- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা আর যেন ফিরে না আসে

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট দলটির প্রধান শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ওপর যেভাবে গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, সেটাকে নারকীয় বললেও যেন কম বলা হয়। ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ, রক্তের ¯্রােত, আহতদের আর্তচিৎকার ও আতঙ্কিত মানুষের ছোটাছুটির এমন দৃশ্য আগে কি কখনও দেখেছিল বাংলাদেশ? সন্দেহ নেই, রাজনৈতিক হত্যাকা- বাংলাদেশে কম ঘটেনি। জনসমাবেশে সন্ত্রাসী হামলাও আমরা আগে-পরে প্রত্যক্ষ করেছি। নিহতদের সংখ্যা যদি বিবেচনা করি- ২০০১ সালের জুন মাসে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ অফিসেও বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সমান সংখ্যক নিহত হয়েছিল। ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে আহতের সংখ্যা ছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের চেয়ে বেশি দেড় শতাধিক। কিন্তু আমরা মনে করি, তাৎপর্যের দিক থেকে ২১ আগস্টের ওই হামলার সঙ্গে অন্যগুলোর তুলনা হতে পারে না। অন্যান্য হামলার মতো এতে যদিও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী সরাসরি হামলাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, এর পেছনে রাজনৈতিক সরকারের যোগসাজশ এতটা প্রত্যক্ষ আগে কখনও দেখা যায়নি। ওই হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডের উৎসও ছিল নিরাপত্তা বাহিনী-সংশ্নিষ্টরা। পরবর্তীকালে মামলাটির বিচার চলাকালে দেখা গেছে, জঙ্গিরা কীভাবে রাষ্ট্রীয় মদদ পেয়েছিল। হামলার পরপরই জঙ্গিদের পালিয়ে যেতে দিতে বা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে ভূমিকা রেখেছিল, তাও ছিল নজিরবিহীন। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, হামলার আলামত ধ্বংসেও খোদ তদন্ত কর্মকর্তারা অতি উৎসাহী ভূমিকা রেখেছিলেন। এখন প্রমাণিত, তদন্তের নামে প্রহসনের মাধ্যমে কীভাবে একজন জজ মিয়া তৈরি করেছিল রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থা! বস্তুত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্বয়ং যখন কোনো হামলার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকেন, তখন এ ধরনের কোনো পদক্ষেপই অস্বাভাবিক হতে পারে না। মন্দের ভালো যে, হামলাকারীদের প্রধান নিশানা শেখ হাসিনাকে শেষ পর্যন্ত মানবঢাল রচনা করে রক্ষা করতে পেরেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কিন্তু তারপরও ওই হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ সব মিলিয়ে ২৪ জন নিহত ও চার শতাধিক আহত হয়েছিলেন। বস্তুত আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও রাজনৈতিক জিঘাংসা একাকার হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক বিরোধিতা গ্রেনেড মেরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এই নৃশংস অপচেষ্টা বাংলাদেশ শুধু নয়, বৈশ্বিক ক্ষেত্রেও এক কলঙ্কতিলক হয়ে রয়েছে। আশার কথা, এই হামলা ও ষড়যন্ত্রে জড়িতদের বেশিরভাগ ব্যক্তিকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। পলাতক আসামিদেরও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ওই ঘটনায় বিচারিক আদালত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদ- দেন। একইসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয় অপর ১১ আসামিকে। এখন মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানির জন্য পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত, রায়সহ বই) যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এরপর এটি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হবে। বৃহস্পতিবার এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, ইতিহাসের জঘন্যতম এ ঘটনায় আনা মামলায় উচ্চ আদালতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিচারিক আদালত আসামিদের যে সাজার রায় প্রদান করেছেন তা যেন বহাল থাকে উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের সে প্রচেষ্টা থাকবে বলেও জানান তিনি।
কিন্তু একই সঙ্গে জরুরি, এই অঘটন থেকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের শিক্ষা গ্রহণ। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস লালন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলে রাষ্ট্রীয় সংস্থার ব্যবহারের এই কলঙ্ক আর যেন আমাদের রাজনীতিতে ফিরে না আসে। এর ফল নিজেদের জন্যও কীভাবে বুমেরাং হতে পারে, ২১ আগস্টে ক্ষমতাসীন মহল এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে।

  • [১]