- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমাদের বাংলা ঘরটা ছিলো লিফলেট লিখার উৎকৃষ্ট স্থান। নাসির ভাই, শহীদ ভাই, পিচ্চি বয়সের বেলায়েত ভাই, সমছু ভাই, হুমায়ূন ভাই আরও নাম না জানা কত ভাইয়ের সমাবেশ হতো সেখানে। তারা পোস্টার লিখতো আর ক্ষণে ক্ষণে উদাত্ত সুরে গান গাইতো। ‘ভুলবো না ভুলবো না একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলবো না’, ‘এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে নাকো তুমি’, ‘আমরা করবো জয় আমরা করবো জয়’ আরও কত গান। তাদের গানের সুরে সুর মেলাতাম আর এক অদ্ভুত দেশপ্রেমে মনটা পূর্ণ হয়ে যেতো। চোখের সামনে জয় দেখতে পেতাম। আর পোস্টার কত রকমের তার ইয়ত্তা নাই।
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই ,
নি:শ্বেসে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।
১৯৬৮ সাল চলে আসে আইয়ুব খানের পতন আন্দোলন। আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলতে হবে এই স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় মশাল মিছিল। বড়দের মাঝে অস্থিরতা শেখ মুজিবকে কি ফাঁসি দিয়েই ফেলবে? , মওলানা ভাসানী কি করছেন ? মনি সিং কোথায় ? অগ্নি কন্যা মতিয়া চৌধুরী জ্বালাময়ী ভাষণে কি বল্লো ? তার উপর কি ধরনের নির্যাতন হলো। বঙ্গবন্ধুর চার খলিফা কি সিদ্ধান্ত নিলো ? ঢাকায় ছাত্র জনতা কি করছে ? কি করলে শেখ মুজিবকে বাঁচানো যাবে? ছাত্র জনতা সবাই আতঙ্কে। যে করেই হউক, আইয়ুব খানকে নিবৃত্ত করতেই হবে। প্রত্যেকেই আলাদা প্রোগ্রাম দিচ্ছে কিছুই হচ্ছে না। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে। সবাই একত্রে আন্দোলন জোরদার করেছে। এর মধ্যে এক বিকেলে পুরান কলেজের সামনে আইয়ুব খানের ছবি মাটিতে ফেলে ভাংচুর করে ছেলেরা। দাদাও ভাঙ্গার কাজে ব্যস্ত। অনতিদূরে বড়রা উৎসাহ দিচ্ছেন। ছবি ভেঙ্গে ছাত্ররা অনেক বড় মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। সারা শহর উত্তেজিত। ছেলেদের উত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছিলো এখনই বোধহয় শেখ মুজিবকে বের করে নিয়ে আসবে। কিন্তু না ঐ রাত্রেই দাদা মানে গোলাম রব্বানীকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। দাদা তখন মানিক কোরেশীর বাসায়। তিনি পুলিশের সাথে যাওয়ার সময় বাসায় এসে বলে যান তাকে নিয়ে যাচ্ছে।
সকালে বাসা থমথমে। আব্বা খুব অস্থির। বাড়ি থেকে চাচারা এসেছেন। কেউ আবার কান্না করছেন। আব্বা সবাইকে ধমকাচ্ছেন। এ তো হবারই কথা। রাজনীতি করলে জেলে যেতে হবে। আগেও তো গেছে। কিন্তু বাড়ির এরা এটা মানবে কেনো? যেনো সব দোষ আব্বার। আব্বা চাচার সঙ্গে আমাকে পাঠান জেলে দাদাকে দেখতে। আব্বার ছোট ভাই। গ্রামের সরল মানুষ। তিনি আমাকে নিয়ে প্রথমে থানায় যান আব্বার নির্দেশ মতো। আমিও সহগামী হই। ভেবেছিলাম জেলের ভেতর দাদাকে দেখবো। হাতে হাতকড়া। দাদা হয়তো আমাদের দেখে দু:খে কাঁদবেন। তাই প্রায় কাঁদতে কাাঁদতেই যাই। ও মা ! জেলখানার দিকে আমাদের না নিয়ে পুলিশ আমাদের পিছনে তাদের কোয়ার্টারের দিকে নিয়ে য়ায়। থানার পুলিশের ও সি তখন ছিলেন মখলিছুর রহমান সাহেব। তার মেয়ে রুবীও ছিলো এই আন্দোলনে যুক্ত। তাদের বাসায় আমাদের পৌঁছে দেয়। আমরা গিয়ে দেখি তাদের সামনের রুমে বসে দাদা ডিম পোচ সহ পরোটা খাচ্ছেন। আমাদের দেখে তিনি বলে উঠলেনÑএই কান্দস কেনে ? ও মা ! এটাকে জেল বলে ! আমি তো হা ! চাচাও দেখি গৌরবান্বিত । মুখ কালো হওয়া চাচার সঙ্গে দাদার কি কি কথা হয়। আমি শুধু জেল কত ভালো তা দেখতে থাকি। রুবি আপাও উঁকি দেয়। আমার সাহস বাড়ে। কারণ তাকে আমি আগেই চিনতাম। সে আমাকে ডেকে ভেতরে নেয়। আর ভয় পেতে নিষেধ করে। তার বাবাও যে এই আন্দোলন পছন্দ করে তা বলে। আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে এসে বাসায় কি দেখেছি বর্ণনা করি। কিন্তু আব্বা নিশ্চিন্ত হন না। পরে শুনি ঐ দিনই দাদাকে জেলে নিয়ে যায়। সেখান থেকে সিলেট জেলে। সুনামগঞ্জে মিছিলে তখন রাজবন্দীদের মুক্তি চাই শেখ মুজিবের মুক্তি চাই এর সঙ্গে রব্বানী ভাইর মুক্তি চাই শব্দটিও ধ্বনিত হতে থাকে। প্রতি সন্ধ্যায় মিছিল, মশাল মিছিল, জঙ্গী মিছিল চলতেই থাকে। ছাত্র জনতা স্বতস্ফূর্ত হয়ে মিছিলে যোগ দিত। পয়েন্টে বড়রা থাকতেন সহযোগিতার হাত নিয়ে। মাঝে মাঝে বড়রাও মিছিলের অগ্রভাগে সামিল হতেন। সারা শহর উত্তাল। উত্তপ্ত আলোচনা । শেখ মুজিবকে ছাড়বে কি না? ছয় দফা মানবে কি না? এগারো দফা মানবে কি না? এই উত্তাল আন্দোলনের ফল কি হবে ? আইযুব খান কোন চাল দেয় ? হরেক রকম প্রশ্ন, হরেক রকম বাক বিতন্ডা। তবে নিজেদের দেশের স্বার্থে সবাই এক। শহরে সবার ঘরে রেডিও নাই। অনেকে রেডিও কিনছেন। কিছু দোকানে রেডিও আছে তা ফুল ভলিউমে ছেড়ে দেয়া হয়। মানুষ ভিড় করে রেডিও শুনে। নিজেদের মতো গল্প তৈরি করে। ইতিমধ্যে ঢাকায় সার্জেন্ট জহুরুল হককে মেরে ফেলেছে। কে যে তিনি জানি না শুধু জানি আমাদের লোক মারা শুরু করেছে। আব্বা, আলফাত মোক্তার মামা, রইছ চাচা, নানাভাই, সবার মাঝে উত্তেজনা দেখি। ছাত্রদের মাঝে তো টগবগ করছে উত্তেজনা। এর মাঝে খবর আসে মতিউর কে মেরে ফেলেছে মিছিলে। যেনো আগুন লাগে। ছাত্র জনতা এক হয়ে যায়। পুলিশ ঠেকনা দিতে পারে না। আর পুলিশ ডিউটি করতো ছাড়া ছাড়া, আন্দোলনে তাদের অনেকের নৈতিক সমর্থন ছিলো। রেডিওর খবরেও সে উত্তাপ বুঝা যেতো। এর মাঝে ৬৯ এর প্রথম দিকে কিশোর আসাদের শহীদ হওয়ার খবর আসে। ছাত্র জনতা উন্মত্ত হয়ে যায়। ছাত্রদের সাথে বড়রাও মিছিলে নেমে পড়েন। হরতাল আন্দোলন মিছিল মিটিংয়ে সারা শহর উত্তপ্ত। দীপালী দি, পারুল ভট, বানী দি, রানী দি, সঞ্চিতাদি, নিরুপমা দি সহ অনেক মহিলা মিছিলে, সঙ্গে আমরা পিচ্চিরা। রেডিও খবর দেয় সারা দেশে নাকি একই অবস্থা। আইয়ুব খান আর সামাল দিতে না পেরে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি দেয় প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে। (চলবে)

  • [১]