- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

একুশে পদক পেলেন ভাটির কন্যা সুষমা

বিন্দু তালুকদার
শিল্প-সংস্কৃতির সুতিকাগার সুনামগঞ্জ। যে সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বৈষ্ণব কবি রাধারমন দত্ত, মরমী কবি দেওয়ান হাছন রাজা, জ্ঞানের সাগর বাউল দুর্বীন শাহ, বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমসহ শত শত গুণী শিল্পী। গুণী শিল্পীদের জন্মস্থান সুনামগঞ্জ আবারো প্রমাণ করলো সঙ্গীতে দেশ সেরা।
সংগীতের বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’ পেয়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের পন্ডিত রামকানাই দাশের বড় বোন প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী সুষমা দাশ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় দেশের ১৬ জন গুণী ব্যক্তির পাশাপাশি চলতি বছর তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়েছে।
হাওর-ভাটির দেশ দিরাইয়ের কন্যা ও শাল্লার কুলবধু সুষমা দাশের একুশে পদক প্রাপ্তির খবরে আনন্দে ভাসছে দিরাই-শাল্লার মানুষ। দিরাইয়ের তিন কৃতী সন্তান বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম, সংগীত শিল্পী সুষমা দাশ ও তার আপন ছোট ভাই পন্ডিত রামকানাই দাশ সংগীতে পেলেন একুশে পদক।
ভাটির কন্যা সুষমা দাশকে সংগীতে একুশে পদক প্রদান করা হয়েছে। রোববার       এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে সুষমা দাশের হাতে একুশে পদক প্রদান করবেন। এর আগে ২০০১ সালে লোকসংগীতে একুশে পদক পান দিরাইয়ের উজান ধলের বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম ও ২০১৪ সালে একই উপজেলার পেরুয়া গ্রামের বাসিন্দা সুষমা দাশের ছোট ভাই প-িত রামকানাই দাশও সংগীতে একুশে পদক পান।  
সুষমা দাশের ভাসুরের ছেলে শাল্লা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার গোপিকা রঞ্জন দাশ বলেন,‘শুনেছি কাকীমা আব্দুল করিম ও রামকানাই দাশের মত একুশে পদক পেয়েছেন। সরকার তাকে এই সম্মান করেছে। এই খবরে আমাদের  গ্রামের সবাই খুশি। কাকীমা অনেক দিন ধরে সিলেটে থাকেন। বাড়িতে থাকার সময়ই তিনি গ্রামে অনেক ভাল গান গাইতেন। তার গান শুনার জন্য আশপাশের গ্রামের লোকজন আসত।’
শাল্লা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক কালীপদ রায় বলেন,‘ হাওর-ভাটির গ্রামের শিল্পী সুষমা দাশকে খোঁজে বের করে একুশে পদক প্রদান করায় আমরা বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’
দিরাইয়ের চরনারচর ইউপি চেয়ারম্যান রতন তালুকদার বলেন,‘আমাদের এলাকার কৃতী সন্তান গুণী শিল্পী সুষমা দাশ সংগীতে একুশে পদক পাওয়ায় আমরা গর্বিত ও অভিভূত। সরকার সঠিক শিল্পীকেই সম্মানিত করেছে। এলাকার আরেক কৃতী সন্তান সংবিধান প্রণেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হারিয়ে আমরা শোকাহত ছিলাম। সুষমা দাশের এই প্রাপ্তিতে আমরা জাতীয় মর্যাদা পেয়েছি। ’
বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল বলেন,‘ ভাটির দেশ গানের দেশ ও সুরের দেশ। আমাদের শিল্পীদের সুর দেশ-বিদেশে সমাদৃত। এলাকার কৃতী সন্তান আমার পিসি সুষমা দাশ একুশে পদক পাওয়ায় আমরা খুশি। সরকার গুণী এই শিল্পীকে সঠিক মূল্যায়ন করেছেন। সুষমা দাশ দেশ ও জাতির কাছ থেকে প্রকৃত সম্মান পাওয়ায় দিরাইবাসী আনন্দিত। আশা রাখি ভবিষ্যতে আমাদের এলাকার গুণী লোকজন আরো একুশে পদক পাবেন। ’
একুশে পদক পাবার পর তাৎক্ষণিক অনুভূতি জানিয়ে সুষমা দাশ গণমাধ্যমকে বলেন,‘আমি সত্যি অনেক আনন্দিত। আমার এ অর্জন একার আমার না সুনামগঞ্জসহ সমন্ত সিলেটবাসীর। সবার ভালোবাসাতে আমি আজ এই সম্মানটুকু পেয়েছি। আজকের এই খুশির দিনে সবেচেয় বেশি খুশি অইতো আমার ছোট ভাই রামকানাই। সংগীতের তো আমি কিছু বুঝতামনা জানতাম না। সেই আমারে অন্ধকারে টর্চ দিয়া আলো দেখাইয়া রাস্তা চিনাইছে। আজ তার কথাই বেশি মনে পড়তাছে। আমার জন্য সবাই আর্শিবাদ করবেন। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ মানুষের ভালোবাসা পাওয়াটাই আসল আর বাকি সব নকল।  
উল্লেখ্য, সংগীত শিল্পী সুষমা দাশ ১৯৩০ সালের ১ মে নিজ গ্রাম শাল্লা থানার হবিবপুর ইউনিয়নের পুটকা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি পুটকা গ্রামে ছিল। পরে মামার বাড়ি দিরাই উপজেলার রচরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া গ্রামে তাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তাঁর  পিতা রসিক লাল দাশ, মাতা দিব্যময়ি দাশ। পিতা ও মাতা দু’জনই গান লিখতেন এবং গাইতেন। পিতা-মাতার সাথে মাত্র ৭ বছর বয়সে ছোট বেলা থেকেই ধামাইল এবং বাউল গান করতেন সুষমা দাশ। ১৩৫২ সালে শাল্লা থানার চাকুয়া গ্রামের প্রাণনাথ দাশের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর গ্রামীণ মেয়েলী আসরে ধামাইল, কবি গান ও বাউল গানের পাশাপাশি হরি জাগরণের গান, গোপিনী কীর্তন, বিয়ের গান সহ ভাটি অঞ্চলে প্রচলিত লোকজ ধারার সকল অঙ্গের গান গেয়ে এলাকায় একজন নন্দিত শিল্পী হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। একসময় তিনি নিজ গ্রামেই থাকেন। ১৯৭২ সালে ছোটভাই প-িত রামকানাই দাশ এই গুণী সংগীতশিল্পীকে সিলেটে নিয়ে আসেন। ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় তিনি সিলেট বেতারে অডিশন দেন এবং নিয়মিত সংগীতশিল্পী হিসেবে লোকসংগীত পরিবেশন করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠান মঞ্চে গান করারও সুযোগ সৃষ্টি হয় তাঁর। বর্ষবরণ, বসন্ত উৎসবসহ বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন তিনি। বাংলাদেশ বেতারে তিনি প্রায় সহ¯্রাধিক গান পরিবেশন করেন।
জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সভাপতি বেগম সুফিয়া কামালের আমন্ত্রনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে জাতীয় রবীন্দ্র সম্মেলনের অষ্টম বার্ষিক অনুষ্ঠান মালায় লোকগীতি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ পূর্বক রাধারমনের গান পরিবেশন করেন সুষমা দাশ।
ঢাকার শিল্পকলা কর্তৃক আয়োজিত ‘লোকসঙ্গীত উৎসব’ অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন তিনি এবং গত ২০১১ সালের ১৬ ই মার্চ ছায়ানট কর্তৃক আয়োজিত ওয়াহিদুল হক স্মারক ‘দেশঘরের গান’ অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন ছাড়াও অনুষ্ঠানে তিনি পিতা রসিক লাল দাশ ও রাধারমণ দত্তের গান পরিবেশন করেন।
সুষমা দাশ রাধা-রমন দত্তের গান, বাউল শাহ্ আবদুল করিমের গান, কালাশাহ্, দুর্বিন শাহ্, গীতিকবি গিয়াস উদ্দিন আহমদ, হাসন রাজাসহ বহু মরমী কবি ও সাধকের গান গেয়ে থাকেন।
১৪১৭ বাংলায় ভারতের কলকাতায় ‘বাউল ফকির উৎসব’ এবং পরবর্তীতে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের আহব্বানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন সুষমা দাশ। সেই মঞ্চে দর্শকের অনুরোধে পরপর কয়েকটি রাধারমণের গান পরিবেশন করেন তিনি।
সুষমা দাশ চার পুত্র ও এক কন্যার জননী। অবসর সময়ে তিনি পুত্র কন্যা ও নাতি নাতনীদেরকে নিয়ে গানে গানে মেতে থাকেন। বর্তমানে তিনি সিলেট শহরের করেরপাড়া আবাসিক এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
এবছর যারা একুশে পদক পেয়েছেন তারা হলেন, সুষমা দাস (লোকসংগীত), ভাষা সৈনিক অধ্যাপক ড. শরিফা খাতুন (ভাষা আন্দোলন), জামিলুর রেজা চৌধুরী (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি), জুলহাস উদ্দিন আহমেদ (সঙ্গীত), ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম (সঙ্গীত), তানভীর মোকাম্মেল (চলচ্চিত্র), সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ (ভাস্কর্য), সারা যাকের (নাটক), আবুল মোমেন ও স্বদেশ রায় (সাংবাদিকতা), সৈয়দ আকরম হোসেন (গবেষণা), প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন (শিক্ষা), অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান (সমাজসেবা), কবি ওমর আলী ( ভাষা ও সাহিত্য মরণোত্তর), সুকুমার বড়ুয়া (ভাষা ও সাহিত্য), শামীম আরা নীপা (নৃত্য) এবং রহমতউল্লাহ আল মাহমুদ সেলিম (সঙ্গীত)।

  • [১]