- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

একটি শুঁটকি-আমের কথা

ইকবাল কাগজী
কবি আম কিনলেন, দেখাদেখি আমিও
কবি কুমার সৌরভের সঙ্গ আমার জন্যে প্রিয় ও প্রীতিপ্রদ। একটি নির্দিষ্ট মানে তাঁর সঙ্গে তর্ক চলে, যা আসলেই বিরল একটি মাত্রাসূত্রে বাঁধা। তর্কবিতর্কে সময়টা কী করে পেরিয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। গত সপ্তাহ দুয়েক আগে তাঁর সঙ্গ নিয়ে রাত সাড়ে আটটার পর বাসায় ফিরছিলাম। পিটিরপিটির বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল, আলফাত চত্তরে থাকতেই। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত কবি এখনও পুরো সুস্থ হয়ে ওঠেন নি, স্ট্রেচার নির্ভরতা তাঁকে দিয়েছে শম্ভুক গতি। তবু সান্ত¡না এই যে কবি তো চলতে ফিরতে পারছেন। আমি তাঁর পাশে থেকে মাথায় ছাতা ধরে রেখেছি। দুজনেই বৃষ্টির হামলা থেকে বাঁচতে চেয়ে কেউই পুরোপুরি রেহাই পাচ্ছি না, কাক ভেজা হয়ে পড়ছি আর মনে মনে বৃষ্টির বাপান্ত করছি। কবি আম কিনতে চাইলেন, কিনলেন এক কেজি। আমি তাঁর দেখাদেখি কিনলাম আধ কেজি, তেমন দরকার ছিল না তবু। আমি সাধারণত বাজার থেকে কেনা ফল খাওয়া যতোটা পারি পরিহার করে চলি। বাসায় এসে দেখি একটা আম একট ুপচাপচামতো নরোম কিন্তু ঠিক পচা নয়। ছোট ছোট চারটি আমের মধ্যে এটিকে খেতে মন চাইল না, পড়ে রইল যেমন রেখেছি তেমন। কয়েকদিনে বেশ একটু শুঁকিয়ে গিয়ে আমসি আমসি হয়ে উঠলো আমটি কিন্তু অবাক কা- পচে গেলো না। সন্দেহ বশত আমি আমটিকে সযতেœ সংরক্ষণ করলাম। দেখি কী হয় ? সপ্তাহ দুয়েক পেরিয়ে গেলে আমটির ছোলা কালচে ও একটু কাঠ কাঠ শক্ত হলো বেটে কিন্তু পচে গিয়ে নরোম হয়ে উঠলো না, বলা যায় শুঁটকি হলো।
শুঁটকি-আমের কথকতা
আমের আমসির কথা বোধ করি সকলেই শুনেছেন বা কেউ কেউ খেয়েছেনও। এবার শুনুলেন আমের শুঁটকি কিংবা শুঁটকি-আমের কথা। কিন্তু আগেই বলে রাখি, আম খাবেন কিন্তু শুঁটকি-আম খাবেন না কিন্তু, যদি পেয়ে যান। শুঁটকি-আম অবশ্যই খুব দুর্লভ দ্রব্য, সচরাচর পাওয়া যায় না। তবে আগেই বলেছি, আমার বাসায় একটি শুঁটকি-আম আছে, আমি বিশেষ যতেœ সংরক্ষণ করে রেখেছি, কেউ এলে দেখিয়ে দিতে পারবো। আর যিনি দেখবেন তাঁর জীবনে সেটা হবে নবমাশ্চর্য দরশনের মতো চমকপ্রদ ঘটনা। আর একটি কথা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বলে রাখছি, আম খাবার আগে অবশ্য অবশ্যই মনে রাখবেন, আম যেনো ফরমালিনমুক্ত হয়। ফরমালিনযুক্ত একটি আস্ত আমই কেবল সাধারণত শুঁটকি-আম হতে পারে। আবার বলেছি, আমার বাসায় তার নমুনা আছে। সুতরাং শুঁটকি-আম হবার সম্ভাব্যতাপূর্ণ-আম খাওয়া কীছুতেই সঙ্গত নয়। সঙ্গত নয় এই কারণে যে, লোকে বলেন, ফরমালিন মেশানো যে-কোনও খাদ্য শরীর-স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ রকমের ক্ষতিকর। আমি চিকিৎসক নই, এ বিষয়ে দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের কী অভিমত আমি জানি না। তবে আমার বাসায় সংরক্ষিত শুঁটকি-আমটি প্রতিপন্ন করছে যে, আমাদের সম্মানিত চিকিৎসকরা জানেন যে, ফরমালিনযুক্ত খাদ্যসামগ্রীর পক্ষে মানুষের শরীর-স্বাস্থ্যগত কোনও ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা নেই, অথবা এ বিষয়ে তাঁরা মোটেও অবগত নন, তাঁরা কোনও না কোনওভাবে নিশ্চিত যে ফরমালিন খেলে মানুষের স্বাস্থ্যের কোনও ক্ষতি হয় না। আর যদি তাঁরা, ‘ফরমালিন খেলে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়’ এই তথ্যটি অবগত থাকেন অর্থাৎ ফরমালিনের দ্বারা মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার বিষয়টি তাঁদের অবগতি ও শিক্ষাভিজ্ঞানের মধ্যে থাকে, তা হলে আমার প্রশ্ন হলো, আমার বাসায় শুঁটকি-আমটি আম থেকে কী করে শুঁটকি-আম হতে পারলো কিংবা কী পদ্ধতিতে ফরমালিন আমের ভেতরে প্রবিষ্ট হয়ে বাজারজাত হয়ে শেষে আমার বাসায় এসে উপস্থিত হলো ?
আমার কাছে এর একটাই উত্তর আছে। চাড্ডায় বসে প্রসঙ্গক্রমে বিষয়টি উত্থাপিত হলে দুর্মখ বলে বিখ্যাত আমাদের চাড্ডাচত্বরের বীর বাতেলা পীর বললেন, “সাধারণ মানুষ ফরমালিন খেয়ে অসুস্থ হলে চিকিৎিসকদের কাছে যাবে, তাঁরা মানুষের অসুখ নিয়ে বাণিজ্য করবেন এবং ঔষধপ্রস্তুত সংস্থাসমূহের লাভ সুনিশ্চিত হবে, চিকিৎসাসেবার নামে ঔষষ নিয়ে বাণিজ্যই তাঁেদর একমাত্র ফিকির।” চিকিৎসকরা তা অস্বীকার করতে পারেন, প্রয়োজনে বীর বাতেলা পীরের বিরুদ্ধে তাঁরা আদালতে যেতে পারেন, মানহানির মামলা রজু করতে পারেন। সেটা করার স্বাধীনতা তাঁদের আছে। কিন্তু আমি বলবো, বীর বাতেলা পীরের চাড্ডাবাতেলার মধ্যে সত্যের কীছুটা হলেও উপস্থিতিকে একেবারে অস্বীকার করা যায় কি ? বর্তমান ফলবাজারের সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে সেটাকে (ফলে ফরমালিন আছে) অস্বীকার করা হবে সত্যকে পায়ে ঠেলে মিথ্যাকে আলিঙ্গন করার নামান্তর। বীর বাতেলা পীর মনে করেন, দেশে চিকিৎসকরা থাকতে কেন তাঁরা ফল-সবজি ও মাছ-মংাস ইত্যাদিতে ফরমালিন মেশানোর প্রতিবাদ করবেন না ? মানুষকে সুস্থ রাখার ব্রতই যদি তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য হয়, তা হলে সরকারকে কেন তাঁরা খাদ্যসামগ্রীতে ফরমালিন মেশানো প্রতিরোধ করতে বাধ্য করছেন না ? এর (ফলে ফরমালিন দেওয়া) প্রতিবাদে তাঁরা অন্তত প্রশাসনের যে অংশের লোকদের গাফিলতির কারণে ফলে কিংবা অন্য কেনও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মেশানো সম্ভবপর হচ্ছে তাঁদেরকে চিহ্নিত করে চিকিৎসা করবেন না বলে ঘোষণা দিতে পারেন। তাছাড়া সরকার বাজারজাত হওয়ার আগেই ফরমালিন মেশানো ফল পরিবহণকারি যানগুলোকে আটকে দিতে পারেন সহজেই, সড়কে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি জনবলকে কার্যকর পদ্ধতিতে কাজে নিয়োজিত করে। এই কার্যকর পদ্ধতির ভেতরে উৎকোচ গ্রহণপূর্বক ফরমালিনযুক্ত পণ্য বহনকারি পরিবহণযান ছেড়ে দেওয়ার প্রচলিত প্রকাশ্য গোপন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত নয় ধরে নিতে হবে এবং এটা অবশ্যই যে-করেই হোক প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে।
আমের পরিণতি শুঁটকি-আম হওয়ার কারণ কী ?
পাঠককে বোধ করি আওয়াজ দিয়ে আমের এই শুঁটকি হয়ে পড়ার কারণ সম্পর্কে অবহিতকরণের কোনও প্রয়োজন নেই। কানার মনে মেনে জনার মতো আমরা সকলেই এর কারণ জানি। তারপরেও দৈবাৎ কারও যদি কারণটি জানা না থাকে, কেবল তাঁর জন্যে বলছি, উক্ত (আমার বাসায় সংরক্ষিত) আমটির মধ্যে ফরমালিন দেওয়া আছে। এখানে আমার একটি বিজ্ঞতার বিষয়ে স্বীকারোক্তি প্রদান উচিৎ হবে বলে বিবেচনা করছি, আর সেটি হলো : সাধারণ জ্ঞানের সহায়তায় আমি জানি যে, ফরমালিন পচনরোধক পদার্থ, কোনও পচনশীল পদার্থে ফরমালিন মেশালে সে পদার্থটি আর পচে না। সে জন্য একটি আমের শূঁটকি-আমে পরিণত হওয়ার রহস্যটি আমার কাছে সহজেই বোধগম্য হচ্ছে।
আমটিতে ফরমালিন আছে কিনা নেই সেটা আমি পরীক্ষা করাই নি। শুনেছি প্রয়োজনে পরীক্ষা করানোর সরকারি ব্যবস্থা আছে। কিন্তু পরীক্ষা না করালেও আমার দৃঢ় বিশ^াস এতে ফরমালিন দেওয়া আছে, বা পরীক্ষা করালে ফরমালিন পাওয়া যাবে। ফলবিক্রেতা অথবা বাগানমালিক আমটিকে নির্ঘাত ফরমালিনে চুবিয়ে তারপর বাজারজাত করেছে। খাদ্যপণ্যে ফরমালিন আছে কি না নেই সে পরীক্ষায় নিযুক্ত সরকারী সংস্থা আমার বাসায় সংরক্ষিত আমটিতে ফরমালিন আছে কিনা নেই তা পরীক্ষা করতে পারতেন, আমটি বাজারজাত করার আগে কিংবা আমি আমটি ক্রয় করার আগে। দেশে এমন কোনও কার্যকর ব্যবস্থা যে নেই তা সহজেই বুঝাই যাচ্ছে বা ব্যবস্থা থাকলেও সে-ব্যবস্থা অথর্ব হয়ে বসে আছে এবং জনগণের করের টাকায় বেতন পরিশোধের মাধ্যমে তাঁদের পকেট টাকায় ভরে উঠছে। সুতরাং যা হবার হোক তাতে তাঁদের কীছু যায় আসে না। তাঁদের তো তঙ্কা লাভে কোনও কমতি হচ্ছে না। পুঁজির পূজা সুচারুরূপে সম্পন্ন হলেই হলো, এতেই জীবন ধন্য।
ফলে ফরমালিন দিলে কী হয় ?
ফলে ফরমালিন দিলে নাকি অনেক কীছই হয়, আমি কেবল এইটুকু জানি, সুনির্দিষ্টভাবে কীছুই জানি না। এই অনেক কীছুর হওয়ার মধে একটি হলো ফলে পচন না ধরা, সেটার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমি পেয়েছি। আমার ঘরে রক্ষিত আমটি আমার দৃষ্টিসীমায় এসে সে সত্যটি বার বার আমাকে জানান দিচ্ছে। ফল সহজে পচনশীল পণ্য, সকলেই জানেন, ফলবিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই জানেন। টাটকা ফল দুয়েক দিনের মধ্যেই পচে যেতে পারে। তাই দেকানী ফলটিকে পচনের হাত থেকে রক্ষার ‘মহৎ’ কাজে কোমর বেঁধে লেগে পড়েন। ফল পচে গেলে বিক্রি করা যাবে না, তাঁর লোকসান হবে। লোকসান দেওয়া যাবে না, লাভ অবশ্যই করতে হবে। মুনাফানির্ভর মুক্তবাজারব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক। পুঁজিবাদের এটাই নিয়ম। এই নিয়ম ভঙ্গ করা যাবে না। এই লাভের লোভে জীবনরক্ষাকারি ঔষধে পর্যন্ত ঔষধনির্মতাসংস্থা ভেজাল মিশিয়ে দিতে কসুর করে না এবং প্রকারান্তরে মানুষ খুনের অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। খুন বলছি এজন্য যে, ভেজাল ঔষধ সেবন করে লোকেরা সুস্থ না হয়ে আরও অধিক হারে অসুস্থ হয় এবং অচিরেই পটল তোলে।
গেলো ফলে পচন না ধরার প্রসঙ্গ। কিন্তু একটি প্রশ্ন উঠে এলো। ফলে পচন না ধরলে কী হয় ? অর্থাৎ ফলে ফরমালিন দিলে কী হয় ? আমি জানি সেটা টাটকা থাকে, তরজাতা মনে হয়। ক্রেতাদেরকে সহজে ঠকানো যায়। পচন না ধারার জন্যে দোকানীর লোকসান হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই থাকে না। আর কী কী হয় ? আমি সে-সবের উত্তর জানি না। উত্তর জানেন চিকিৎসক। উত্তরটা আমার জানা না থাকলেও লোকদেরকে বলতে শুনেছি, ফরমালিন মানুষের স্বাস্থের পক্ষে ক্ষতিকর। এই ক্ষতিটা কেমন সেটা চিকিৎসক জানেন। আমার সে ব্যাপারে একেবারেই জানা নেই, আমি তো চিকিৎসক নই। তো কী করা ?
হঠাৎ মনে হলো গণকযন্ত্রের (কম্পিউটার) শরণ নিলে কী হয় বা কেমন হয় ? সেখানে তো সবজন্তা প-িত গোগল আছেন। গোগলের জ্ঞানভা-ার সন্তরণ সম্পন্ন করে জানা গেলো, “… খদ্যদ্রব্য গ্রহণের পর বিপাক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট বর্জ্য উপাদানগুলোকে ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্র ও কিডনির মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেওয়ার কাজ করে মানুষের লিভার। কিন্তু সে ফরমালিনে আক্রান্ত কোষগুলোকে শরীর থেকে বের করে দিতে পারে না। ফরমালিনের কারণে লিভার থেকে বের হওয়া এনজাইমগুলো নষ্ট হয়। এর ফলে লিভার ও কিডনির উপর চাপ পড়ে। পরিণতিতে লিভার সিরোসিস হতে পারে। কিডনি নষ্ট হতে পারে। ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকে। খাদ্যে খুব সামান্য পরিমাণ ফরমালিন মানুষের শরীরের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। ফরমালিন মেশানো ফল বা মাছ-মাংস অনেক দিন ধরে খেলে লিভার ক্যানসার, হার্টের অসুখ, কিডনি নষ্ট প্রভৃতি হতে পারে।” মানবদেহে প্রবিষ্ট ফরমালিনের ক্ষতি নিয়ে এতো কীছু জানার পর আমার তো একেবারে সুকুমার রায় হয়ে গিয়ে ‘মাথায় কতো প্রশ্ন আসে দিচ্ছে না কেউ জবার তার’ অবস্থা।
ফরমালিন খাওয়া মানে মুনাফার পদতলে আত্মসমর্পণ
আমরা প্রতিনিয়ত মাছ-মাংস, ফল-মূল, শাক-শবজি খাচ্ছি। বাঁচার তাগিদে এসব খেতেই হচ্ছে এবং খাওয়া বন্ধ করা যাবে না এবং আমার মনে হচ্ছে বাজারজাতকৃত এসবের মধ্যে ফরমালিন মেশানো আছে। অন্তত শুঁটকি-আমটা প্রতিনিয়ত আমাকে তা-ই জানান দিচ্ছে। একজন বললেন, আর একটি প্রমাণ আছে। সেটা হলো, ফলের দেকানের আশেপাশে একটি মাছিও পাবেন না। ফরমালিন মেশানো ফলে মাছি বসে না। কারণ পচা জিনিসে সাধারণত মাছি বসে আর ফরমালিন মেশানো ফলে পচন ধরে না বলে মাছির তাতে কোনও লাভ নেই। তাছাড়া সন্ধান করে দেখুন, আজকালকার ফলের দোকানে, ব্যতিক্রম বাদে, কোনও পচা ফল পাবেন না।
ফলে ফরমালিন মেশানো আছে, এই অনুমানটা কি নিতান্ত কোনও ব্যক্তিগত ব্যাপার ? আমার নিজস্ব একটি সমস্যা ? ফরমালিন কি কেবল আমাকেই আক্রমণ করবে ? সমাজের আর কাউকে আক্রমণ করবে না ? চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, ধনকুবের পুঁজিপতি, প্রশাসক, বড় আমলা প্রমুখকে ভয় করে ফরমালিন কি তাঁদের দারেকাছে যায় না ? যাবার তো কথা, এমন তো হবার কথা নয়। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে খাদ্যে ফরমালিনের মিশ্রণ আত্মসমর্পিত ও নির্লিপ্ত বৃহত্তর সমাজের সমস্যা হলেও দেশ-পরিচালক উচ্চমহলের কোনও সমস্যা নয়। তারপরও পশ্ন থেকেই যায়। আসলেই কি দেশ, রাষ্ট্র, আইন এই খাদ্যপণ্যে ফরমালিন মিশ্রণের সঙ্গে জড়িত নয় ? ফল বিক্রেতা, প্রশাসক, চিকিৎসক, ভোক্তা অধিকার আইন, বাজার তদারকি সংস্থা, নাগরিক সমাজের অধিপতি, ভ্রম্যমাণ আদালতসহ বৃহত্তর শ্রমজীবী সমাজের নি¤œ আয়ের মানুষের কি কোনও সম্পর্ক-সংশ্লিষ্টতা নেই এই ফরমালিন-সঙ্কটের সঙ্গে ? এমন কি পৌরসভার ভেতরে প্রাণঘাতী পণ্য প্রকাশ্য দিবালোকে বিক্রয় হলে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কীছু করার কি থাকে না ? মনে তাই প্রশ্ন জেগে রয়, এ কেমন পৌরসভা, যে-পৌরসভা তার নাগরিককে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে না, খুনিকে দোকান সাজিয়ে বসতে দেয়, প্রতিনিয়ত তার নাগরিকরা বিষ কিনে খায় আর প্রতিকারহীন মৃত্যুপথের যাত্রী হয়ে উঠে ? বুঝি না, কী করে পৌরকর্তৃপক্ষ নির্বিকার থাকে, নির্বিকার থাকে সাধারণ মানুষ ? যাঁরা ব্যবসা করেন তারা না হয় লাভের লোভে পড়ে প্রকারান্তরে খুনি হয়ে উঠেন, কিন্তু যাদেরকে খুন করা হচ্ছে তাঁরাই বা কেন এই মুনাফা লোভীদের লোভের শিকার হচ্ছেন ? আবস্থাটা একেবারেই বোধগম্য নয়। কিন্তু একটা কীছু কারণ তো অবশ্যই আছে।
মনে হচ্ছে, সমাজের সামগ্রিক দৃষ্টিতে এই সামাজিক সমস্যাটি নিয়তিনির্ধারিত একটা কীছুর মর্যাদা পেয়ে গেছে। এমন মর্যাদায় উন্নীত না হলে সামাজিক সমস্যা হিসেবে সেটাকে সমাজের পক্ষ থেকে প্রতিহত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হতো। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি কোথাও কেউ তো কুটোটি পর্যন্ত নাড়ছেন না। এমন হলে বিষয়টা দাঁড়ায় যে, ফলে ফরমালিন আছে, জানলেই বা কী আর না জানলেই বা কী। ফলে, সবজিতে, মাছ-মাংস ইত্যাদিতে ফরমালিন মেশানো হবে, চূড়ান্ত পরিণতিতে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মৃত্যুবরণ করলে করুক তাতে কারও কীচ্ছু আসে যায় না। মুনাফামুখি কারবার চলছে কি না, কারবারে লাভ হচ্ছে কি না, এই হলো সার কথা। পুঁজির রাজত্বে সবার উপরে মুনাফা সত্য তাহার উপরে নাই এবং এই সত্যের অন্তরালে সমাজটা মুনাফার বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে নিয়তিনির্ধারিত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে এবং চ-ীদাসের ঘোষণা থেকে সরে গিয়ে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উরে নাই’ এই সত্যকে মিথ্যা করে তুলে প্রকারান্তরে মুনাফার পদতলে মানুষ আত্মসমর্পণ করেছে।

  • [১]