমালিকসহ একটি গোষ্ঠী। অর্থাৎ সরকার যেমনটি চাইছেÑ খোদ কৃষক তেমনভাবে উপকৃত হচ্ছে না।’ [আলতাফ পারভেজ, ধানচাষের প্রতিবেদন, ঐতিহ্য (রুমী মার্কেট ৬৮-৬৯, প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা -১১০০), মার্চ ২০২১, পৃ. ৬৮]।
বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার সরকার, ১৯৭১-এর পর ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সরকার। শেখ হাসিনার সরকারের জনবান্ধবনীতি যেমন বিভিন্ন চক্রান্তমূলক অন্তর্ঘাতের শিকার হয় বা হয়ে আসছে প্রতিনিয়ত, তেমনি তদানীন্তন বঙ্গবন্ধুর সরকারও সে-ভাবেই চক্রান্তমূলক অন্তর্ঘাতের শিকারে পর্যবশিত হয়েছিল। বর্তমানে হাওররক্ষা বাঁধ যেমন চক্রান্তমূলক অন্তর্ঘাতের শিকার হয়েছে, তেমনি শিকার হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার কার্যক্রম, দেশোন্নয়নের সকল প্রচেষ্টা। উন্নতির দোহাই দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা প্রকারান্তরে পিছিয়ে দিয়েছিল দেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং পিছিয়ে দেওয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়নই ছিল তাদের আদত লক্ষ্য। এই ‘আদত লক্ষ্যে’র আদি অকৃত্রিম একটাই লক্ষ্য ছিল, হালুয়া-রুটির ভাগবণ্ঠন ও লুটপাট করা।
এখনও অতীতের মতোই সরকার দেশের উন্নয়নে ‘বদ্ধপরিকর’। তার প্রমাণ : উপরোক্ত লেখকের উদ্ধৃতিটুকুর পরেই লেখক প্রসঙ্গক্রমে সরকার গৃহীত ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য নীতিমালা ২০১৭’র উল্লেখ করেছেন, এই নীতিমালা সরকারের দেশোন্নয়নের সদিচ্ছারই প্রস্ফোটন। এই নীতির ২টি লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিল : (ক). উৎপাদক কৃষকদের উৎসাহ মূল্য প্রদান এবং (খ). খাদ্যশস্যের বাজার যৌক্তিক পর্যায়ে স্থিতিশীল রাখা। কিন্তু বাস্তব অবস্থাসঞ্জাত পরিপ্রেক্ষিত সাক্ষী, এই দু’টি নীতির কোনওটিই মাঠ পর্যায়ে কার্যত কার্যকর করা সম্ভব হয় নি। সম্ভব হয় নি তো হয় নিই, উল্টো ‘ফায়দা ভোগ করছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী, খাদ্য প্রশাসন, মিলমালিকসহ একটি গোষ্ঠী’। চারপাশের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধাঁচ-ধরণ, গণমাধ্যমের সংবাদ ও সমাজবাস্তবতা থেকে তা সহজেই অনুমেয়। যা হবার তাই হয়েছে, কৃষক সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে ফড়িয়ার কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। ‘ফড়িয়ার কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে’র উদাহরণটি একটি কাঠামোগত বা প্রশাসনিক সহিংসতার উত্তম উদাহরণ। এমন উদাহরণের অভাব নেই বাংলাদেশে, শত শত উদাহারণ আছে, যে কেউ একটু সচেতন হলেই তাঁর দৃষ্টিতে এসব ‘পুকুর চুরি’ মাফিক অপকর্ম ধরা পড়বে অনায়াসে। কখন ও কীভাবে এর শুরু তা অবশ্য ব্যাপক গবেষণার বিষয়। গবেষণা যে হয় নি, এমনও নয়, আমাদের দেশেই কেউ কেউ করেছেন, কিন্তু সেটা এখানে কহতব্য নয়। তবে কাঠামোগত সহিংসতার বিষয়টি বৃটিশ আমল কিংবা পাকিস্তান আমলে যেমন ছিল, তেমন বাংলাদেশ আমলেও রাজনীতিক-আর্থনীতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে আছে বহালতবিয়তেই, কিন্তু কালক্রমে তার রূপ বদল হয়েছে, এখন তীব্রতা বেড়েছে আগের চেয়ে। এর প্রকার প্রকৃতি অনেক, এটি বৈচিত্র্যে বহুরূপী। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে এর ব্যাপকতা ভীষণাকার ধারণ করে, প্রকারান্তরে বঙ্গবন্ধুর গণমুখি কিংবা গণবান্ধব রাজনীতিক ও আর্থনীতিক পদ্ধতির বিপক্ষে অন্তর্ঘাতের নির্মমতায় পর্যবশিত হয়, এমনকি তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- বাংলাদেশে জায়মান কাঠামোগত সহিংসতার সঙ্গে ওতপ্রোত এবং এমন কি এই দেশের অগ্রগতির চাকাকে থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। এ বিষয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বয়ান উদাহরণ হিসেবে আবুল বারকাত-এর লেখা থেকে উদ্ধৃত করা যায়, তিনি লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু সরকার জাতীয়করণকৃত মিল-কল-কারখানা-ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান দক্ষতার সাথে পরিচালনের লক্ষ্যে একদিকে যেমন বিদেশ থেকে (বিশেষত রাশিয়াসহ সমাজতান্ত্রিক বিভিন্ন দেশ এবং প্রতিবেশী ভারত) সংশ্লিষ্ট বহুসংখ্যক বিশেষজ্ঞ-ব্যবস্থাপক এনেছিলেন, অন্যদিকে আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপক এমনকি শ্রমিক নেতাদের জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠান পরিচালনে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ ব্যাপারটি ছিল সময়ের (ঃরসব ভধপঃড়ৎ)Ñ যে সময়টি পাবার আগেই একদিকে মিল-কল-কারখানা পরিকল্পিতভাবেই অস্থিতিশীল করে ফেলা হলো আর অন্যদিকে দেশটাকে টেনে-হিঁচড়ে এমন জায়গায় ঠেলে দেয়া হলো যখন বঙ্গন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে একটা জাতির স্বপ্ন হত্যা হয়ে গেলো।’ (আবুল বারকাত, বঙ্গবন্ধু-সমতা-সা¤্রাজ্যবাদ, মুক্তবুদ্ধি, দ্বিতীয় মুদ্রণ : ২৩ আগস্ট ২০১৫, পৃ. ৯২।) এই তো গেলো অতীতের কথা। বর্তমানেও এই একই প্রক্রিয়া চলছে বিভিন্ন আর্থনীতিক খাত, উন্নয়ন প্রকল্প, রাজনীতির মাঠসহ প্রশাসনের অন্দরে-বন্দরে ভিন্ন ভিন্ন উপায় ও প্রকরণে। দৃষ্টান্তস্বরূপ কৃষকের সবজি বাজারজাতকরণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যাক। এ ক্ষেত্রে কী হচ্ছে ? বিস্তারিত বিবরণের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। বিষয়টা অদ্ভুতভাবে বেশি মোটা দাগে স্পষ্ট ও বেশি জনবোধ্য।
পত্রিকায় এমন খবর বেরিয়েছে, যার মর্মার্থ হলো : ঢাকার বাজারে গাড়ি থেকে সবজি নামানোর পরই দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সারা দেশেই এমনটা হয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারির ২০২২ তারিখের দৈনিক প্রথম আলোর একটি সংবাদশিরোনাম ছিল, ‘পাইকারি ও খুচরা বাজার ॥ ঘাট পার হলেই সবজির দাম বেড়ে দ্বিগুণ’। সংবাদবিবরণীতে লেখা হয়েছে, ‘যে টমেটো নদীর খেয়াঘাটে ১০ টাকা কেজি, তা ঘাট পেরিয়ে বাজারে উঠলেই বেড়ে হয় ৩০ টাকা। দামের এ অস্বাভাবিক পার্থক্য প্রায় সব ধরণের সবজিতে। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল বলে খ্যাত শ্রীপুর উপজেলার সবচেয়ে পুরনো হাট বরমী বাজারে এমন অবস্থা ছিল গতকাল বুধবার।’ বলা বাহুল্য, এই বাড়তি দামটা কৃষক পায় না। এইভাবে কৃষক ঠকে, দিনে দিনে গরিব হয়, শেষে ভূমিহীন।
অর্থনীতির এই প্রক্রিয়া কাঠামোগত প্রকরণে চলতেই থাকে। এমনকি প্রক্রিয়াটি বাজারে এক দঙ্গল মুনাফা অর্জনকারি বণিকের সম্মিলন ঘটিয়ে চক্র (সিন্ডিকেট) তৈরি করে, আলতাফ পারভেজ এই চক্রকে ‘চেইন’ বলে উল্লেখ করেছেন। ‘ধানচাষের প্রতিবেদন’ বইয়ে প্রক্রিয়াটার উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “বীজ, কীটনাশক, সার, পানি, কৃষি যন্ত্রাংশ খাতে প্রতি বছর ২৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ স্থানান্তর শেষে কৃষকের উৎপাদিত ধান থেকে মুনাফা সংগ্রহ করে থাকে ফড়িয়া থেকে রাইসমিল মালিক পর্যন্ত বিশাল এক ‘চেইন’।” (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭)। কালক্রমে এর পরিণতিতে কৃষক ধানচাষে ক্রমাগত লোকসানের শিকার হতে হতে ফতুর হয়ে পড়ে। এই বইয়ের এক জায়গায় এই পরিণতিকে ‘ধানচাষির সম্পদ অচাষিদের দিকে প্রবাহিত হওয়ার একটা কাঠামোগত প্রক্রিয়া’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯।) হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং দেশের ভেতরে সর্বত্র কাঠামোগত সহিংসতার চর্চা অব্যাহত রেখে শেষ বিচারে ‘বর্তমান সরকার দলীয় নেতাদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোর প্রচেষ্টা’ কোনওভাবেই হাওররক্ষা বাঁধে জায়মান বা চলমান দুর্নীতিকে প্রতিরোধ করবে না। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা কাঠামোগত সহিংসতার চর্চা থেকে এখনও নিজেদেরকে বিরত রাখতে সমর্থ নন। অর্থাৎ কাঠামোগত সহিংসতার মূল সমাজের মাটি থেকে উৎপাটন করতে না পারলে কোনও সরকারই এই হাওরদুর্নীতি কেন, কোনও দুর্নীতিকেই উৎখাত করতে পারবে না, সেটা শেখ হাসিনার জনবান্ধব সরকারই হোক বা বঙ্গবন্ধুর গণবান্ধব সরকারই হোক।
প্রবাসী প্রাবন্ধিক বলেছেন, ‘… আমাদের যে প্রস্তুতি ছিল তা যথেষ্ট নয়। এসব মান্ধাতার আমলের প্রস্তুতি দিয়ে আধুনিক কালের প্রাকৃতিক জলদৈত্যকে কোন ভাবেই আটকানো যাবে না।’ এই বক্তব্যের কোনও সরলার্থ নেই, আছে নিহিতার্থ ও নির্গলিতার্থ। বিষয়টা একটু জট পাকানো তো বটেই ? একটু বিশ্লেষণ নেহাত জরুরি। জলের তোড়-চাপ নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতিটা ছিল, তিনি স্বীকার করছেন। তাঁকে ধন্যবাদ। কিন্তু বলেছেন, ‘তা যথেষ্ট নয়’। অর্থাৎ প্রস্তুতিটা যে পরিমাণে বা যতটুকু পরিমিতিতে অর্থাৎ জলের চাপের মুখে বাঁধ টিকে থাকার জন্যে যেমনটা হওয়া দরকার তেমনটা হয় নি এবং তাঁর মতানুসারে এই প্রস্তুতি ‘মান্ধাতার আমলের’ এবং তাঁর নিশ্চিত সিদ্ধান্ত ‘মান্ধাতা আমলের প্রস্তুতি দিয়ে আধুনিক কালের প্রাকৃতিক জলদৈত্যকে আটকানো যাবে না’। প্রবাসী মহোদয়ের প্রদত্ত তত্ত্বমতের প্রাথমিক বিশ্লেষণটা দাঁড়ালো এই এবং আপত্তিটা এখানেই।
পাউবো আর পিআইসি মিলে যা হয়, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞাতা যে-জনের আছে তিনি কখনই প্রবাসী সজ্জনকে সমর্থন করবেন না। তিনি বলবেন, প্রস্তুতিটা মান্ধাতার আমলের নয়, বরং যথেষ্ট ও আধুনিক, তদুপরি শতভাগ কার্যকর, অপরদিকে জলদৈত্য আধুনিক নয় বরং চিরন্তন, আদিম ও অকৃত্রিম। প্রিয় প্রবাসীজনের বক্তব্যের বাক্যান্তর্গত অর্থ বা নিহিতার্থ একটাই, বাঁধ ভাঙার কারণ হলো সরকারি প্রস্তুতির উনতা বা ঘাটতি-কমতি। তিনি সরাসরি প্রস্তুতির উনতাকে বাঁধভাঙার কারণ হিসেবে হাজির করছেন, দেখছেন না যে, সরকার বাঁধনির্মাণের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। বাঁধের উচ্চতা, উপরের প্রস্ত, নীচের প্রস্ত, দু’পাশের ঢাল কত হবে তা নির্দিষ্ট করা আছে এবং বাঁধে দুরমজ করতে হবে, ঘাস লাগাতে হবে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। এইসব নিয়মনীতি পালন করে বাঁধ নির্মাণ করলে, একরকম নিশ্চিত হয়েই বলা যায়, তথাকথিত ‘জলদৈত্য’র বাঁধ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না, তখন বাঁধ ভেঙে দিতে হলে মানুষকেই দৈত্য রূপে আবির্ভূত হতে হবে। সরকার নির্দেশিত নির্দেশনা না মানলে বাঁধ তো ভাঙবেই। নির্দেশনাগুলো প্রকৌশলীদের প্রযুক্তিগত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানসঞ্জাত, তদুপরি বন্যা প্রতিরোধের প্রশ্নে প্রাযুক্তিক সক্ষমতাসম্পন্ন ও পরীক্ষিত। এই সব কীছু বিবেচনা করে হাওরে বাঁধনির্মাণ প্রকল্প প্রণীত হয়েছে, প্রকল্প যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৩০ কোটির মতো টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত নিয়ম মানলে কোনও বাঁধাই প্রলয়ঙ্করী বন্যা ব্যতীত সহজে ভাঙার কথা নয়। পরিতাপের বিষয়, প্রবাসী সুজন বাঁধভাঙার পেছনে বাঁধনির্মাণে অনিয়ম, গাফিলতি ও বরাদ্দের টাকা মেরে দেওয়ার কারণকে দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি যে-কারণটাকে দেখতে পাচ্ছেন না সে-কারণটাই আসলে বাঁধ ভাঙার আদত কারণ। তাঁর বক্তব্যের বাক্যান্তর্গত অর্থের অতিরিক্ত অর্থটিই হলো, বাঁধ ভাঙার আদত কারণ, যে-টি তাঁর বাক্যবিস্তারের নিহিতার্থ নয়, কিন্তু নির্গলিতার্থ।
পরিশেষে বলি, প্রবাসী প্রিয়জনের বক্তব্যের নির্গলিতার্থটার আর একটি বঙ্কিমার্থ আছে। সেটি হলো : তাঁর বক্তব্য তাঁর নিজের অজান্তেই এবং হাওরবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস এই যে, তাঁর নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে হাওররক্ষা বাঁধের জন্য প্রকৃত দোযীদের দোষী সাব্যস্ত করতে পারে না। প্রকৃতপ্রস্তাবে যেখানে তিনি দুর্নীতিবাজদের পক্ষের কেউ নন, বরং দৃঢ়তার সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধাচরণ করেন।
সুনামগঞ্জ ॥ ১০.০৪.২২