- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

এক ছটাক ধানও দিতে পারেন নি কৃষকরা

বিশেষ প্রতিনিধি
সরকারি ধান কেনা শুরু’র আনুষ্ঠানিকতার ১২ দিন (সোমবার পর্যন্ত) পার হলেও সুনামগঞ্জে উদ্বোধনী পর্বে কেনা দুই কৃষকের ধানই কেবল খাদ্য গোদামে আছে। আর কোন ধান কোথাও কেনা হয় নি। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান না কেনায় ফড়িয়া মহাজনদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করছেন কৃষকরা। কৃষক নেতারা বলেছেন, কাগজে সরকারি ধান কেনার উদ্বোধন হয়েছে, বাস্তবে কোথাও ধান কেনা শুরু হয় নি। সরকার ধান কেনা শুরু করলে বাজারে ধানের দাম আপনা থেকেই বেড়ে যায়। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে না গিয়েও কৃষকরা তখন ন্যায্যমূল্য পান।
সুনামগঞ্জে এবার বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে ১৩ লাখ ৫২ হাজার টন। সরকার এই জেলায় ধান কিনবে ২৮ হাজার ৬৬৬ টন এবং চাল কিনবে ১০ হাজার ৯২৪ টন। গেল ২৮ এপ্রিল দুইজন কৃষকের কাছ থেকে ৬ টন ধান কেনার মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জের ধান কেনার উদ্বোধন করেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। এরপর জেলার আর কোথাও কোন ধান কেনা হয় নি। খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকের তালিকা পাওয়া যায় নি জানালেও কৃষি বিভাগ বলেছে, জেলার চার উপজেলায় অ্যাপসের মাধ্যমে কৃষকের তালিকা হচ্ছে, তাও শেষ এবং অন্য আরও দুই উপজেলায় তালিকা সমঝে দেওয়া হয়েছে। কৃষক নেতারা বলছেন, তারা (খাদ্য গোদাম কতৃর্পক্ষ) ধান কেনার প্রস্তুতি নিতে নিতে কৃষকের ধান চলে যাবে ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনদের হাতে।
শাল্লা সদরের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষক নেতা আব্দুস সাত্তার বললেন, গ্রামে গ্রামে ধানের আড়ৎদারের নৌকা যাচ্ছে, কৃষকরাও শুকনা ধান ৮১০ টাকা এবং ভেজা ধান ৭২০-৭৩০ টাকা মণে বিক্রয় করছেন।

ধান কিনছেন ফড়িয়া মহাজনরা


এই উপজেলার কান্দিগাঁওয়ের কৃষক তৈয়বুর রহমান বললেন, খাদ্য গোদামে ধান কেনা শুরু হলে পরের দিনই ধানের দাম মণে ৫০ টাকা বেড়ে যাবে। খাদ্য গোদামের সংশ্লিষ্টরাই মিল মালিক ও আড়ৎদারদের কম দামে ধান কেনার সুযোগ করে দেন।
বিশ^ম্ভরপুরের মথুরকান্দির কৃষক মোবারক আলম বললেন, সোমবার মথুরকান্দিতে বিআর ২৯ জাতের শুকনা ধান ৭০০ টাকা এবং বিআর ২৮ জাতের ধান ৭৮০ থেকে ৮২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এই দামে ধান বিক্রয় করলে যারা সেচের মাধ্যমে ধান চাষাবাদ করেছে তাদের লোকসান হবে।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার কৃষক নেতা স্বপন কুমার বর্মণ বললেন, ব্যাপারি বিদায় করা, মহাজনের ঋণ দেওয়াসহ নানা প্রয়োজনে এই সময়ে কৃষকদের ধান বিক্রয় করতে হয়। সরকারি ক্রয়কেন্দ্র ১০৮০ টাকা মণে ধান কিনলে, বাজারের আড়ৎদাররা বাধ্য হয়ে ১০০০ টাকায় ধান কিনবে। সরকার সেই উদ্দেশ্যেই ২৮ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধান কেনা শুরু করেছে। কিন্তু বাস্তবে ধান কেনা হচ্ছে না জেলার কোথাও।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগর উপজেলার মধ্যনগর বাজার। সোমবার এই আড়তে শুকনা বিআর ২৮ ধান ৯৬০ টাকা, বিআর ২৯ ধান ৯১৫ টাকা, মোটা ধান ৮০০ টাকা মণে কিনেছেন আড়ৎদাররা।
আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেছেন, প্রতিদিন মধ্যনগরের ৩৪ জন আড়ৎদার ৭-৮ হাজার মণ ধান কিনছেন। দিনে দিনে কেনার পরিমাণ বাড়বে।
কৃষক সগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বললেন, সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে এখন ধান কেনা হলে কৃষকরা ফড়িয়া বা আড়তে ধান বিক্রয় করলেও দাম বেশি পেতো। সপ্তাহ—১০ দিন পরে কৃষকদের কাছে বিক্রি করার ধানই থাকবে না। ধানের দাম বেশি পেলে কৃষকের মুখে হাসি থাকে, ন্যায্য দাম না পেলে হতাশ হন তারা। তিনি জানালেন, কাগুজে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান কেনা শুরু হলেও বাস্তবে ধান কিনছে ফড়িয়া মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনরা।
জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ধীরাজ নন্দি চৌধুরী বললেন, কৃষি অফিস কৃষকের তালিকা দিতে না পারায় ধান কেনা শুরু করতে পারছেন না তারা।
দিরাই উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বললেন, এই উপজেলায় অ্যাপসের মাধ্যমে কৃষক তালিকা হচ্ছে। সোমবার পর্যন্ত ৩০০ কৃষকের আবেদন হয়েছে। ধান কেন শুরু করতে আরও কৃষকের আবেদন প্রয়োজন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ধান কেনা শুরু করা যাবে বলে মন্তব্য করলেন তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, ধর্মপাশায় ১৩ হাজার ৮৪৩ জন এবং শাল্লায় এক হাজার ২০০ কৃষকের তালিকা দেওয়া হয়েছে, অ্যাপসের মাধ্যমে তাহিরপুরে ১১ শ’ ১০ এবং সুনামগঞ্জ সদরে পাঁচ হাজার কৃষকের তালিকা হয়েছে। ছাতক উপজেলায় আগামীকাল মঙ্গলবার কৃষক তালিকা সমঝে দেওয়া হবে। এসব উপজেলায় ইচ্ছা করলেই কৃষকের ধান কেনা শুরু করা যায় বলে মন্তব্য তার।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা নকিব উদ্দিন চৌধুরী এ প্রতিবেদককে প্রথমে জুনের প্রথম সপ্তাহে ধান কেনা যাবে বলে জানান। কিছুক্ষণ পর ফোন দিয়ে জানান, ১৫ মে থেকে ধান কিনতে পারবেন তারা। তিনি জানালেন, কৃষি অফিস থেকে কৃষক তালিকা পাবার পর, উপজেলা ক্রয় কমিটি লটারী করবে, লটারীতে যাদের নাম ওঠবে তাদের কাছ থেকে তিন টন করে ধান কেনা হবে।

  • [১]