- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

‘এখন দেখি কোন দিখে বাইরছ’

স্টাফ রিপোর্টার
আমরা ডরাইয়া আগের মতো ঘর থাইক্কা বের হই না। সব সময় ভেতরে একটা আতংক থাকে। কথাগুলো বকাটেদের হামলার শিকার পপি- চামেলীর কাকা সতেন্দ্র বর্মনের। গেল ১৪ এপ্রিল (বুধবার) পপি-চামেলীর বাড়িতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছিল পাশের টুকেরগাঁও গ্রামের একদল বখাটে। হামলায় বৃদ্ধ ও নারীসহ আটজন আহত হয়েছেন।
হামলার দিন রাতেই ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে ২৫ জনকে আসামি করে পপি-চামেলীর কাকা সত্যেন্দ্র বর্মণ তাহিরপুর থানায় মামলা করেন। পুলিশ এই মামলায় তিন জনকে গ্রেপ্তারও করে। তবে রোববার দুপুরে তারা জামিন পেয়েছে। এখন তারা আবারও তার পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে বলে জানান সতেন্দ্র বর্মন।
তিনি বলেন, ‘‘আসামী শহিদ ও সিরাজসহ মোট ৩ জনকে পুলিশ ধরেছিলো। রোববার দুপুরে তারা জামিনে ছাড়া পেয়েছে। এসে আবারও হুমকি দিচ্ছে। বলছে, ‘জেল থাকি আমরা আইছি, তোরা কিছুই করতে পারসস না, আমরা আরও অনেক বড় বড় ঘটনা করছি, কিছুই হয়নি, তরারে মামলা করতে এই বুদ্ধি দিছে কেলায়? এখন দেখি কোন দিখে বাইরছ।’’
সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার বৌলাই নদীর পূর্ব পাড়ের গ্রাম টুকেরগাঁও। পশ্চিম পাড়ে টাকাটুকিয়া গ্রাম। টাকাটুকিয়া গ্রামে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা মিলেমিশে বসবাস করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের মাঝে ভালোবাসা আর সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি হয়েছে। তবে টুকেরগাঁও গ্রামের কিছু বখাটে তরুণ বহুদিন ধরেই বর্মণ পাড়ার স্কুল পড়ূয়া ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করে আসছে।
এই বিষয়টি নিয়ে গ্রামের বিশিষ্টজনরা জামালগড়, রসুলপুর ও টুকেরগাঁও গ্রামের গণ্যমান্যদের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠক করে টুকেরগাঁওয়ের মোক্তার আলীর ছেলে বখাটে কাশেম মিয়া, শহীদ মিয়ার ছেলে লাইট মিয়া ওরফে রুহিত, বিল্লাল মিয়ার ছেলে মুসা মিয়া ও মুক্তার আলীর ছেলে পাবেল মিয়া, সিরাজ মিয়ার ছেলে মেজর আলীকে বখাটেপনার জন্য সামাজিক বিচারে শাস্তি দিয়েছিলেন। তাদের সালিশে কান ধরে উঠবস করানো হয়। ভবিষ্যতে এমন কাজ করবে না বলে সালিশে অঙ্গীকারও করেছিল তারা।
এই বিচারের পর আরও ক্ষেপে যায় বখাটেরা। তারা নানাভাবে বর্মণ পরিবারের লোকজনের ক্ষতি করতে থাকে। ছয় মাস আগে দেবেন্দ্র বর্মণের ছেলে বাছিন্দ্র বর্মণের ৫০ হাজার টাকা দামের জালে আগুন দেয়। এরপর খড়ের ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বুধবার ৩০-৩৫ জনের সশস্ত্র দল বর্মণ বাড়িতে হামলা করে পুরুষ ও নারীদের মারধর এবং ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করেছে।
হামলার শিকার হওয়া সঞ্জিত বর্মণ বললেন, হত্যার উদ্যেশে আমাদের উপর পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে তারা। আমরা মামলাও করেছি। পুলিশ মাত্র ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। আবার এই তিন জন ছাড়া পেয়ে গেছে। তারা গ্রামে এসে আবারও আমাদের হুমকি দিচ্ছে। বাকি আসামীরাও রাতে এসে হুমকি দিচ্ছে। এই অবস্থায় নিজের বাড়িতে থেকেও ভয় পাচ্ছি।
গ্রামের বাসিন্দা শাহারুল ইসলাম আলী বললেন, আসামীরা জামিন পেয়ে বাড়ি এসে আবারও হুমকি দিচ্ছে। এই ঘটনা দেখে এলাকার নিরীহ মানুষ ভয়ে আছে।’
এই সন্ত্রাসী হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বাবুল বর্মন। এবার তার এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহনের কথা। করোনা মহামারির কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় বাড়ি থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সে। কিন্তু বুধবারের অনাকাঙ্খিত ঘটনায় সে গুরুতর জখম হয়েছে।
শিক্ষার্থী বাবুল বর্মনের সহপাঠি উদয় আচার্য্য জানায়, বখাটেদের যন্ত্রনায় ঘরেও থাকা যায় না। গ্রামের নিরীহ মানুষ ভয়ে কিছু বলেনি এতোদিন। বাড়িতে এসেও মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতো এরা। বুধবার হঠাৎ করে তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়িতে এসে হামলা করে। বাবুলকে একা পেয়ে দাঁড়ালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে। এখন সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।
সত্যেন্দ্র বর্মনের পাশের বাড়ির বাসিন্দা দিলীপ আচার্য্য জানালেন, বকাটেরা তাদের বাড়ির মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতো। নদীতে ¯œান করার সময় ওপার থেকে মোবাইলে ছবি তুলতো। পরে তারা মেয়েদের নদীতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে বাড়ির টিউবওয়েলে ¯œান করার সময় বাড়িতে এসে বিরক্ত করতো, বাধা দিয়েছিলাম বলে রাতে বাড়িতে ঢিল ছুড়েছে কয়েকদিন।
তাহিরপুর থানার ওসি আব্দুল লতিফ তরফদার বললেন, এই মামলার বাকী আসামিদেরও আটক করতে অভিযান অব্যাহত আছে। হামলার শিকার হওয়া পরিবারের প্রতি আমাদের নজরদারি রয়েছে। প্রতিনিয়ত আমরা তাদের খোঁজ খবর নিচ্ছি। জামিন পাওয়া আসামিরা আবারও সত্যেন্দ্র বর্মনের পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে? এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে এরকম কোনো তথ্য নেই, বাদীর পরিবারের পক্ষ থেকেও এবিষয়ে কোনো অভিযোগ আসে নি।

  • [১]