জেসমিন সাদিক
চরনারচরে যাত্রা বিরতি ও শ্যামারচরে অবস্থান
সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আব্বা নানা ভাইকে বলেন, উনার বন্ধু নিশি চৌধুরীর বাড়ীতে তিনি উঠতে চান চরনারচরে। বহুবার উনাকে যেতে বলেছেন আসা হয় নাই। তিনি এ এলাকার জমিদার ছিলেন গেলে খুশী হবেন। নানা ভাই রাজী হন। নৌকা ঘাটে ভিড়ে। নৌকা থেকে খবর পাঠানো হয়। আমাদের পৌঁছার। তিনি নিজে ঘাটে চলে আসেন। দীর্ঘদেহী লোক। খুব আন্তরিকভাবে আমাদের নিয়ে যান। অনেক সুন্দর বনেদী বাড়ী। পাকা বাড়ী অনেক জায়গা নিয়ে গাছগাছালিতে পূর্ণ। বুঝা যায় এরা পুরোনো জমিদার। রাত্রে অনেক রকম খাওয়া দাওয়া হয়। দেশের অবস্থা আলোচনা হয়। নানা ভাইকেও উনি খুব সম্মান দেখান। মহিলা মহলে আম্মা, নানা গল্প জুড়ে দেন। এই দিনই ইন্ডিয়ার খবরে মুজিবনগর সরকার ঘোষণা হয়েছে জানা যায়। আব্বারা উৎফুল হন। ইন্ডিয়া সীমান্ত খোলার ডিকলারেশন এখন দেবে আশা করা যায়। এই কয়দিন বাংলাদেশীরা সীমান্তে ভিড় করেছে কেউ কেউ ঢুকেও পড়েছে। আর অবর্ননীয় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। অফিসিয়েল ডিক্লারেশন দিলে মানুষেরা থাকা খাওয়ার পথ পাবে এইসব আলোচনা হয়। এই সময় তিনি আব্বাকে বলেন, শ্যামারচর কেন যাচ্ছেন? খালিক মিয়া পিডিপি থেকে ইলেকশন করেছে। তার এখানে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে? আব্বা উত্তরে বলেন, দেশের এই সময়ে সবাই এক। দেখেনিও সবাই এক হয়ে যুদ্ধ করবে। এখন আলাদা চিন্তা করা ঠিক না। সবচেয়ে বড় কথা খালিক মিয়া দেশের পক্ষে থাকবে। তাকে নিয়েই ইন্ডিয়া যাবেন। এখন আলাদা করে দিলে দেশের ক্ষতি হবে। এখনও সুযোগ আছে দেশের সবাইকে এক করেই আগাতে হবে। শেষে বলেন, আমরা কয়েক দিনের জন্য যাচ্ছি। উনার শরীরের এই অবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে যেতে চাচ্ছেন না। ইন্ডিয়াতেই শেষ পর্যন্ত যেতে হবে। একটু সময় ক্ষেপনের জন্য এখানে এসছেন। ওখানে আরও একদিন থাকি। এপ্রিলের ১৮/১৯ তারিখে আমরা আবার শ্যাম্যারচরের দিকে রওয়ানা হই। নৌকায় আব্বা নানা ভাইকে বলেন নিশি বাবুর বলা কথা। নানা ভাই বলেন, এরা জমিদার ছিলো, এর মাঝে খালিক মিয়া চেয়ারম্যান হওয়ায় এলাকার রেষারেষি আছে, এ জন্য হয়তো বলেছে। আমরা বেশী দিন থাকবো না আরও অনেককে যুদ্ধে নিয়ে যাবো। এ সময় যত বেশী মানুষকে দেশের পক্ষে সম্পৃক্ত করা যায় তত মঙ্গল। খালিক মিয়া দেশের এই অবস্থায় কোনদিনও বিপক্ষে থাকবে না। এছাড়া কোন দলই তো এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের পক্ষ নেয় নাই। গিয়ে দেখবো। যদি দেখি উল্টাপাল্টা কথা বলে. চলে আসবো। দুই ঘন্টার মধ্যে আমরা শ্যামারচরে নামি।
নানা ভাইর দুই ভায়রা ভাই-ই আমাদের নৌকা থেকে যতেœর সাথে আনন্দ চিত্তে নিয়ে যান। এদের বিশাল বাড়ী দেখে আমরা থমকে যাই। একেকটা উঠানে ১০০/২০০ মন করে ধান শুকানো হয়। একেক ভাড়ালে ১০০০/১৫০০ মন ধান রাখা হয়। ভাড়াল যে কয়টা গুনতে হবে। আমাদের বাড়ীর ধান আর গোলা দেখে আমরা মুগ্ধ ছিলাম। এদের আবস্থা দেখে অবাক হওয়া ছাড়া গতি নাই। নানাভাইও বোধহয় এমনটা ভাবেন নাই। বিরাট বাড়ী অনেক লোকজন। বৈশাখ মাস ধানের মৌসুম ধান আসছে, শুকানো হচ্ছে, এ যেনো এক বিশাল আয়োজন। গিয়ে দেখি আমাদের আগেই আম্মার দুই মামা সরওয়ার নানা আর হেলেন নানা বাচ্চা কাচ্চা বড়মাসহ তাদের বাড়ীতে। সবার সনে দেখা হয়। আমাদের জায়গা হয় সফিনানীর বাড়ীতে। সফিনানী আম্মার ছোট খালা। কদর আলী, খালিক মিয়ার সহোদর। দুই জনের দুই বাড়ী। দুই বাড়ীর মাঝে ৮/১০ হাতের জোড় ঘরা। (গ্রামের বাড়ীতে আলাদা সীমানা নির্দিষ্টকরন জায়গা)। আলাদা উঠান আলাদা বাড়ী। কদর আলী মিয়া খালিক মিয়া সহোদর হলেও , নি:সন্তান চাচার কাছে মানুষ। তাই তিনি চাচার সম্পত্তিতে ওয়ারিশান। জ্যোতি নানীর আট ছেলে মেয়ে। সফিনানীরও ছয় জন। আমরা আঠরোজন উনাদের দুইবাড়ীতে প্রায় একশ জনের রান্নাবান্না। এলাহি কারবারে গিয়ে পড়ি। খালা মামাদের সাথে খেলা করে বিরাট পুকুরে সাঁতার কেটে ৪/৫ দিন আনন্দেই কেটে যায়। এরই মাঝে আব্বা ও নানাভাই তাদের মনোবাসনা উনাকে সহ যুদ্ধে গমনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনিও রাজী হন। আব্বা উনাকে চরনাচরের নিশি বাবুর কথাও বলেন। উনি তখন বলেন, এদের সাথে তার অনেক সমস্যা আছে, উনারা এলাকার জমিদার ছিলেন। তিনি উঠতি নেতা। এলাকার প্রধান্য নিয়ে নানান সমস্যা হয়। কিন্তু দেশের প্রশ্নে অবশ্যই তিনি বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে। ধান তুলার ঝামেলা শেষ করেই তিনি একসাথে ইন্ডিয়া চলে যাবেন। আব্বা আশ্বস্ত হন। আর বলেন, আপনার লোকদের ট্রেনিং নেয়া দরকার। এদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেন। আমি বসে থেকে ট্রেনিং দেবো। দু’একদিন কয়েকজন ছেলে এসে লেফট রাইট করে। আব্বা, নানা ভাই বসে বসে দেখেন। আমি আব্বার বেশী ন্যাওটা ছিলাম যুদ্ধ লাগার শুরু থেকে কেনো জানি আমার মনে হতো, আমি সরে গেলেই যেনো আব্বার কিছু হয়ে যাবে। আব্বা যে দিকে যেতেন আমি তার সঙ্গে থাকতে পছন্দ করতাম। সফিনানীর বাসায় বড় বড় দুই খাট এক করে আমাদের থাকতে দেয়া হয়েছে। অমার ছয় ভাই বোন আর আব্বা আম্মা। সিতারার বয়স নয়। কিন্তু অনেক দিনই রাতে সে বিছানা ভিজাতো। এজন্যে আমরা তাকে খুব খ্যাপাতাম। সে লজ্জাও পেতো। ৬/৭ দিন যাওয়ার পর আম্মা আমাকে বলেন, জ্যোতি নানীর ঘরে পিয়ারা খালাদের কাছে চলে যেতে। এখানে সিতারার বিছানা ভিজানোর জন্যে অসুবিধা হচ্ছে। আমি আব্বাকে রেখে যেতে ইচ্ছুক নই। আম্মার ধমক খেয়ে যাই। সকালে এসে দেখি যা ভেবেছিলাম তাই। আব্বা ভীষন অসুস্থ্য। রাত্রে প্রচন্ড জ্বর আর ডায়রিয়া হয়ে একেবারে শয্যাশায়ী। আমার খালি মনে হয় আমি চলে গেছিলাম বলে আব্বার এই অবস্থা। আমার আব্বা বাতের রোগী। অসম্ভব বাতের ব্যথায় সারারাত কোকান। আমি বহু ছোট কাল থেকে আব্বা কোকালে পা টিপে দিই। মেরুদন্ড আর পায়ের ব্যথা আব্বাকে খুব কষ্ট দিতো। আমি পা টিপতাম আর কানতাম বাবার কষ্টে। আব্বা রাতে উঠে আমাকে এই টিপতে দেখে বলতেন ঘুমাও গিয়ে মা। কিন্তু আমি টিপতামই। আব্বা তখন আমাকে কত বার যে মা ডাকতেন। আজও সে ডাক আমার কানে বাজে। আব্বার পা প্রতি রাতে টিপা আমার অভ্যাস হয়ে গেছিলো। সেই আব্বাকে অসুস্থ দেখে আমি কাঁদতে থাকি আর বলতে থকি, আজ আমি গেছি বলেই আব্বা এমন অসুখে পড়ছেন। আমি আব্বার পাশে বসে যাই। আর উঠি না। আম্মা আসার সময় আর কিছু না আনলেও আমাদের জন্য যা যা ঔষধ প্রয়োজন তা নিয়ে এসেছিলেন। ওখান থেকে কি এক সিরাপ ছিলো তা খাইয়ে দেন। লুজমোশন কমে যায। কিন্তু জ্বরে বিছানা ছেড়ে উঠার আবস্থা নেই। খাওয়া দাওয়া রেখে আমি আব্বার পাশে বসেই থাকি। আম্মা বকা দেন। কিন্তু আমাকে তুলতে পারেন না। কেনো জানি আমার মনে হচ্ছিল আব্বা মরে যাবেন। আমি উঠে গেলেই আব্বা মরে যাবেন। জানি না কেনো ঐ দিন এমন অনুভুতি হয়েছিলো। পরের বাড়ী আমার অসুস্থ বাবার জন্য আমার শুধূ কান্না আসছিলো। আমি মাথা টিপে, পা টিপে আব্বার অসুখ দূর করতে চেষ্টা করতেছিলাম। আপা সব সময় এসব থেকে দূরে থাকে।
বাসায় থাকতেও বাতের ব্যথায় আব্বা যখন কোকাতেন আপা আমাকে চিমটি দিয়ে ঘুম থেকে তুলে দিতো। যাতে আব্বার পা টিপে দিতে পারি। আম্মা ব্যস্ত থাকতেন ভাইবোনদের নিয়ে। একটা উঠেতো আরেকটা বিছানা ভিজায়। সারারাত আম্মার যেতো লাকী আবেদীনের তদারকি করে। এর মাঝে সিতারার কাপড় বদলানো। আমার আম্মার কষ্টেও শেষ ছিলো না। আমি আব্বার পাশে বসলে আর কারও চিন্তা ছিল না। কাজেই ঐ অসুখে আমি সারাক্ষণ আব্বার পাশে থাকায় আপার খেলার ব্যাঘাত হয় নাই। আর সারা জীবন আপার এর জন্য পস্তানো শেষ হয় নাই। সে যাই হউক এই অসুখ আব্বাকে এমন কাবু করে যে, উনার উঠার শক্তিটুকু ছিল না। তিনদিন পর তিনি উঠে দাঁড়ান এবং বাইরে বসতে চান। বৈশাখের মাঝামাঝি তাদের বাড়ীতে ধানের পর ধান আসতেছে। শত শত মন ধান, উঠানে শুকাতে দিছে। পুরুষ মহিলা অনেকে কাজ করছে। এরমধ্যে তাদের বাইর বাড়ীতে আমি আব্বাকে ধরে ধরে নিয়ে গেছি। ওখানে নানা ভাই বসা। সরওয়ার নানারা গল্প করছেন। আমি আব্বাকে নিয়ে গেলে নানাভাই বকা দেন, অসুস্থ মানুষকে কেনো এতো দুরে নিয়ে গেলাম। তাদের বাংলাঘর মূলঘর থেকে অনেক দূরে। দুটো উঠান পার হয়ে যেতে হয়। আর উঠান দুইটাও বিশাল বিশাল। আব্বা বলেন, তিনিই আসতে চেয়েছেন। ঘরে বসে অস্থিও লাগছিলো। খবর জানতে চান। আর কবে বের হবেন এখান থেকে কিভাবে তা ঠিক করতে চান। নানা ভাইর কথা আপনি আগে সুস্থ্য হন। আব্বা বলেন, তিন চার দিনে সুস্থ্য হয়ে যাবেন। কিভাবে যাবো, কোথায় যাবো আগে ঠিক করেন। রব্বানীদের, মোক্তার সাবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না আস্থির অস্থির লাগছে। নানা ভাইর এক কথা আপনার শরীর ঠিক হউক আমারও আর ভাল্লাগছে না। ইন্ডিয়ার কাছাকাছি কোথাও যেতে হবে। সরওয়ার নানারা এখানেই থাকবেন জানান। আর এতো জন মানুষ নিয়ে কোথায় আস্তানা গাড়া যায় পরিকল্পনা চলে। এদের বাড়ীতেও এতো মানুষ নিয়ে থাকতে নানা ভাইর অসোয়াস্থি হচ্ছে। এসব আলোচনার মাঝেই কিছু লোক আতঙ্কিত অবস্থায় দেঁড়ে আসে আর বলতে থাকে আর্মি আসছে! আর্মি আসছে। তারিখ টাছিলো ৩০শে এপ্রিল দুপুর। (চলবে)