- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

একাত্তরের নায়কেরা-রাশিদ আলী

কুমার সৌরভ
একটি গানের কলি আছে এরকম- চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি। আমাদের অবস্থাটিও হয়েছে তেমনি। ফিরছিলাম খাগুরায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ছলিম উল্লার বাড়ি থেকে। রাস্তায় এসে রিকশায় না উঠে ইচ্ছা করেই হেঁটে আসছিলাম বেতগঞ্জ বাজার। কারণ রাস্তার দুইধারের জমিতে পাকা আমন ধানের সৌন্দর্য আমাদের দারুণভাবে মোহিত করেছিলো। বেতগঞ্জ বাজার আর খাগুরার মাঝামাঝি জায়গায় বয়স্ক এক লোক যাচ্ছিলেন বাজারে। তার হাতে একটি ছোট কনটেইনার। সম্ভবত কেরোসিন কিনবেন বাজার থেকে। মালেকভাই তাকে দেখেই জিজ্ঞাসা করলেন- ‘কিতা বা রাশিদ ভাই বালা আছ নি’। লুঙ্গি পড়া গায়ে শার্টের উপর চাপানো লিলামি জ্যাকেট পরিহিত সাদা দাড়ি শোভিত রাশিদ ভাই হেসে বললেন, ‘বালা। মালেক বাই ইখান কিতা।’ মালেক ভাই বললেন-‘না আমরা আইছলাম ছলিম উল্লার বাড়িত বা’। রাশিদ ভাইর পালটা  জবাব ‘ও’। ‘আমরা তো এক লগেই গেরাম ছাড়ছিলাম ওই রাইত। তুমি জাননি?’ একটুক্ষণ পরই পালটা প্রশ্ন রাশেদ ভাইর মালেক ভাইর উদ্দেশ্যে। উত্তরটি মালেক ভাইকে দিতে হলো না। আমি রাশেদ ভাইর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, ‘তাই নাকি। তাহলে তো ভালই হলো। উনাকেও ইন্টারভিউ করবো।’ মালেকভাইকে প্রস্তাব করলাম। মালেক ভাই রাজি হলেন। বললাম, বাজারে গিয়ে কোন খালি জায়গায় বসতে হবে যেখানে কেউ এসে বিরক্ত করবে না। রাশেদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম এমন কোন দোকান আছে কিনা।  
বেতগঞ্জ বাজারে গিয়ে জাফর আলী নামক এক টেইলারের দোকানে বসলাম আমরা। অমায়িক ভদ্রলোক জাফর আলী। তিনি সানন্দে আমাদের বসতে দিলেন। আলাপ শুরু করলাম মুক্তিযোদ্ধা রাশিদ আলীর সাথে। জ্যেষ্ঠ মাসের সেই রাতেই তিনি গ্রাম ছেড়েছিলেন যুদ্ধে যাবেন বলে। ছলিম উল্লাহ, মনির উদ্দিন, ছৈয়দ, ছলিম, সালিক, নূরুল ইসলাম, জড়াই, হালিম প্রমুখ একসাথে গভীর রাতে খাগুরা ছেড়ে বনগাঁও গিয়ে পৌঁছেন শেষ রাতে। আনসার কমান্ডার কালা মিয়ার শেল্টারে যান। কালা মিয়া জয়বাংলা বাজারে নিয়ে গেলে লেখাপড়া না জানার কারণে তাৎক্ষণিক তাদেরকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। অপেক্ষা করতে বলা হয়। ফলে ছলিম উল্লাহ, মনির উদ্দিন, সালিক প্রথম সুযোগে যুদ্ধে গেলেন। রাশিদ আলীসহ অন্যরা পরবর্তী ডাকের জন্য অপেক্ষায় রইলেন। তারা আবার বনগাঁও ফিরে আসেন। প্রায় ১৫ দিন পর ডাক আসলো। কিন্তু ততদিনে সঙ্গের নূরুল ইসলাম ও জড়াই বাড়ি ফিরে আসেন। রাসেদ মিয়াসহ অন্যরা গেলেন মইলাম রিক্রুটিং সেন্টারে। নাম লিখান। মইলাম থেকে ২০৯ জনকে ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হয়। এই ব্যাচের ট্রেনিং সেন্টার ছিলো আগরতলার লোহারবন্দ। শিলং গিয়ে ২ রাত অপেক্ষা করতে হয় তাদেরকে।
লোহারবন্দে ২১ দিন ট্রেনিং করার পর রাশিদ আলীসহ ৭০ জনকে পাঠানো হয় কুকিরতলা। সেখান থেকে তাদের পাঠানো হয় সেলুয়া । রাশিদ আলী স্মরণ থেকে তার কমান্ডারের নাম বললেন চিত্তরঞ্জন। ১৫ দিন ছিলেন সেলুয়া।
রাশিদ আলী বললেন, ট্রেনিংয়ের পর তারা তিন মাসের মতো যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন। এর পর দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। তিনি বিভিন্ন টিলায় কয়েকটি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ করলেন কিন্তু কোন যুদ্ধক্ষেত্রের নামই সঠিকভাবে বলতে পারলেন না বয়সজনিত স্বাভাবিক স্মৃতিভ্রষ্টতার কারণে। সেলুয়া থেকে অপারেশনে অংশগ্রহণকালে তার এক কমান্ডারের নাম বললেন, আবুল কালাম।
রাশিদ আলীর সাথে আলোচনায় এর বেশি কোন তথ্য পাওয়া গেল না। না পাওয়া যাক, ক্ষতি নেই। সকলেই সমান যুদ্ধ করার সুযোগ পাননি। সকলেই একই ধরনের কাজ করেননি। কিন্তু সকলেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন করার কঠিন সংকল্প নিয়ে। সকলেই জানতেন এই যাওয়া আর ফিরে আসা নাও হতে পারে। দমেন নি তারা। রাশেদ আলীর বিশেষত্ব আরও বেশি। তিনি ছিলেন নিরক্ষর। রাজনীতির অলিগলি তার চেনা জগৎ ছিল না। কিন্তু এই মনে ছিলো অপরিমেয় দেশপ্রেম। ছিলো তীব্র স্বাজাত্যবোধ। তিনি রাজনীতির কৌশল তেমন না বুঝলেও এটুকু বুঝেছিলেন পাকিস্তানিরা শোষণ করছে বাঙালিদের। ধর্মের নামে জাতির নামে গোষ্ঠীর নামে চলছিল এই শোষণ। শোষণ হচ্ছিল শ্যামল বাংলার সম্পদ লুটে নিয়ে বঞ্চনা করার মধ্য দিয়ে। এই বোধটুকু শিখেছিলেন জীবনের পাঠ থেকে। এখানেই তিনি অনন্য, নমস্য।
রাশিদ আলী এখনও নিতান্তই দারিদ্রসীমার প্রান্তসীমায় অবস্থানকারী অতি সাধারণ এক নাগরিক। কৃষি কাজই পেশা।  ২ ছেলে আর ২ মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে মারা গেছে। এই বয়সেও শ্রম দিতে হয় জীবিকা নির্বাহের জন্য। তবু কষ্ট নেই তার মনে নেই আক্ষেপ। কারণ তিনি তো এখন একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক।
এক অদ্ভূত সারল্যে ভরা বয়সী মুক্তিযোদ্ধার নিকট থেকে অন্য ধরনের তৃপ্তি নিয়ে যখন বেতগঞ্জ ছাড়লাম তখন মধাহ্নের সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়া শুরু করেছে। সূর্যটি আস্তে আস্তে পশ্চিমে হেলে গিয়ে আলোর মায়া ছেড়ে জগৎ অন্ধকারের বিশ্রামে চলে যাবে। অন্ধকার মানেই যেন অস্বস্তি। রাশিদ আলীর সাথে কথা বলে আমাদের মনেও কি সামান্য কিছু অস্বস্তি দানা বেঁধেছে, বুঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছিলাম না। না মালেক ভাইও হিসাবটি মিলাতে পারলেন না। বললেন- ‘বাদ দেইনছাইন ইতা, ওত ইসাব উসাব কইরা লাব নাই, মুক্তিযোদ্ধারা ইতা ইসাব কোনসময়অই করছইননা’। এর পর আর কথা চলে না।
তথ্যসূত্র: মুক্তিযোদ্ধা রাশিদ আলীর সাথে ২৬ নভেম্বর বেতগঞ্জ বাজারে আলোচনা। (চলবে)

  • [১]