কুমার সৌরভ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
এরকম অবস্থায় কী করা উচিৎ বুঝতে পারছিলেন না মালু মিয়া। বিরাপুরের বাদশা মিয়ার কাছে গেলেন। বাদশা মিয়া স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। বাদশা মিয়া তাকে বর্ডারের দিকে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার পরামর্শ দিলেন। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন মালু মিয়া। হ্যাঁ, যুদ্ধই একমাত্র কর্তব্য। মা, স্ত্রী ও ১ ছেলেকে রেখে আসলেন দোয়ারাবাজারের লক্ষ্মীপুরে মামার বাড়িতে। এরপর রওয়ানা দিলেন বালাট অভিমুখে।
কাংলার হাওরের উত্তর পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন। কাংলার হাওরের বিলে একটি খোলা নৌকা দেখা গেল। কয়েকজন লোক। সবার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। মালু মিয়া বুঝলেন ওরা মুক্তিযোদ্ধা। নৌকা আরেকটু কাছে আসলে তিনি দেখলেন পরিচিত এক আনসারকে। তিনি শুনতে পেলেন ওই আনসারটি নৌকায় থাকা আরেকজনকে বলছে, ওই যে মালু মিয়া যায়। নৌকা থেকে তাকে থামতে নির্দেশ দেয়া হলো। থামলেন মালু মিয়া। নৌকা এসে ভিড়ল তার কাছে। নৌকার নেতা গোছের লোকটি নাম জিজ্ঞাসা করলেন। মালু মিয়া নিজের নাম বললেন। তখন ওই ব্যক্তিটি শ্লেষভরা কণ্ঠে বললেন, তুমি চোরা মালু? রেগে গেলেন মালু মিয়া। গলা চড়িয়ে উত্তর দিলেন, না চোরা মালু নই আমি, আমি ডাকাত মালু। সরাসরি এরকম মুখের উপর জবাব পেয়ে খেপে গেলেন নেতা। হুকুম দিলেন ওকে ধরো। মালু মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমার নামে একটি গুলি বরাদ্দ করা হলো। দমলেন না মালু মিয়া। বললেন, আমার জন্য কেন একটি গুলি খরচ করবেন। ওইটি পাঞ্জাবির জন্য রাখুন। তাতে দেশের লাভ। আমাকে যুদ্ধে নিন। কী ভেবে জানি নেতা নরোম হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, ওঠ নৌকায়। মালু মিয়া নৌকায় চড়লেন। তিনি গন্তব্য পেয়ে গেছেন। নিয়তিই বোধ করি তাকে এখানে নিয়ে এসেছিলো। নৌকায় উঠার পর জানলেন নেতার নাম হীরা। আনসারের হাবিলদার ছিলেন তিনি। বাড়ি ময়মনসিংহ। কথায় কথায় হৃদ্যতা বাড়ে নেতার সাথে মালু মিয়ার। মালুকে ছেলে বানিয়ে ফেললেন হীরা মিয়া। মালু শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ালেন। শুরু হলো যুদ্ধের ময়দানে দেখা এই পিতার সাথে নতুন যাত্রা। এই যাত্রার উদ্দেশ্য রক্ত নেয়া। পাক আর্মির। রাজকার-আলবদরের। দেশ স্বাধীনের জন্য যে এক সাগর রক্ত দরকার। ওই রক্তগঙ্গায় মিশে যেতে পারে নিজের শরীরের শোনিত ধারাও।
ভৈষারপাড়ের কাছে বালুচরে নৌকা থামলো। ওখানে হীরা মিয়ার বাংকার। খাওয়া-দাওয়া সেরে হীরা হাবিলদার তাকে নিয়ে সি কোম্পানির হেডকোয়ার্টার নারায়ণতলার আজাফর মোড়লের বাড়িতে এলেন। তখন সি কোম্পানির কমান্ডার এনামুল হক চৌধুরী। হীরা মিয়া কমান্ডারকে বললেন, ছেলেটি যুদ্ধ করতে চায়। কমান্ডার এনাম চৌধুরী বালাট গিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য নাম লিখাতে বললেন মালু মিয়াকে। মালু মিয়া বললেন, স্যার আমার ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন নেই। আনসার ট্রেনিং নেয়া আছে আমার। রাইফেল চালাতে জানি। এই কথা শুনে এনাম চৌধুরী মালু মিয়ার অস্ত্র চালানোর পরীক্ষা নিলেন। তার হাতে রাইফেল দিয়ে দূরের একটি মাটির ঢেলা দেখিয়ে টার্গেট করতে বললেন। টার্গেট স্থির করলেন মালু। কমান্ডারের আদেশ হলো, ফায়ার। দ্রিম। ফায়ার করলেন মালু। মাটির ঢেলায় গুলি লাগাতে সক্ষম হলেন তিনি। সাবাস বলে পিঠ চাপড়ে দিলেন কমান্ডার। ক্যাম্পে ছিলেন পুলিশের নায়েক ছুরত আলী নামের এক মুক্তিযোদ্ধা। ছুরত আলীকে কমান্ডার দায়িত্ব দিলেন মালু মিয়াকে গেরিলা যুদ্ধের কায়দা কানুন, গ্রেনেড ছুড়া, ব্রিজ ভাঙ্গা, এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার করা এসব বিষয়ে ট্রেনিং দেয়ার। অদম্য উৎসাহে ট্রেনিংয়ে লেগে পড়লেন মালু। দিন দুয়েকের মধ্যেই মালু মিয়া প্রাথমিক কলাকৌশলগুলো মাথায় ঢুকিয়ে নিলেন। ছুরত আলী রিপোর্ট করলেন, এই ছেলেটি পারবে। ওর দারুণ সাহস আছে। প্রস্ততি শেষ। এখন অপেক্ষা শত্রুর বুকে রাইফেল তাক করা। গ্রেনেড চার্জ করা। বাংকার উড়িয়ে দেয়া। মালু মিয়া উত্তেজনায় থরথর।
কমান্ডার এনাম মালু মিয়াকে যুদ্ধপিতা হীরা হাবিলদারের দলেই পাঠিয়ে দিলেন। ফিরে আসলেন সেই বালুচরে। প্রথম অপারেশনের দায়িত্ব পড়লো রঙ্গারচর গ্রামের এক দালালকে ধরে আনতে। পাঁচজনের দলসহ রওয়ানা হলেন মালু মিয়া। রাতের অন্ধকারে দালাল ময়না মিয়াকে পাকড়াও করে ক্যাম্পে নিয়ে এলেন। ময়না মিয়ার দু’নলা বন্দুকটিও কবজা করলেন। ধৃত আসামীসহ ফিরে এলেন ক্যাম্পে। সফল হলেন প্রথম অপারেশনে।
দ্বিতীয় অপারেশন বালিকান্দিতে। এবারও দালাল ধরা। মরতুজা নামের ওই দালালকেও ঠিক মতো পাকড়াও করে নিয়ে এলো চার সদস্যের মালু মিয়ার মুক্তি দল।
এরকম কয়েকটি দালাল ধরার অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করলেন মালু মিয়া। সাফল্যের আনন্দে ভাসছেন তিনি। চাইছেন আরও বড় কিছু। আরও কঠিন দায়িত্ব। পেয়েও গেলেন যুদ্ধজীবনের পঞ্চম অপারেশনে সেই দায়িত্ব।
সি কোম্পানির হেডকোয়ার্টারে কমান্ডার এনাম চৌধুরী ডেকে পাঠালেন তাকে। দায়িত্ব দিলেন ষোলঘরের চান মিয়ার বাড়ির বাংকারে গ্রেনেড চার্জ করার। তিনটি গ্রেনেড দেয়া হলো তাকে। তিনি চেয়ে আরও একটি বাড়তি গ্রেনেড নিলেন। ষোলঘরের বাংকারে তখন প্রচুর পাক আর্মির অবস্থান। কমান্ডারের প্ল্যান ছিলো মালু মিয়া প্রথমে গিয়ে বাংকারে গ্রেনেড চার্জ করবেন। পাক আর্মিরা বাংকার ছেড়ে বেরিয়ে আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ফায়ার শুরু করবে। এভাবে ওই অবস্থানে পাক আর্মিকে দুর্বল করে দেয়াই ছিলো কমান্ডারের উদ্দেশ্য। গ্রেনেড নিয়ে দিনের বেলা রওয়ানা হলেন মালু মিয়া। একা। যুদ্ধজীবনের প্রথম বড় অপারেশনে। বৈষারপাড় আসতে বিকেল হয়ে গেল। অপেক্ষা করলেন ওখানে। রাত ১১টার দিকে হাওরের পানি সাঁতরে বাংকারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন। মাথায় পাগড়ির মতো করে গামছা দিয়ে গ্রেনেড চারটি বেঁধে রেখেছেন। কচুরিপানা ভর্তি হাওরে শরীর ডুবিয়ে মাখা উপরে রেখে সন্তর্পনে এগোতে থাকলেন তিনি। বাংকারের কাছে আসার জন্য হাঁটার আরেকটি রাস্তা থাকলেও তিনি পানিপথকেই বেছে নিয়েছিলেন নিজের গোপনীয়তা বজায় রাখতে। একেবারে বাংকারের কাছে চলে আসলেন। বাংকারের দিকে তাকালেন। একজনের কাশির আওয়াজ পেলেন। আবছা দেখতে পেলেন সেন্ট্রিকে। শব্দ লক্ষ্য করেই গ্রেনেড ছুঁড়ে দিলেন। তীব্র শব্দে বিস্ফোরিত হলো গ্রেনেড। বাতাসে ভেসে উঠল কারও আর্তচিৎকার। মালু মিয়া বুঝে নিলেন টার্গেট খতম। বাংকার থেকে ফায়ার শুরু করে পাক আর্মিরা। পাক আর্মিরা অনুমান করে নিয়েছিল আক্রমণ শুরু হয়েছে উত্তর দিক থেকে। তাই ওরা ওইদিকেই ফায়ার করতে থাকে। কিন্তু মালু মিয়ার অবস্থান ছিলো বাংকারের পূর্ব দিকে। বাংকার থেকে মাত্র পাঁচ গজ দূরত্বে। এসময় মুক্তিযোদ্ধা দল কাভারিং ফায়ার শুরু করে। উভয় পক্ষের তুমুল গুলাগুলির ফাঁকেই মালু মিয়া রাস্তা পেরিয়ে বাংকারের পশ্চিম দিকে চলে আসেন। ওখানে একটি পুকুর ছিলো। চান মিয়া মাষ্টারের বাড়ির পাশে। পুকুরে নেমে গেলেন মালু মিয়া। তিনি দেখতে পেলেন বাংকারে ফিট করা মেশিনগানের ব্যারেল মাটির দুই ফুট উপরে পজিশন করানো। তিনি ভাবলেন মেশিন গানের গুলি মাটির দুই ফুট নীচে আসবে না। তাই ক্রলিং করে মেশিন গানের নরের নীচে চলে আসলেন। বাংকারের ভিতরে গ্রেনেড চার্জ করলেন। চিৎকার ভেসে আসে বাংকারের ভিতর থেকে। পাক আর্মি বাংকার ছেড়ে উঠে আসে। দৌঁড়ে পার্শ্ববর্তী মসজিদের দিকে পজিশন নেয়া শুরু করল তারা। আরেকটি গ্রেনেড ছুঁড়ে মারেন মালু মিয়া তাদের দিকে। মুক্তিযোদ্ধা দলের আক্রমণও সমান গতিতে চলছিল। মালু মিয়ার দায়িত্ব শেষ। এবার নিরাপদে পালানোর চিন্তা মাথায় আসে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের দিকে সরে আসতে শুরু করলেন।
(চলবে)