- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
সুনামগঞ্জ থেকে বেড়িয়ে পড়া
পরদিন ইসালেহরাসহ নানা ভাই আমাদের নিয়ে নৌকায় উঠেন। যাই আছিনপুর। নানা ভাইর খালার বাড়ী ২/৩ দিন ওখানে থাকি। নানা ভাই আর আব্বা, আলফাত মামা, দাদাসহ কারও কারও সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেন। দাদা আর মতিউর মামার কোন খবরই যোগার হয় না। সালেহদের মুর্তাখাই পাঠানোর খবর পাঠান মামা। আমরা কোনদিকে যাবো তার চিন্তা করা হয়। আব্বার এক কথা তাকে জয়কল সেতার ভাইদের কাছে যেতেই হবে। দাদা অনিয়শ্চয়তার মাঝে চলে গেছেন, উনার ভাইকে
ৎ গিয়ে সান্তনা দিতে হবে। আরও অনেক দরকার। নানা ভাই আমাদের একা ছাড়বেন না। একটা বড় নৌকা ভাড়া করা হয়। গন্তব্য আমাদের বাড়ী। জয়কলসে আমরা নেমে যাই। একই নৌকা সালেহদের মূর্তাখাই নিয়ে যায়। পরে মামীদের মামা ইন্ডিয়া নেয়ার ব্যবস্থা করেন। বাড়ীতে যাওয়ার পর আমার ছয় বাপ চাচা একত্রে কাঁদতে থাকেন হু হু করে কান্না। তাদের ছেলে রব্বানীর জন্য। কিছুটা দোষারোপও করেন আব্বাকে। একবার বাড়ীতে নিয়ে আসলেন না কেনো ? এটা যে সম্ভব না সেটা তাদের বুঝানো কঠিন হয়। নানা ভাই প্রথম বোধহয় মেয়ের বাড়ী থাকতে গেছেন। খাসী মুরগী মাছ সব রান্না হচ্ছে। কিন্তু মনে শান্তি নাই। আমাদের গ্রামের নাম উজানীগাঁও। মূলত: জয়কলস। সুনামগঞ্জের অনতি দূরে। সিলেট সুনামগঞ্জ রাস্তার পাশে। এই গ্রামের আমার আব্বা বাম ঘরানার প্রথম সারির নেতা। আর ভাই গোলাম রব্বানী ঐ সময়ের এক ডাকে চেনা ছাত্রনেতা। বলা যায় যে যে কাজই করুক, নাম হতো রব্বানী করেছে এই ধরনের অবস্থা। পাকবাহিনীর লিস্টে প্রথম সারিতে নাম থাকবেই। কাজেই সিলেট থেকে যাওয়ার পথে আমাদের বাড়ী আক্রমন করার সমূহ সম্ভাবনা। এছাড়া রাস্তার পাশেই বড় জালু বলে আওয়ামী লীগের এক চৌকষ কর্মী এই গ্রামের, কাজেই এই গ্রামে আক্রমন হতে পারে সবার ধারনা। আর পাক আর্মি যাওয়ার পথে আশেপাশে বিনা কারণে ও মানুষ হত্যা করে ত্রাসের সৃষ্টি করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। চাচারা আমাদের বাড়ীতে রাখতে সাহস পাচ্ছেন না। উঠানে বসেছেন সিদ্ধান্ত নিতে। প্রত্যেকে দ্রুত কথা বলছেন। এটা আমাদের বংশগত সমস্যা। প্রত্যেকের কথার বেগ এমন হচ্ছে যে নানাভাই মনে করেন নিশ্চয় কোন সমস্যা হয়েছে বা এরা ঝগড়া লেগেছে। ভয়ে দৌঁড়ে আসেন কি ব্যাপার ? চাচারা বলেন বসেন তালই সাব আমরা গপ করি। নানা ভাইর জানে পানি আসে। এই দ্রুত কথা বলা আমি আর আবেদীন ইনহেরিট করেছি। তৃতীয় জেনারেশনেও চলে এসেছে। সে যাই হউক ঐ মিটিং যেই সিদ্ধান্ত হয় আমাদের এ গ্রামে থাকা ঠিক না। চলে যেতে হবে অন্য কোথাও।
শ্যামারচরে যাত্রা ও চরনার চরে যাত্রাবিরতি
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়। পাক আর্মি তখনও সুনামগঞ্জে আসে নাই। প্রতিদিনই শুনা যাচ্ছে ঐ আসতেছে। যুদ্ধের কিছুই তখন ঠিক হয় নাই। শুধু স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছে। সুনামগঞ্জে ৫/৭ জন পাকসেনাকে পরাজিত করা গেছে। কিন্তু এর উত্তর কি ভয়ংকর ভাবে আসে তা হৃদয়ঙ্গম করে সুনামগঞ্জে শহরের মানুষ শহর ছেড়েছে। ইন্ডিয়ায় ঢুকার পথও তখনও উন্মুক্ত হয় নাই। যারা ঢুকে যাচ্ছে তাদের থাকা খাওয়া আর অসুখের যেসব খবর আসছে তাও ভয়াবহ। জয়কলস আমাদের ছাড়তে হবে সবাই একমত। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায় ? আমরা বেশ কয়েক জন লোক। আমরা ছয় ভাইবোন আব্বা আম্মা। নানাভাই, ছোটমামা, নানা আর নানা ভাইর কমর্চারী আবু ভাইর ফ্যামেলী উনার মাসহ আরও আটজন প্রায়বিশ জনলোক এক সাথে কোথায় যাওয়া যায় সেই চিন্তা।
নানা ভাই যেখানেই যাবেন আমাদের ছাড়া যাবেন না। তখনই শ্যামারচরের নাম আসে। রিমোট এলাকা। তাদের বহুদিনের দাওয়াত পেন্ডিং। শ্যামারচর আম্মার দুই খালার শ্বশুরবাড়ী। শ্যমারচরের খালিক মিয়া চেয়ারম্যানের সংগে আম্মার পাঁচ নম্বও খালার বিয়ে হয়েছে। তার ছোট ভাই কদর আলীর সঙ্গে হয়েছে সবার ছোট খালার। জ্যাতি নানী আরশফি নানী। সমবয়সী এই খালাদেও সংগে একত্রে আম্মা বড় হয়েছেন। খালার সম্পর্ক ছাড়াও বন্ধুবন্ধু ভাব এর সম্পর্ক। তাদের বিয়েও হয়েছে কাছাকাছি সময়ে। বছর খানেক আগে পরে। সফি নানীর বিয়ে হয়েছে তার দু”বৎসর পর। এই এতো বছরে নানা ভাই তার শালীদের বাড়ী যাওয়ার শুধুদাওয়াত ই পেয়ে এসেছেন। যাওয়া হয়ে উঠে নাই। এই কঠিন সময়ে সেই দাওয়াত রাখার কথাই মনে হলো।
সর্বোপরি শুনেছেন এরা খুবই ধনাঢ্য ব্যক্তি। এতো মানুষ গেলে অখুশী হবে না। আব্বা ও রাজী। এই খালুর সংগে উনারও সম্পর্ক মধুর। ঐ এলাকার সব মামলা উনি আব্বাকে রেফার করেন। এই ক্রান্তিকালে কয়েক দিন ঠান্ডা মাথায় থেকে দেশের অবস্থা বুঝে যুদ্ধের খবরা খবর নিয়ে যাওয়া যাবে। ইন্ডিয়ার বর্ডার খোলার পর সেখানে যেতে হবে। আপাতত: বাড়ী থেকে বেরুতে হবে। চাচারাও রাজী হলেন। এমনিতেই পাকআর্মি কখন এসে পড়ে সেজন্য বড় চাচা বাড়ী থাকেন না। তিনি রব্বানীর পিতা। গ্রামের পন্চায়েত প্রধান। নানা কারন। অন্য চাচাদের মধ্যে একজন সবসময় মসজিদে থাকেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ছেলেকে বাড়ীতে রেখে মসজিদেই তার অবস্থান। অন্যরা জমিজমা দেখশুনা করেন অতো ভয় পান না। কিন্তু আমাদেরকে নিয়ে তারা আতঙ্কিত। বিশেষ করে আব্বার জন্যে। উনার এই স্বাভাবিক চলতে না পারার বিষয়টি ছাড়াও উনার রাজনৈতিক পরিচয়ও তাকে বাড়ীতে না থাকার কারণ হয়ে উঠে। এছাড়া নানাভাইও আওয়ামীলীগের প্রথম সারির নেতা। রাস্তার পাশে এই গ্রামে থাকা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। তাই আমাদের যেতে হবে । চাচাতো ভাইবোনের সংগে খেলাধুলা করে, নাইন্দাগাঙ এ সাঁতার কেটে বেশ মজায়ই কাটছিলো কয়েকদিন। ছয় চাচার ছেলেমেয়ে আমরা ছোট মামা সাব্বির আহমেদ, শিবানীরা, অমরা ছয় ভাই বোন হৈল্লুর করে কাটাচ্ছিলাম। আবার অনিশ্চিত যাত্রা। খুব খুশী ছিলাম না। তবু এক সকালে বড় এক নৌকা করে রওয়ানা হলাম শ্যামারচরের উদ্দেশ্যে। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ। নদী শুকিয়ে গেছে। বড় নৌকা আস্তে ধীরে যাচ্ছে। আব্বা নৌকার বাইরে দাঁড়িয়ে আমাদের কোনটা কোন গ্রাম তিনি কবে এসেছিলেন তার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। কোন গ্রামে আমাদের আত্মীয় আছে তা বলছিলেন। নদীতে মহিলারা গোসল করছে তাদের যুদ্ধ নিয়ে কোন টেনশন আছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। এই পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে সব ঠিক হয়ে গেছে। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে। আমাদের পাড়ার সেই খেলার সাথীরা কোথায় গেছে? আমাদের পাড়ার সেই বিভিন্ন খেলার মাঠ? কবে আবার ফিরে যাবো আব্বাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছি। আব্বা কিছুরই সঠিক উত্তর দিতে পারছেন না। তিনি টিনশনে আছেন বুঝতে পারি তবুও প্রশ্ন করে যাই। বড়দের টেনশন ছোটদের আচ্ছন্ন করে। দীর্ঘ পথ শেষ হয় না। সুরমা নদী থেকে কালনী নদীতে নৌকা পৌঁছে। আব্বা বলেন এটা কালনী নদী। কালনী নদী বইয়ে পড়েছি। নিজ চোখে দেখি। তফাৎ কি তা বুঝি না। নৌকায় রান্না হয়। আমরা সবাই মিলে খাই। কিন্তু কোন আনন্দ নাই। কি এক ভয় তাড়া করে। অনিশ্চিত সে ভয়। কবে বাসায় ফিরবো শুধু সেই চিন্তাই করি। আব্বাকে জিজ্ঞেস করি তিনি উদাস দৃষ্টিতে নদী দেখতে থাকেন। আর গুনগুন করে আমার সোনার বাংলা গাইতে থাকেন। এ যাত্রায় নানাই শুধু উৎফুল্ল। হয়তো বোনদের সনে দেখা হবে এ জন্য। নানা ভাই ছইয়ের নীচে ঘুমাতে চেষ্টা করেন। এই অনিশ্চিত যাত্রা কবে শেষ হবে হয়তো তাই ভাবতে থাকেন। আমরা ছোটরা আব্বাসহ গ্রাম জীবন দেখতে থাকি। (চলবে)

  • [১]