স্টাফ রিপোর্টার
সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ভাষাসৈনিক এমএন আব্দুল হক এর স্মৃতি ভাস্কর্য্য স্থাপন করা হয়েছে। কলেজের প্রবেশমুখের বামপাশের এই ভাস্কর্য্যটি সকলেরই দৃষ্টি কেড়েছে। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেতে যতগুলো গুণাবলীর অধিকারী হতে হয়, এর সবগুলোই রাজনীতিবিদ আব্দুল হকের মধ্যে ছিলো। তিনি একাধারে ছিলেন ভাষা সৈনিক, তুখোড় ছাত্রনেতা, শিক্ষক, আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক ও এম.এন.এ। তিনি ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের রাজনীতির অন্যতম প্রাণ পুরুষ। তিনি অনুকরণীয় অনুসরণীয়। তাঁর কর্ম ও আদর্শ চিরজাগরুক করে রাখতেই কলেজ কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগ।
স্মৃতি ভাস্কর্যের স্তম্ভে লিখা হয়েছে, যুগে যুগে পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষের জন্ম হয়েছে মৃত্যুর কদর অমর করে রেখেছে ইতিহাসের পাতায়। মানব হৃদয়ে তাঁরা যুগ যুগ ধরে আপন মহিমায় ভাস্কর হয়ে আছেন। মো. আব্দুল হক এম.এন.এ এমনই এক ক্ষণজন্মা পুরুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, ভাষা সৈনিক, জনদরদী কোনো অভিধাই যেনো তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। এদেশের স্বাধিকার, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামে অননেতা আব্দুল হক ছিলেন অগ্রসেননি। আমৃত্যু জীবনের জয়গান গেয়েছেন। ভুখানাঙ্গা মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নে বিভোর এ মানুষটি তাই ব্যক্তি জীবনের সকল সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়ে মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তিনি ছাড়া অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বাংলার স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির মুক্তি অসম্ভব। আর এ জন্য প্রয়োজন বলিষ্ট ও আপোষহীন নেতৃত্ব। তাইতো তিনি বাঙালির মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সিপাহসালার আব্দুল হক ১৯৩৪ সালে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার ভাতগাঁও ইউনিয়নের ভাতগাঁও গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ ছিলেন ভারতের বিখ্যাত দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে উচ্চতর ডিগ্রিধারী আলেম। আব্দুল হক ভাতগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরে জাউয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। প্রাথমিক বৃত্তি লাভ করে কৃতিত্বের সাথে সুনামগঞ্জ জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জুনিয়র বৃত্তি লাভসহ প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশন এবং পরে সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে অনার্সসহ স্নাতক এবং পরে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনে তিনি পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সঠিক ভূমিকা রাখেন এবং ৫২ সালে সুনামগঞ্জে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে তিনি অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভাবনীয় সাফল্যের পর তৎকালীন স্বৈরশাসক কেন্দ্রীয় মুসলিমলীগ সরকার পূর্বপাকিস্তানে ৯২ (ক) ধারা জারী করলে জননিরাপত্তা আইনে তিনি গ্রেফতার হন। দীর্ঘ ১৪ মাস তাঁকে কারাগারে কাটাতে হয়। এর পর ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ সালের বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলন, ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর সাধারণ নির্বাচন, অসহযোগ আন্দোলন, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন সংগ্রামে বলিষ্ঠ সংগঠক ও আপোসহীন নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন মো. আব্দুল হক। এই আন্দোলন সংগ্রামের ধাপে ধাপে দীর্ঘ কারাভোগসহ সইতে হয়েছে অনেক নির্যাতন।
প্রতিথযশা শিক্ষানুরাগী মো. আব্দুল হক অনুধাবন করেছিলেন শিক্ষার আলো ছাড়া এদেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই সক্রিয় রাজনীতির পাশাপাশি তিনি পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছিলেন। এমনকি শিক্ষার্থীদের চাহিদা বিবেচনায় রচনা করেছেন পাঠ্যপুস্তকও। এক পর্যায়ে তিনি আইন পেশায়ও যুক্ত হন।
এডভোকেট মো. আব্দুল হক সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আগামীলীগের প্রার্থী হিসাবে পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে পূর্বপাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে সুনামগঞ্জ মহকুমায় নেতৃত্ব দেন মো. আব্দুল হক এম.এন.এ। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অবতীর্ণ হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকের ভূমিকায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন ৫ নম্বর সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা। মো. আব্দুল হাকের সুযোগ্য নেতৃত্বে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে বুকের তাজা রক্ত ঝড়িয়ে অবশেষে দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ছাতককে শত্রুমুক্ত করেন। ৮ ডিসেম্বর ছাতকের সর্বস্তরের মানুষ তাদের প্রিয়নেতা মো. আব্দুল হক ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশের মাধ্যমে বরণ করে নেয়। ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি অর্জন করে চূড়ান্ত বিজয়। পূর্ণ হয় মুক্তিপাগল বাঙালির স্বপ্ন সাধ। জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
মাত্র ২ দিন পর ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে স্বাধীন বাংলা সরকার কর্তৃক নিযুক্ত উত্তর—পূর্বাঞ্চলীয় জোনের প্রশাসক জনাব দেওয়ান ফরিদ গাজীর সভাপতিত্বে সিলেট রেজিস্টারি মাঠে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করেন মো. আব্দুল হক। সুনামগঞ্জ মহকুমার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশনা শেষে সভা শেষে সুনামগঞ্জ যাওয়ার পথেই সিলেট শহরতলীর ঘোপাল নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় শাহাদাৎ বরণ করেন জননেতা এম. এন.এ আব্দুল হক। অবসান ঘটে এক দীর্ঘ সংগ্রামী ও বণার্ঢ্য রাজনৈতিক জীবনের। তিনি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ৫নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ‘হক নগরের’ নিবিড় শ্যামলিমায়।
জননেতা মো. আব্দুল হক আমাদের মাঝে নেই। তাঁকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন বুনেছিল সাধারণ মুক্তিকামী মানুষ। এদেশের মানুষের স্মৃতিতে তিনি চির অম্লান থাকবেন। এ ক্ষণজন্মা, ত্যাগী, বিচক্ষণ, সাহসী রাজনীতিককে আমরা যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবো। মো. আব্দুল হক চিরকাল আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তাঁর মহৎ কর্মের মাধ্যমে।