- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

একের পর এক ডুবছে হাওর-জেলাজুড়ে কৃষকদের বাঁচার লড়াই

বিশেষ প্রতিনিধি ও আলআমিন
‘বান্দের (বাঁধের) কাজ সময় মত অইলে, এখন এমন বিপদ অইলো নায়, ই-বাঁধ ভাঙলে আমরার কাম শেষ, তারা না ডাকলেও আমরার দিন-রাইত ইকানো থাকন লাগবো’। শুক্রবার বিকালে জামালগঞ্জের হালির হাওরের সুন্দরপুর কালিবাড়ি বাঁধে কর্মরত ওই গ্রামের কৃষক মাফিকুল ইসলাম এভাবে মন্তব্য করেন।  
বাঁধের কাজে থাকা বেহেলী ইউনিয়নের আছানপুর গ্রামের আমিনুল হক মনি বলেন,‘হাওর রক্ষা বাঁধের কাম (কাজ) অয় লোক দেখানো, ঠিকাদাররা পানি আইবার আগে আগে আইয়া কাম ধরছে, বাঁধের কাম শেষ করবার আগেঔ আইছে পানি, হি-সময় কোন অফিসারও আইছে না, অখন পাউবো’র অমুখ-তমুকের দৌড়াদৌড়ি’।
হাওরপাড়ের কৃষক হরিপুর গ্রামের দোলন সরকার বলেন,‘যে কোন সময় বাঁধ ভেসে যাবে, লাখ লাখ কৃষকের কপাল ভাঙবে’।
বেহেলী ইউপি    সদস্য ও পিআইসির সভাপতি মনু মিয়া জানান, হালির হাওরে সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর জমি, এই বাঁধ ভাঙলে কয়েক লাখ মানুষের ফসল ডুববে, এজন্য সকলে বাঁধ রক্ষায় নেমেছে।’ তিনি বলেন, এই বাঁধটি প্রথমে ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে আমাকে ও এলাকার আরেকজন (সুফিয়ান)কে দেওয়া হয়েছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডে গিয়ে আমরা দরখাস্ত দিছি, এই কাজটা আমরা নিতাম নায়। পরে তারা আইয়া মাইপ্পা দেখে ইখানো ৭ লাখ মাটি লাগবো।  এর পরে ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করছে। তারা কইছে আমরা তুমরার পাশে আছি, বরাদ্দ আরোও বাড়াইরাম। এর লাগি আমরা কাজও লাগছি। মার্চের ১৩ তারিখের পরে আমরারের ছিইড়া ছিইড়া (কিস্তিতে) টাকা দেয়। ৭০ লাখ টেকার কাজ, আমরারের ৫ লাখ, ৩ লাখ, ২ লাখ টাকা করে ২৪ লাখ টাকা দিছে। আমরা কেমনে কিতা করতাম এই কয় দিনে। ২০০-২৫০ জন লেবার লাগাইয়া কিচ্ছু করতাম পারেরাম না’।
কৃষকদের এসব মন্তব্য কেবল সুন্দরপুর কালীবাড়ি বাঁধে নয়। পুরো হাওরজুড়ে হাহাকার শুরু হয়েছে। ঠিকাদার এবং পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) সঠিকভাবে কাজ না করায় এবং অসময়ে অতিরিক্ত পানি বাড়ায় প্রকৃতির সঙ্গে বাঁচার লড়াই করছেন কৃষকরা।
গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ী ঢলে ইতিমধ্যে ১৫ টি’র মতো ছোট-বড় হাওর তলিয়ে গেছে। অনেক হাওরের বাঁধের অবস্থা টলটলায়মান। হাজার হাজার মানুষ বাঁধ রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই বাঁধের ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।
শনিবার সকালে জেলার বৃহৎ হাওর শালিকা, ডুমাখালি ও মাছুয়াখালি বাঁধ ভেঙে নলুয়ার হাওর ডুবে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর ফসল ইতিমধ্যে ডুবে গেছে। স্থানীয় কৃষকরা বলেছেন, নলুয়ার হাওরে পানি ঢুকায় এর আশপাশের মইয়ার হাওরসহ অন্য হাওরগুলোর জমি ডুবে ১০ থেকে ১২ হাজার হেক্টর ফসল তলিয়ে যাবে।
নলুয়ার হাওরপাড়ের ভুরাখালি গ্রামের দিলরুবা খানম মুঠোফোন বলেন,‘কেউ বাড়িত নাই, বান্দ গিয়া চেষ্টা কররা আটকানি যায়নি। আমরারতো আর কিচ্ছু নাই, অখন হারা বছর খাম কইরা খাওয়া লাগবো, ৪০ হাজার টেকা ঋণ আইন্না ১০ কেয়ার জমি করছিলাম, অখন ঋণ দিতাম কেমনে, খাইতাম কিতা’।
শনিবার যে সব বড় হাওর ডুবেছে এর মধ্যে নলুয়ার হাওর ছাড়াও রয়েছে চন্দ্রসোনারতাল, বরাম, নাইন্দার, চাপতি ও গুরমার হাওর।
তুফানখালি ও কেজাউড়া বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাওয়ার আশংকায় রয়েছে দিরাইয়ের বৃহৎ হাওর বরাম ও চাপতির হাওর এবং এই উপজেলার সরালিটুবা বাঁধ ভেঙে টাঙনির হাওর ডুবে যাচ্ছে। এছাড়া জামালগঞ্জের বৃহৎ পাগনা ও হালির হাওরের বেশিরভাগ বাঁধ হুমকির মুখে রয়েছে। বাঁধের ভাঙন ঠেকানোর নানা চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
শুক্রবার বিকালে হালির হাওরের সুন্দরপুর কালীপুর বাঁধের কাজ তত্বাবধানের সময় সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি) মোহাম্মদ সফিউল আলম বলেন, ‘সুন্দরপুর কালীবাড়ি বাঁধটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ২০০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। গ্রামের সাধারণ লোকজন এখানে এসেছেন। তাদের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি। এখন তুলনামূলকভাবে এখানকার অবস্থা আগের চেয়ে ভাল। এই বাঁধটি ঠেকানো না গেলে হালির হাওর তলিয়ে যাবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক জাহেদুল হক শনিবার বিকালে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে জানান, বাঁধ ভেঙে ও জলাবদ্ধতার কারণে জেলার ৭ হাজার হেক্টর ফলানো বোরো জমি তলিয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় ঝুঁকির পরিমাণ বাড়ছে। তাহিরপুরের শনি ও মাটিয়ান এবং দিরাই উপজেলার বরাম হাওর বেশ ঝুঁকিতে আছে।’
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আফছর উদ্দিন বলেন,‘আমাদের রক্ষণাবেক্ষণকৃত ৩৭ টি হাওরের মধ্যে নলুয়া, চন্দ্রসোনারতাল, বরাম, নাইন্দা, চাপতি ও গুরমার হাওরে পানি ঢুকেছে। তাতে ৯৩৫২ হেক্টর জমির ফসল ডুবেছে। পানি হাওরের বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।’

  • [১]