বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদযাপনে মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয়েছে পুজো প্রস্তুতির জোর আনুষ্ঠানিকতা। প্রতিমা তৈরিতে মনোযোগী মৃৎশিল্পীরা দেবীর পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে কেউ বাঁশ ও খড়ের প্রাথমিক কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন, কেউবা মাটির কাজে হাত দিয়েছেন। জামালগঞ্জের কয়েকটি পুজোমন্ডপ ঘুরে এমন বাস্তবতা চোখে পড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যায়, সার্বজনীন এ পুজো উৎসবের আয়োজক সংগঠনের দায়িত্বশীলরা আয়োজন সফল করতে যার যার অবস্থানে থেকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে এ বছর দুর্গোৎসবে পূজার সংখ্যা কমে যাওয়ার আশংকা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলায় গত বছরের সমপরিমাণ ৪১০টি মন্দিরেই দুর্গাপূজা উদযাপিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ। অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও বেশ আড়ম্বরপূর্ণভাবেই পূজা উদযাপিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে পূজা পরিচালনার আহবান জানিয়েছেন।
পুরাণ মতে, ত্রেতা যুগে শরৎকালে রাবনের সাথে যুদ্ধে যাবার পূর্বে রামচন্দ্র দুর্গা দেবীর পূজা করেছিলেন। পূজার শুরুতে দেবীকে বিল্ববৃক্ষে অধিবাসের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই পূজাপদ্ধতি বোধন বলে পরিচিত। পুজোর শুরুতে মহাষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর বোধন হয়। অসুরের সাথে যুদ্ধ জয়ের মানসে রামচন্দ্র অকালে যে পূজা করেছিলেন তার ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত আছে। মানব সমাজের সকল অনাচার-অবিচার রোধে মর্ত্যবাসী প্রতিবারের ন্যায় এবারও দেবীর আরাধনায় যুক্ত হচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিমান কান্তি রায় জানিয়েছেন, এ করোনাকালে করোনা মুক্তির আরাধনায়ই এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে। ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় কমিটি আমাদেরকে ২৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। এ নির্দেশনা আমরা প্রতিটি উপজেলায় পৌঁছে দিয়েছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পুরোহিত ও ভক্তদের অবশ্যই মাস্ক পরিধ্যান করতে হবে। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, অঞ্জলী প্রদানে এক সাথে না দাঁড়িয়ে নিরাপদ দূরত্ব মেনে দফায় দফায় তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শুধু মন্দিরকেন্দ্রীক আলোকসজ্জা এবং সাউন্ড সিস্টেমে ধর্মীয় গান ব্যতীত উচ্চ শব্দে গান বাজানো পরিহার করতে হবে। এছাড়া কোনো ধরনের যাত্রা, নাট্যানুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক ও আরতি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যাবে না। করোনা প্রভাবের কারণে জনমনে একটু ভীতি কাজ করলেও করোনা মুক্ত হতে সবাই উৎসাহ উদ্দীপনায় জাঁকজমকভাবেই দেবী আরাধনায় অংশ নিচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, এবারের দুর্গোৎসবে জেলার ১১টি উপজেলার ৪১০টি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৪৪টি, ছাতকে ৩৬টি, জগন্নাথপুরে ৩৯টি, দিরাইয়ে ৬৫টি, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ২৪টি, জামালগঞ্জে ৪৯টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৩০টি, শাল্লায় ৩০টি, তাহিরপুরে ২৯টি, দোয়ারাবাজারে ১৭টি, ধর্মপাশায় ১৮টি এবং ধর্মপাশার অধীনস্থ মধ্যনগরে ২৯টি পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গত বছরও সমান ৪১০টি মন্দিরে পূজানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ বছর সমান সংখ্যক পূজা অনুষ্ঠিত হলেও করোনার কারণে একটু বাড়তি শঙ্কা কাজ করছে। তবে সার্বিক আয়োজনে করোনার নেতিবাচক প্রভাব তেমনটা নেই বলে জানিয়েছে পূজা উদযাপন পরিষদ।
দুর্গা পূজায় করোনার প্রভাব নেই উল্লেখ করে সাচনা বাজার জগন্নাথ জিউর মন্দিরে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পী আরাধন পাল জানিয়েছেন, তিনি এবছর ৫টি মূর্তির কাজে হাত দিয়েছেন। গতবারও ৫টি প্রতিমা তৈরি করেছিলেন তিনি। এবারের পূজানুষ্ঠান সুন্দরভাবেই অনুষ্ঠিত হবে।
সাচনা দক্ষিণপাড়া সার্বজনীন দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপ্রেশ দেবনাথ বাবলু বলেন, ‘আমাদের এলাকায় করোনার প্রভাব তেমন নেই। তারপরও এবারের পূজায় স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তার শতভাগ না হোক যতটুকু পারা যায় তা পালনের চেষ্টা করা হবে। তবে দুর্গাপূজায় করোনার প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।’
ছাতক উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাড. পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ‘করোনার জন্য আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনাড়ম্বরপূর্ণভাবে পালনের আহবান জানাচ্ছি। তবে করোনার জন্য মানুষকে তেমন চিন্তিত দেখি না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে করোনার প্রভাব নেই। যদিও আমাদের বিধি নিষেধ আছে, তারপরও মানুষ আড়ম্বরপূর্ণভাবে পূজা উদযাপন করতে চায়।’
শাল্লা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তরুণ কান্তি দাস বলেন, ‘আমাদের এখানে করোনার প্রভাব লক্ষণীয় নয়। পূজা উপলক্ষে মানুষের মাঝে আলাদা উৎসাহ-উদ্দীপনা আছে। সার্বিক পরিস্থিতিও ভালো। পূজা উদযাপনে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে আমরা যে নির্দেশনা দিচ্ছি, তাতে পূজার্থীদের মাঝে কিছুটা আপত্তি আছে।’