- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
২/৪ দিন বাড়ীতেই থাকি। এর মাঝে আমার চাচাতো ভাই মোহন ভাই সাবকে কয়েক জন লোক ধরাধরি করে বাড়ী নিয়ে আসে। বড় চাচা বাড়ী নাই মসজিদ থেকে গুড়া চাচা চলে আসেন। বহু কষ্টে মোহন ভাইর জ্ঞান ফিরানো হয়। তার দাঁত কপাটি লেগেছে। কোথা থেকে দৌঁড়ে এসে গ্রামের পাশে ফিট হয়ে পড়ে যায়। যারা নিয়ে এসেছে তারা বলতে পারে না কি হয়েছে। সবাই মিলে তার জ্ঞান ফিরালে সে আতঙ্কিত চোখে আবোল তাবোল বলতে থাকে। বারবার বলে- গয়া দাসের লাশও, আল্লাহ গয়া দাস কে মেরে ফেললো। মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরুচ্ছে। সবাই জড়ো হয়ে তাকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সে শুধু লাল দু’চোখ মেলে ঐ ঐ গয়া দাস বলেই আবার ফিট হয়ে যাচ্ছে। অনেকে তখন বলাবলি করে তেঘরিয়ার গয়া দাস কে আজ ছত্তার মিয়ার লোকজন গুলি করে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে খুন করেছে। বাড়ী লুট করেছে। একি এইটা দেখে ফেল্লো নাকি? দু’দিন যায় তার সম্বিত ফিরতে। তারপর সে যে বর্ননা দেয় তা ভয়াবহ। গয়া দাস তেঘরিয়ার বাসিন্দা। ডুইংগা গ্রামের অপজিটে। এখন যে শান্তিগঞ্জ বাজার তার সন্নিকটে। মনভাই ঘোড় দৌঁড়ের পাগল। কার কাছ থেকে ঘোড়া নিয়ে সে নাকি তেঘরিয়ায় গেছিলো, ঘোড় দৌড়ের সঙ্গীর খবর নিতে। গয়া দাসের বাড়ীর কাছে গিয়ে এই হত্যাযজ্ঞ সে দেখে ফেলে। সে নাকি মানুষের জটলা দেখে এগিয়ে গিয়েছিলো, গুলি করা সে দেখে ফেলে আর চিৎকার দিয়ে
উঠে। যারা মারছিলো তারা নাকি কেরে বলে পিছন ফিরে তাকে দেখে ফেলে। আর সে এক দৌঁড় দেয়, এরপর আর সে বলতে পারে না। বারবার সে শুধু বলতে থাকে ছত্তার, মিয়া ছত্তার মিয়া। সবাই তার মুখ চেপে ধরেন না বলার জন্য। কিছু দেখে নাই বলার জন্য। জানি না গয়া দাসকে ছত্তার মিয়া নিজে মেরেছিলো কিনা। মন ভাইকে পরে বহু জিজ্ঞেস করছি সে কিছ বলতে চায় না। তাকে সবাই এমন বুঝানো দিয়েছেন যে, সুস্থ হওযার পর আর সে মুখ খুলেনি। এখন হয়তো খুলতো, আমাদের এই ভাইটা অকালে মারা যায়।
গয়া দাস তেঘরিয়ার লোক সম্পন্ন গৃহস্থ। বাড়ীর এতো সম্পত্তি রেখে যেতে হয়তো দেরী করেছিলো। ছত্তার মিয়ার লোকের হাতে জুনের প্রথম দিকে দিনে দুপুরে নৃশ:সভাবে খুন হয় সঙ্গে তার ভাই। তার বাড়ীতে নাকি প্রচুর সোনা ছিলো। তা লুট করে নিয়ে আসা হয়। তার বাড়ীতে ঐ দিন আর কি ঘটেছিলো আল্লাহ জানেন। চারিপাশের গ্রামের মানুষ এই হত্যাকান্ডের পর ছত্তার মিয়াকে বাঘের মতো ভয় পেতে শুরু করে।
গাগলী গ্রামে অবস্থান
সকালে বড় চাচা বড় মামাসহ বাড়ী আসেন। অন্য চাচাদের ডেকে উনার সামনের ঘরে বসেন। আম্মাকেও ডেকে আনা হয়। সঙ্গে আমি, আপা। বড় চাচার বক্তব্য হলো দেশের অবস্থা ভালো না। সুনামগঞ্জের অবস্থা ভালো না। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এখন উজানীগাঁওয়ের। লম্বাজালু আর বাট্টিজালু ছাড়া তলে তলে সবাই ছত্তার মিয়ার সাথে হাত মিলিয়েছে। তার এতো বড় সাহস হয়েছে যে উনাকে সারেন্ডার করে পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলতে হবে বলে খবর পাঠায়। তিনি তা জীবন থাকতে করতে পারবেন না। তার মৃত ভাইয়ের অসম্মান হবে। তার ছেলের অসম্মান হবে। তিনি বাড়ীতে থাকবেন না। নিজের জন্য চিন্তাও করেন না। তার খোঁজ ছত্তার মিয়া পাবে না। সব বৌ-দের তাদের বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই অবস্থায় তিনি আমাদেরও বাড়ীতে রাখতে চান না। আব্বার রাজনৈতিক পরিচয় আর নানা ভাইর পরিচয় দুইজনের জন্যেই আম্মাকে এ গ্রামে রাখা তিনি সঠিক মনে করছেন না। উনাকে গ্রামে না পেয়ে যে কোন ছুতায় ছত্তার মিয়া বাড়ীতে আর্মি নিয়ে আসতে পারে। এতো দিন তিনি সরপাঞ্চ ছিলেন এদের অনেক রাগ এমনিতেই জমা আছে। বাড়ীতে বড় চাচী আর মেজো চাচী থাকবেন। আর মেজো চাচা সেজা চাচা থাকবেন। এবার ধান ভালো উঠেছে এগুলো দেখাশুনার দরকার। আম্মার কিছুই বলার থাকে না। সব চাচা এতে সম্মতি প্রদান করেন। ঐ দিন বিকালেই একটি নৌকায় আমাদের তুলে দেয়া হয়। সঙ্গে কিছু চাল, ডাল, মুড়ি, তেল, নুন এসব জিনিস। একটা বড় তোষক আরও কি কি অতো মনে নাই। বড় মামাকে আরেকটি নৌকা মাঝিসহ দেয়া হয়। তিনি যাবেন রামনগড় তার ফুফুদের কাছে। নৌকা ছাড়ে উজানীগাঁও লঞ্চ ঘাট থেকে যা জয়কলস লঞ্চঘাট নামে পরিচিত। বড় মামার নৌকা চলে যাচ্ছে আমরা লঞ্চ ঘাটে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখি, আর জীবনে দেখতে পাবো কিনা জানি না। আম্মা ভাবলেশহীন। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন পাথরবৎ। গুড়া চাচা আব্বার ইমিযিয়েট বড় ভাই যার ঠিকানা মসজিদ তিনি আমাদের সাথে যাচ্ছে। তিনি অজাতশত্রু। তাকে নিয়ে কারও ভয় নাই। আমরা আবার নৌকায় উঠি গন্তব্য গাগলীগ্রাম।
গাগলী গ্রাম আমাদের বাড়ী থেকে নৌকাপথে ৪০/৪৫ মিনিটের দূরত্ব। গ্রামটি আমার বাবার মামার বাড়ী। আমার দাদী মাস্তুরা বিবির বাবার বাড়ী। গাগলী গ্রামের তালুকদার বাড়ীর কন্যা আমার দাদী। দাদা কনু শেখ তালুকদার নন কিন্তু সম্পন্ন গৃহস্থ। দুই জেনারেশন পূর্বে তার পুর্ব পুরুষ তিন ভাই একত্রে হিন্দু ব্রাহ্মণ থেকে মুসলমান হয়েছেন। তারা একত্রে পাগলা বসবাস করতেন। তাদের ছেলেদের একজন পাগলা, একজন গুয়াচুরা আর আমাদের বড় বাবা শেখ নিজাম উদ্দীন উজানীগাঁও গ্রামে বসবাস করা শুরু করেন ও গ্রামের মোড়ল হয়ে যান। এ জন্য আমাদের বাড়ীর নাম মোড়ল বাড়ী। আর আমর দাদা বড় বাবা শেখ নাম ধারন করতেন। আমার বাবা চাচারা এই শেখ নাম ধারন করেন নাই। সে যাই হউক গাগলীর তালুকদাররা তাদের কন্যা আমাদের বাড়ীতে শুধু বিবাহই দেন নাই, আমার দাদা আব্বাদের ছোট রেখে মারা গেলে তাদের অনেক দেখভালও করেছেন। বড় চাচার সঙ্গে মামাতো বোন বিবাহ দিয়েছেন। তাই এই বাড়ী যেমন আব্বার মামার বাড়ীতে মনিদাদা মানে গোলাম রব্বানীরও মামা বাড়ী। আমরা কখনও এই বাড়ী পূর্বে যাইনি। তবে আব্বার কাছে উনার মামাতো ভাইরা আসতেন তাই কয়েকজনকে চিনি। এর মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হারুন মামুজী। তিনি দাদার মামু, তাই আমরা চাচা না ডেকে মামুজী ডাকি। আমাদের নৌকায যখন গাগলী ঘাটে ভিড়ে তখন সন্ধ্যা। ঘাটে এসে হারুন মামুজী আর তার ভাই সোনা মামুজী আমাদের তুলে নিয়ে যান। যথারীতি ছেলে বুড়ো জমায়েত হতে থাকে। একে তো শহরের মানুষ, তদুপরি আব্বার মৃত্যুর ঘটনা এখানে অনেক চর্চা হয়েছে। আব্বার অন্যান্য মামাতো ভাইয়েরা আসেন। ঠিক হয় হারুন মামুজীর বাংলা ঘরে আমরা থাকবো। এবং ঐ ঘরেই আমাদের নিয়ে তোলা হয়। গ্রামের বাংলা ঘর যেমন হয় বেশ বড়, ঘরটিও তাই। একটা বড় চৌকি ফেলা আর দুটো কাঠের চেয়ার। আমাদেও বিছানা ওখানে ফেলা হয়। বারান্দায় একটা চুলা কড়াইয়ের মাঝে বসানো। কয়েকটা ডেগ ডেগচিও রাখা আছে। বুঝি মামুজী আমাদের জন্যেই এই ঘর রেডি করে রেখেছেন। পরে শুনেছি বড় চাচা গতকাল এদের সনে আলাপ করে আমাদের পাঠানোর প্রস্তাব দেয়ার পর গত রাতে এখানে মিটিং হয়েছে। এরা সবাই আলাদা আলাদা তথাপি কারও কারও প্রশ্ন ছিলো কতদিন থাকবো? যুদ্ধ শেষ না হলে কি হবে? আমরা আবার ফরায়েজ দাবি করে বসবো না তো? তাই হারুন মামুজী একাই দায়িত্ব নিয়েছেন। গুড়া চাচা আমাদের পৌঁছে দিয়ে ঘরে তুলে একই নৌকায় ফেরত গিয়েছেন। নুতন জায়গা কাউকে চিনি না। যদিও এরা আমাদের খুব কাছের আপনজন। তথাপি বহু দূরের মানুষ। কেবল মাত্র হারুন মামুজী থাকায় সাহস পাচ্ছি। আম্মা নির্বিকার। এতো দিন নানা ভাই ছিলেন। নানা ছেলেন ছোট মামা ছিলেন। রামনগড়েও সবাই পরিচিত লোক ছিলো। বাড়ীতে সবাই পরিচিত আপনজন। এখানে আসার পর অথৈ সাগরে পড়ি।
রাত্রে হারুন মামুজীর ঘরেই খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। পরের দুইদিন প্রত্যেক ঘর থেকে এসে বলে যেতো অমুক অক্তে আমাদের ঘরে খাবা। সবার ঘরে একবেলা করে খেয়ে দুই দিন চলে যায়। এবার আমাদের রান্না করে নিজের খাবার নিজের যোগাড় করার পালা। আম্মাকে কিছু বলার সাহস আমাদের নেই। উনি সুখে দু:খে এমন কাতর যে, রান্না করার শক্তি আছে বলে আমরাই মনে করি না। মার্চের শেষ থেকে আমরা বাসা ছাড়া। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ। এতোদিন রান্না করার দরকার হয়নি। আজ রান্না করতে বসে বুঝতে পারি আরেক যুদ্ধ করতে হবে। আমাদের আপা শাহানা জীবনে রান্না করেনি। আমিও না। বাকীরা তো ধর্তব্যের মাঝেই পরে না। কিন্তু না, আপা মুক্তিযুদ্ধের সময় এই কাজটা হাতে নিয়ে নেয়। প্রথম প্রথম চাচাতো বোনরা এসে সাহায্য করেছে পরে আপাই সামাল দিয়েছে। সে যে কি কঠিন কাজ তার বর্ননা না দিলে বুঝা যাবে না
গাগলীর এই তালুকদার বাড়ী অনেক বড়। চার অংশের বাড়ী। অনেক বড় একেক অংশ পর একটা ছোট্ট সীমানা পরে আরেক অংশ। আব্বার তিন মামা ছিলেন তাদের ছেলেদের সংসার এক অংশে হেকিম ভাইর বাবা, মজমিল চাচা ও ছমির চাচার ঘর। মাঝে কিছু জায়গা খালি তার পর রমজান চাচা, ময়নাচাচা ও সোনা চাচার ঘর। এক অংশে শুধু মাত্র হারুন মামুজীর ঘর। পরের অংশ উনাদের চাচাতো চাচাদের বাড়ী। তাদেরও কয়েক ঘর। প্রত্যেকের বেশ কয়েকটা ঘর আর পিছনে অনেক জায়গা, যা তাদের প্রাতকৃত্যের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই এতো বড় বাড়ীতে এতো ঘরে একটা মাত্র টিউবওয়েল। সবচেয়ে বড় সমস্যা পানি আনা। আমরা যে বাংলা ঘরে স্থান পেয়েছি তার থেকে টিউবওয়েল বেশ দূরে। প্রত্যেকের ক্ষেত কামলা আছে তাকে দিয়ে এবং মেয়েরা পানি আনে। আমাদের প্রথম প্রথম সাহায্য করেছে, এরপর এই পানি আনার কাজ আপাকেই করতে হয়েছে। কলসী কাঁখে নিয়ে বহু কষ্টে সে এই পানি আনতো। গোসল কাপড় ধোয়া সব নদীতে। নদীর নাম সুরমা। কিন্তু এ পাড়ে গভীর না। চাচাদের বাড়ীর বিচরার পরেই গাং। এপারে অগভীর ওপারে গভীর। এক অদ্ভুত অবস্থা। এখানে বেশ দুর সাঁতার কেটে গেলেও ঠাই পাওয়া যায়। একটা সীমা পার হলে পর নদীর গভীরতা শুরু। দুরে ছোট ছোট লঞ্চ যায়। দিরাই যাওয়ার লঞ্চ। এই নদী থেকে ধোয়া মুছার পানি নিতে হয়। সে যে কি কঠিন কাজ। আপা কিভাবে করেছে আজও মনে হলে অবাক হই। মুক্তিযুদ্ধের পরে আপা আর কাজ করে নাই। এখনও করে না। কিন্তু ঐ কঠিন সময়ে সে সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছে। সঙ্গে আমি। সে পেরেছে এ কারণে ঐ সময়ে একজন সাথী পেয়ে যায় সে। সোনা চাচার মেয়ে মশকুলবুই। উনি আপাকে অনেক সাহায্য করেছেন। নদী থেকে পানি আনা, টিউবওয়ের থেকে পানি আনা, রান্না করা, সব কাজই আপা করেছে। আমি তার সাথে থেকেছি। বাড়ী থেকে গুড়া চাচা চাল ডাল দিয়ে যেতেন। তাও তেল নুন এসব আমি গাগলী বাজার থেকে নিয়ে আসতাম। পরে তালেব আলী চাচা ১৪/১৫ বছরের ছেলে হারুন মামুজীদের চাচাতো দিকের ভাই তিনি আমাদের সাথে মিশে যান, আর অনেক সাহায্য করেন। বিশেষ করে বাজার হাট। বাজারে ঘুরা আমার পূর্ব অভ্যাস। গাগলীতেও তা বেশ করেছি। মানুষের বিভিন্ন ধরনের কথা শুনা তা আবার আম্মার কাছে রিলে করা আমার অভ্যাস ছিলো। গাগলীর বাজারে বেশীক্ষণ ঘুরতে পারতাম না। কিন্তু মানুষের যুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য ঠিকই শুনতাম। তার মাঝে সবচেয়ে বেশী আলোচনার বিষয় ছিলো ছত্তার মিয়ার কর্মকান্ড। অনেকেই আমাকে দেখে আহা! অমুকের মেয়ে বলে আব্বার বিভিন্ন গল্প বলতেন। আমার খুব ভালো লাগতো। আমার বাপ তার বাবা হারিয়ে এ গ্রামের আনাচে কানাচে ঘুরে বেরিয়েছেন। নদীতে সাঁতার কেটেছেন। (চলবে)

  • [১]