- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

এমপি-উপজেলা চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে সড়ক- এলজিইডি মূল ভূমিকা পালন করুক

গ্রামীণ অবকাঠামো বিশেষত সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপনে বিশ্বের রোল মডেল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কিন্তু সম্প্রতি খবর মিলছে, সারা দেশে ৬৩ হাজার কিলোমিটারের বেশি গ্রামীণ সড়ক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের (এলজিআই) হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। দুই কিলোমিটারের কম দৈর্ঘ্যের (টাইপ বি) এসব সড়ক এখন থেকে মেরামত, সংস্কার ও তত্ত্বাবধান করবে উপজেলা সমন্বয় কমিটি, যার নেতৃত্বে থাকবেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা। এর মধ্য দিয়ে কার্যত এসব সড়ক নিয়ন্ত্রণ করবেন তারাই। ফলে সংশ্লিষ্ট সড়কে এলজিইডির নিয়ন্ত্রণ আর থাকছে না। বলা হচ্ছে, স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালীকরণের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, স্থানীয় সড়কের পরিমাণ বেড়ে ওঠায় সেগুলো তদারক ও মেরামত করতে বেগ পেতে হচ্ছে এলজিইডিকে। কাজের মানও হচ্ছে নিম্ন, দেখভালেও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাড়তি লোকবলের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সড়কের কিছু অংশ স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছেন অনেকে। এর মাধ্যমে জবাবদিহিতা তৈরি হবে, স্থানীয় জনগণও সড়কগুলো দেখভাল করতে পারবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্থানীয় সরকারের এ সক্ষমতা ও দক্ষতা রয়েছে কিনা। তাছাড়া স্থানীয় সরকারের দুর্নীতির কাহিনী যেভাবে চাউর হয়েছে, তাতে তাদের পক্ষে সড়কের কাজ কীভাবে সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব? জানা যাচ্ছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত কোনো বিশেষজ্ঞও নেই। তাই এলজিআইয়ের হাতে সড়ক ছেড়ে দেয়ার ফলে নিম্নমানের কাজ যেমন হবে, একইভাবে সরকারের ব্যয়ও বাড়বে। গ্রামীণ যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণে এলজিইডির তদারকি ও অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের নিয়ন্ত্রণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে। সড়ক সংস্কারে ঠিকাদার নিয়োগে থাকবে রাজনৈতিক প্রভাব। অতিরিক্ত ব্যয়ের পাশাপাশি কাজও হবে নিম্নমানের। এতে দুর্বল হবে স্থানীয় অবকাঠামো। আবার এ কথাও সত্য, দিন দিন স্থানীয় সড়ক অবকাঠামোর বিস্তৃতির সঙ্গে এলজিইডির জনবল বাড়েনি। ফলে অনেক গ্রামীণ সড়ক তাদের পক্ষে দেখভাল করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। এর বিকল্প হিসেবে স্থানীয় সরকারের হাতে কিছু সড়ক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি ছেড়ে দিলে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। এমন চিন্তা-ভাবনা ইতিবাচক। কিন্তু এজন্য চাই যথাযথ প্রস্তুতি। স্থানীয় সড়ক যোগাযোগ ও তদারক ব্যবস্থা উন্নত করতে হলে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা আরো বাড়াতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকারকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। তার আগ পর্যন্ত সড়ক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে এলজিইডিকেই মূল ভূমিকায় রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে দুর্নীতি কমিয়ে আনা ও কাজের মান ভালো করতে স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা আরো বাড়ানো যেতে পারে। এতে সংশ্লিষ্টরাও দক্ষ হয়ে উঠবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক সিদ্ধান্ত নেয়াটাই হবে যুক্তিযুক্ত। হঠাত্ করে সিদ্ধান্ত নেয়ায় গ্রামীণ সড়ক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা কারো কাম্য নয়। ভুলে গেলে চলবে না, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রামীণ উন্নয়নে অন্যতম ভূমিকা রাখছে এ সড়কগুলো। এগুলোর অধিকাংশই আবার ভাঙাচোরা, যার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না স্থানীয় সড়ক। এমন পরিস্থিতিতে সড়কগুলোর মান উন্নয়ন এবং তা দেখভাল করার জন্য বিকল্প ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি, যা গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফলপ্রসূ হবে। এ মুহূর্তে এলজিইডিকে পুরোপুরি বাদ রেখে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত করা সম্ভব নয়। ফলে বিকল্প কাঠামো তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত সড়ক মেরামতে এলজিইডিকে সম্পৃক্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও বিপুল কর্মসংস্থানে গ্রামীণ অর্থনীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সুফল এরই মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হয়েছে। বর্তমানে মধ্যম আয়ের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের যে অভিযাত্রা, সেখানে গ্রামই কেন্দ্রভূমি। এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সবমিলে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নত এবং একে ব্যবহার উপযোগী রাখা প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, শুধু সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না, সেগুলোর নিয়মিত সংস্কার সাধন করা জরুরি। এটি নিশ্চিতে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নেবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

  • [১]