- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

‘এমন বৃষ্টি বাপের জনমে দেখি নাই’

সুব্রত দাশ খোকন, শাল্লা
“চৈত মাসে এভাবে ২৫ দিন লাগাতার বৃষ্টি বাপের জনমেও দেখি নাই। মাঝে মধ্যে বৈশাখ মাসে ভারী বৃষ্টির কারণে বন্যা অইতো, কৃষকেরা পাকনা ধান কিছু অইলেও তুলতে পারত। এইবার চৈত মাসে হাওরে পানি ঢুকায় ধান না পাকায় আমরা এক মুইট ধানও তুলতে পারি নাই। এখন বউ, পোলা-পানরে নিয়া কিভাবে বাচুম”।
এই আক্ষেপ শাল্লার সবচেয়ে বড় হাওর ছায়ার হাওর পাড়ের গ্রাম সুলতানপুরের কৃষক মো: আক্তার মিয়ার।
অসময়ে লাগাতার ২৫ দিন ভারী বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ী ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শত শত হাওরের ন্যায় শাল্লা উপজেলার শাল্লা ইউনিয়ন, হবিবপুর ইউনিয়ন ও বাহাড়া ইউনিয়নের কিছু অংশের হাওরগুলো ৫ দিন আগে তলিয়ে যায়। কিন্তু এতদিন ছায়ার হাওর টিকে ছিল। শাল্লার কৃষকের শেষ ভরসার হাওর ছায়ার হাওরকে বাঁচাতে হাওর পাড়ের হাজার হাজার কৃষক হাওরের বিভিন্ন বাঁধ ও দাড়াইন নদীর পাড়কে দিন-রাত মাটি কেটে বাঁধ ও নদীর পাড় উচু করে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির কারণে কৃষকের দিন রাতের পরিশ্রমকে পন্ডশ্রমে পরিণত করে গত পরশু শুক্রবার রাত ৯ ঘটিকায় ছায়ার অসংখ্য বাঁধের একটি বাগড়াধরা       
বাঁধ ভেঙ্গে ছায়ার হাজার হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ধান আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে।
জীবন-জীবিকার অবলম্বন একমাত্র ফসল হারানোয় শাল্লা উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন উৎকণ্ঠা ও শোকাবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।  ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের থেকে দাবি উঠেছে শাল্লাকে “দুর্গত এলাকা” ঘোষণা করার জন্য।
হবিবপুর ও শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল ও জামান চৌধুরী বলেন- শাল্লার যে দিকে তাকানো যায় শুধু পানি আর পানি, মনে হচ্ছে যেন আষাঢ় মাস। যে গ্রামেই যাই মানুষের মধ্যে শুধু হাহাকার। এখন আমরা কিভাবে বাঁচবো ? প্রধানমন্ত্রীকে ১০ টাকা কেজি দরে চাউল দিলেই চলবে না। শাল্লাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে তেল, ডাল, লবণ, পেঁয়াজসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস রেশন ব্যবস্থায় সারা বছর দিতে হবে।
ডুমরা গ্রামের রবীন্দ্র সরকার বলেন- আরে ভাই সরকার ১০ টাকা কেজি দরে চাউল দিবে, কিন্তু আমরা টাকা পাব কোথায় ? সরকারকে আমাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। নতুবা আমাদের তিনবারের পরিবর্তে একবার অন্তত খাইতে পারি সেই হিসাবে রিলিফের ব্যবস্থা করুক।
শাল্লা ইউনিয়নের কান্দিগাঁও গ্রামের ইসলাম মিয়ার স্ত্রী হালেমা আক্তার বলেন- আমার স্বামী ১০ কের জমি করেছিল, কিন্তু ক্ষেতের ধানে একটি পুছও (কাটা) দিতে পারে নাই। আমি গ্রামীণ ও আশা থেকে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ৩৬,০০০/- টাকা লোন নিয়ে একটি গাই (গাভী) কিনেছিলাম। এখন নিজেরা কি খামু ? গাইডারে কিভাবে পালমু ? আর এনজিও ব্যাটাদের কিস্তির তাগদা কিভাবে সহ্য করব ?
বাহাড়া গ্রামের কবীন্দ্র দাশ বলেন- আমরা খাই না খাই কামলা (আট মাসের জন্য রাখা শ্রমিক) ডারে তো বিদায় করতে হবে তাই আমার দুইডা বিছাল (ষাড়) বিক্রি করছি পানির দামে। ফাল্গুন মাসে একটার দাম অইছিল ৫০,০০০/- টাকা । এখন দুইডা বিক্রি করতে অইছে ৫০,০০০/- টাকায়।
মুক্তারপুর গ্রামের কৃষক নগেন্দ্র সরকার বলেন- আমাদের শেষ  ভরসার ছায়ার হাওর রক্ষার জন্য দাড়াইন নদীর অন্তত ২৫/৩০ মাইল নদীর পাড় ও পাড় সংলগ্ন বিভিন্ন বাঁধকে রক্ষার জন্য হাজার হাজার মানুষ পালাক্রমে গত ১৫ দিন যাবৎ সকালে কিছু খেয়ে উড়া-কোদাল নিয়ে বের হতাম, দুপুরে কোন দিন না খেয়ে, কোনদিন সৌমেন সেনের পাঠানো চিড়া-গুড় খেয়ে এবং আমরা নিজেরা চাঁদা তুলে বাঁশ কিনে হাওর রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু গত পরশু আমাদের সব শেষ। এখন আমরা কিভাবে বাঁচবো ?

  • [১]