- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

এখনও হয় নি কার্যকর

বিশেষ প্রতিনিধি ও এনামুল হক
শিক্ষার্থী বেতনের টাকা না পেয়ে বেকায়দায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ৬৮ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। গেল বছর হাওরে ফসলডুবির পর নিজের নির্বাচনী এলাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ৬৮ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক বছরের বেতন পরিশোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা-মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর) আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন পরিশোধ করার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু ডিসেম্বর মাস পেরিয়ে শুরু হলো নতুন বছর। শিক্ষার্থীদের বেতন আদায় না হওয়ায় বেশীরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের বেতন উত্তোলন করতে না পারায় বাধাগ্রস্থ হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নানা উন্নয়ন কার্যক্রম। সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন অবশ্য বলেছেন,‘এই মাসের শেষের দিকে ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জ হাইস্কুলের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মহোদয়গণের উপস্থিতিতে নির্বাচনী এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকা পরিশোধ করা হবে।’
গেল বছর হাওরে ফসলডুবির পর ১৩ মে তাহিরপুরে এক সভায় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ৩ উপজেলা জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও তাহিরপুর এবং মধ্যনগর থানার ৬৮ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন ব্যক্তিগত তহবিল থেকে পরিশোধের ঘোষণা দেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি অবগত করেন তিনি। পরে সংশ্লিষ্ট মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এক বছরের শিক্ষার্থীদের বেতনের চাহিদা জমা দেয়। এমপির এমন ঘোষণাকে স্বাগত জানায় হাওরবাসী।
এই ঘোষণার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের বেতন উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়। তবে কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেতন আদায় অব্যাহত রাখে। এ নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সাথে অভিভাবকদের মতপার্থক্য শুরু হয়। ধর্মপাশা উপজেলার বাদশাগঞ্জ পাবলিক হাই স্কুলের (সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র) শিক্ষার্থীদের এক বছরের বেতন ৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার মধ্যে গত ৬ সেপ্টেম্বর ১ লাখ টাকা পরিশোধ করেন তিনি। বাদশাগঞ্জ পাবলিক হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আলাল উদ্দিন বলেন, ‘জানুয়ারি মাসের মধ্যেই এমপি সাহেব বকেয়া বেতন পরিশোধ করবেন বলে মঙ্গলবার জানিয়েছেন’।
ধর্মপাশা জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ হাজারের উপরে। খন্ডকালীন শিক্ষকসহ মোট ২৭ জন শিক্ষক পাঠদান করেন এই বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক বছরের বেতন ১৭ লাখ টাকা। শিক্ষার্থীরা বেতন পরিশোধ না করায় শিক্ষকদের বেতন ঠিকমত পরিশোধ করতে পারছে না বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শুধু এ বিদ্যালয়ই নয় ধর্মপাশা, মধ্যনগর, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার মোট ৬৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই এখন বিপাকে। তবে কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ভয়ে এমন অবস্থা স্বীকার করতে নারাজ।
ধর্মপাশা জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আলমগীর কবির বলেন, ‘গত জুন মাস থেকে শিক্ষার্থীদের বেতন আদায় বন্ধ রয়েছে। এ কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন পরিশোধসহ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে সভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়া পর্যন্ত যদি এমপি সাহেব বেতন পরিশোধ না করেন তাহলে আমরা আন্দোলনে যাবো।’
ধর্মপাশা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীদের এক বছরের বকেয়া বেতন প্রায় ১০ লাখ টাকা। বুধবার দুপুর পর্যন্ত এই টাকা পরিশোধ হয় নি বলে জানিয়েছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।
জামালগঞ্জের ভীমখালি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন,‘গত জুন মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিটন খিসা’র পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ ছিল, আমরা যেন শিক্ষার্থীদের বেতন দেবার জন্য চাপাচাপি না করি, শিক্ষার্থীদের বেতন সংসদ সদস্য মহোদয় দেবেন। পরে আমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তার হোসেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করি, তাঁরা এ ব্যাপারে কোন সহযোগিতা করতে পারেন নি। পরিচালনা কমিটির দুই জন সদস্য পরে যোগাযোগ করেও কোন সাড়া পাননি। এক পর্যায়ে বিদ্যালয় আর্থিক সংকটে পড়ায় নভেম্বর মাস থেকে আমরা শিক্ষার্থীদের বেতন নেওয়া শুরু করি। ৪ মাসের বেতন সকলের কাছেই বকেয়া রয়েছে। মানুষের যে অবস্থা এখন বকেয়া বেতন চাওয়ার কোন সুযোগ নেই।’
জামালগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. হাবিবুর রহমান বলেন,‘এমপি সাহেব চিঠি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বেতন তিনি দেবার কথা জানানোয় জুন মাস থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বেতন নেওয়া হয়নি। গত ১৮ ডিসেম্বর এইচএসসি পরীক্ষার ফরম ফিল আপের সময় ৮০০ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ জনের বেতন আদায়ের পর এমপি সাহেব বেতন পরিশোধের কথা পুনর্বার বলায় অন্যদের বেতন নেওয়া হয় নি। যাদের বেতন নেওয়া হয়েছে, তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এমপি সাহেব টাকা দিলে তাদের টাকা ফেরৎ পাবে।’
তাহিরপুরের জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোদাচ্ছির আলম সুবল বলেন,‘গত মে মাস থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেতন নেওয়া হয়নি। তাহিরপুরের ২৪ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিউশন ফি বাবদ ২৭ লাখ ৭২ হাজার ২০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। সংসদ সদস্য আমাকে ফোনে বলেছেন এই টাকা এই মাসের মধ্যেই তিনি পরিশোধ করবেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উল্লেখ করা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল নয় শিক্ষার্থীদের বেতন না পেয়ে জটিলতায় পড়েছে সুনামগঞ্জ-১ আসনের সকল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বললেন,‘আমার সদিচ্ছার অভাব নেই। ইতিমধ্যে জামালগঞ্জের দুয়েকটি এবং ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে কিছু টাকা আমি দিয়েছি। মানুষের বিপদের সময় আমি যেভাবে পারি পাশে দাঁড়িয়েছি। আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবো না, এই কথা কাউকে বলি নি। এই মাসের শেষের দিকে বাদশাগঞ্জ হাইস্কুলের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হবে। অনুষ্ঠানে ৪-৫ জন মাননীয় মন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মন্ত্রী মহোদয়গণের উপস্থিতিতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছে শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকা তুলে দেওয়া হবে। যে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে, তাঁদেরকেও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হবে।’

  • [১]