বিন্দু তালুকদার ও আকবর হোসেন
হাওর এলাকার মানুষের বেদনার কাহিনী শুনলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এক ফসলের উপর নির্ভরশীল ভাটির মানুষদের মতই আগামী বছরের ফসলের ভবিষ্যৎও অনেকটাই ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছেন মন্ত্রী নিজেও। মন্ত্রী বলেন, ‘হাওরের পানি এখনও না সরায় চাষাবাদ শুরু করা যায় নি। চাষাবাদ শুরু করতে বিলম্ব হলে ধান পাকতেও বিলম্ব হবে। তাই ধান গোলায় তোলা এখনও কৃষকদের ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল।’ তবে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘এ বছর হাওর এলাকার বাঁধ নির্মাণ, হাওর সংলগ্ন নদী খননসহ হাওর এলাকার উন্নয়ন কাজে যত টাকা প্রয়োজন দেওয়া হবে। সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলার হালির হাওর, শনির হাওর, সোনামোড়ল হাওর, জোয়ালভাঙ্গা হাওরের ডুবন্ত বাঁধ, ক্লোজার, সুরমা নদীর খনন কাজ সহ সংলগ্ন গ্রামগুলো পরিদর্শন করেন পানিসম্পদমন্ত্রী। হাওর এলাকার বর্তমান অবস্থা, নদী খনন কাজ ঘুরে দেখেন। মানুষের পাশে থাকার জন্য প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনাও দেন।
পরির্দশনে মন্ত্রীর সঙ্গে সংসদ সদস্য অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান, জামালগঞ্জ উপজেলা (ভা.প্রা.) নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুল হাসান, স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় কৃষক এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
হাওর ঘুরে দেখার সময় মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সাংবাদিকদের বললেন, ‘হাওরে এখনও পানি। পানি না সরায় কৃষকের বীজতলাও হচ্ছে না, বাঁধ নির্মাণ কাজও শুরু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বীজতলা নিয়ে এখনই এত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ পানি আরও কিছু কমলে কৃষক বীজতলা করতে পারবে। এতে বড় সমস্যা হবে না।’
তিনি বলেন, ‘এমনিতেই ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত সাধারনত হাওরে কিছু পানি থেকেই যায়। এ কারণে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করতে জানুয়ারির শুরু পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। তিনি জানান, প্রথম দিকে হাওরের নরম মাটি দিয়ে কাজ শুরু করতে হয়। ফলে বাঁধ সুসংহত করা খুব কষ্টকর হয়। এবার বাঁধ সুসংহত করতে তিন স্তরে মাটি ফেলা হবে। একই সঙ্গে বাঁধ নির্মাণ কাজ তদারক করার জন্য জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ কমিটি করা হয়েছে। আর এবার মূল নির্মাণ কাজের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে উপকারভোগীসহ এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্যদেরও অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে। এবার ঠিকাদার নয়, সরাসারি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমেই বাঁধ নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে যেখানে যেখানে প্রয়োজন সেখানেই নদী খনন কাজ করা হবে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এবারের কাজে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। শুধুমাত্র সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার জন্যই এবার এখন পর্যন্ত ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসেব করা হয়েছে, যেখানে গত বছর পুরো হাওর অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১ কোটি টাকা। তিনি বলেন, টাকা যত লাগবে দেওয়া হবে, কিন্ত খরচ এবং কাজের মানের ব্যাপারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘চলতি বছর অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে হাওর অঞ্চলে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অতি বর্ষণের কারণে বিপুল পানির জোয়ারে হাওর প্লাবিত হয়েছে। আবহওয়ার এমন অস্বাভাবিক আচরণ থাকলে হাওর এলাকায় আগামী বোরো মৌসুমের ধান তোলা নিয়ে শংকা থেকেই যাবে।
তিনি বলেন, হাওর এলাকায় শীত মৌসুমে আরও কি লাভজনক ফসল করা যায়, তা নিয়েও ভাবনা-চিন্তা করা হচ্ছে। এখন আর শুধু ধানের উপর নির্ভর করলে চলবে না। পাশাপাশি হাওর এলাকায় মাছের অভয়াশ্রমসহ নানা উদ্যোগ নিয়ে মাছের উৎপাদন বাড়াতে হবে।’
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘বন্যায় হাওর এলাকার নদীগুলোতে বেশি পরিমাণ পলিমাটি পড়েছে। এ সমস্যা সমাধানে আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি। হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধে সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রধান প্রধান নদীগুলো খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াইসহ প্রধান প্রধান নদীগুলো খনন করা হবে। সম্প্রতি যাদুকাটা, রক্তি, পুরাতন সুরমা, বৌলাই নদী খননের কাজ হচ্ছে। যাতে অকাল বন্যার কবলে না পড়ে কৃষকরা হাওরের বোরো ফসল ঘরে তুলতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকার কৃষি ও কৃষক বান্ধব সরকার। বর্তমান সরকার কৃষির ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।’
এদিকে সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউস মিলনায়তনে বন্যা পরবর্তী হাওর রক্ষা বাঁধ মেরামত ও সংরক্ষণ বিষয়ে রাজনীতিক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় মিলিত হন পানিসম্পদমন্ত্রী।
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভার শুরুতে হাওর ও বাঁধ নিয়ে বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ পাউবোর পওর-১ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিকি ভুইয়া।
বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য ইয়াহিয়া চৌধুরী, জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ, ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন খন্দকার, দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন ইকবাল, দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মহুয়া মমতাজ, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড. আব্দুল মজিদ, জাপা নেতা সাইফুর রহমান সমছু, মনির হোসেন, রশিদ আহমদ, হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান, সদস্য সচিব বিন্দু তালুকদার, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা, সাংবাদিক আল হেলাল, এমরানুল হক চৌধুরী, সামস শামীম, সেলিম আহমদ তালুকদার, মাসুম হেলাল, জাপা নেতা এরশাদ মিয়া, কৃষক জসিম উদ্দিন, ইউপি সদস্য আব্দুল হেকিম, ডা. চাঁন মিয়া প্রমুখ।
মতবিনিময় সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘এইবার যে প্রকারেই হোক হাওরের বোরো ফসল রক্ষা করতে হবে। সময়মত বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। কৃষক বান্ধব প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হাওরের ফসল রক্ষা করতে যা করার প্রয়োজন তাই করবেন। যত টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন তিনি দিবেন। ফসলহারার কারণে মানুষ যাতে নতুন করে কোনভাবেই দুর্ভোগে না পড়েন, সেদিকে নজর রাখতে হবে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্প বাছাই করতে কিছু অনিয়ম হলেও আমি দায় নিতে রাজী আছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া মানুষ সৃষ্ট কিছু হলে আমি দায়ী থাকব। গত বছর বাঁধ নির্মাণে কিছু গাফিলতি ছিল, বাঁধের নিচ থেকে মাটি কাটা হয়েছিল। বাঁধ নিয়ে আমাদের মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ছিল। বাঁধ নিয়ে যা হয়েছে, যত টাকাই চুরি হয়েছে, দুদক তা তদন্ত করে দেখছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘সময়মত ও দুর্যোগের আগে হাওর থেকে ধান তুলতে হলে ব্রি-২৮ জাতের ধান বেশী করে চাষাবাদ করতে হবে। এইবার হাওর ও বাঁধ নিয়ে যে কোন সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন। আমি জানুয়ারি মাসে আবারও হাওর দেখতে আসব। আমাদেরও নানা রকম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের জনবল কম, উপজেলা পর্যায়ে কোন অফিস নেই। সুনামগঞ্জের হাওরের জন্য নতুন কিছু কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হবে। যাতে করে প্রতিটি উপজেলায় অন্তত ২ জন করে এসও মাঠে কাজ করতে পারেন।’