ভাষার মর্যাদা রক্ষার মাস ফেব্রুয়ারিতে তথ্যসচিব মরতুজা আহমদ একটি কর্মশালায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ও প্রয়োজনীয় কিছু করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জন্য ‘দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও বানানরীতি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় বৃহস্পতিবার সকালে তিনি এসব কথা বলেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি যা বলেছেন সেগুলো আসলে সকলের জানা ও বুঝার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এফএম বেতারগুলো তথাকথিত আঞ্চলিক উচ্চারণরীতির নামে যে ভয়ানক এক ভাষা শ্রোতাদের গিলাচ্ছে সেটিকে তিনি বাংলা ভাষার কবর রচনার সাথে তুলনা করেছেন। এফএম রেডিওগুলোতে আরজে (রেডিও জকি) নামক এক ধরনের উপস্থাপকের মাধ্যমে এই বিকৃতি ঘটছে ব্যাপকভাবে। কর্মব্যস্ত মানুষ বিশেষ করে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের অবসরে বা গাড়িতে বসে এফএম বেতার শোনা ইদানীং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মোবাইলফোনের বদৌলতে এফএম রেডিও এখন রাজধানীর সীমানা ডিঙিয়ে আরও বৃহত্তর পরিসরে ঢুকে যেতে সক্ষম হয়েছে। একারণে এফএম বেতারের শ্রোতাদের ব্যপ্তিও বাড়ছে। এরকম একটি গণমাধ্যমে ভাষাকে নিয়ে যখন রীতিমতো ছেলেখেলা করা হয় তখন ভাষার প্রতি মমতা রয়েছে এমন কারও পক্ষেই নিশ্চুপ থাকা সম্ভব নয়। সংগত কারণেই তথ্যসচিবের মুখে এর বিরুদ্ধে বলিষ্ট প্রতিবাদের কথা উঠে এসেছে। এফএম রেডিও শুধু নয় ভাষা বিকৃতির সাথ জড়িত রয়েছেন টেলিভিশনের কিছু জনপ্রিয় নাট্যকারও। তাঁরা এর সপক্ষে নানা যুক্তিও উপস্থাপন করেন বেশ চমৎকার করে। রাজধানী ঢাকায় সারা দেশ থেকে আসা তরুণ প্রজন্ম একধরনের বিকৃত কথ্যভাষা রপ্ত করেছে যেটি বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার সাথে সম্পর্কিত নয়। ঢাকার তরুণদের একটি অংশের এই ভাষা কখনও জাতীয় চরিত্রের কোন গণমাধ্যমের ভাষা হতে পারে না। আমাদের ভাষা পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ একটি ভাষা। শ্রুতিমাধুর্য বিবেচনায় এই ভাষাটি শীর্ষস্থানীয়। ভাবপ্রকাশের জন্য এই ভাষায় রয়েছে পর্যাপ্ত শব্দভা-ার। এই ভা-ারে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন শব্দ। বাংলা উচ্চারণবিধি, বানানরীতি, ব্যাকরণ সবকিছুর আছে ভাষাবিজ্ঞানসম্মত সুনির্দিষ্ট বিধিমালা। আমাদের প্রতিটি অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা আমাদের পরম সম্পদ। আঞ্চলিক ভাষায় রচিত বহু সাহিত্যকর্ম (উপন্যাস, নাটক এমনকি কবিতা পর্যন্ত) উচ্চ পর্যায়ের মানসম্পন্ন। এরকম সমৃদ্ধ একটি ভাষাকে তথাকথিত ডিজে মার্কা বিকৃতির হাত থেকে উদ্ধার করা এখন একটি প্রয়োজনীয় দায়িত্ব বটে। আমরা জানি মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের সময়ে আমাদের বসবাস। কিন্তু স্বাধীনতার নামে কোনকিছুই অবাধ, স্বেচ্ছাচার কিংবা শর্তহীন হতে পারে না। আজ ভাষার যে বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে সেখানে তথ্যমন্ত্রণালয় কিংবা বাংলা একাডেমী খুব সংগতভাবেই হস্তক্ষেপ করতে পারে। আমরা আশা করি তথ্যসচিব স্বয়ং যা উপলব্ধি করেছেন তা বাস্তবায়ন করতে তাঁর মন্ত্রণালয় বিশেষ উদ্যোগ নিবে।
সর্বস্তরে বাংলাভাষা ব্যবহারের জাতীয় আকাক্সক্ষা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় নি। বিশেষ করে উচ্চ আদালতে আরজি থেকে শুরু করে রায় পর্যন্ত সবকিছু বাংলায় পরিচালনার বিষয়টি এখনও সফল হয় নি। আমাদের প্রধান বিচারপতি এ বিষয়ে খুব সচেতন রয়েছেন। তিনি বাংলায় রায় লিখার উপর বিচারপতিগণকে পরামর্শ দিয়েছেন, একই সাথে আদালতে বাংলাভাষা চালু সহজতর করতে আইন ও রেফারেন্স বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করার জন্য বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অফিস আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহার এখন সন্তোষজনক। এটি দীর্ঘ চেষ্টা ও প্রক্রিয়ায় সম্ভব হয়েছে। বিচারালয়েও বাংলা ভাষা আপন মর্যাদায় অদূর ভবিষ্যতে প্রযুক্ত হবে, এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। তবে এজন্য এখন থেকেই কাজ শুরু করা উচিৎ যা আমাদের প্রধান বিচারপতি মহোদয় ব্যক্ত করেছেন।