বিন্দু তালুকদার
‘হাসপাতালও দিনের পর দিন কারেন্ট (বিদ্যুৎ) থাকত না। মমবাত্তি ও হারিকেন জ্বালাইয়া থাকন লাগত। একবার কারেন্ট গেলে, কোন সময় আবার আইত, ইতার কোন ঠিক ঠিকানা আছিল না’। অকন সৌর বিদ্যুৎ লাগাইন্নে আর কোন সমস্যা নাই। হাসপাতালে আর মমবাত্তি ও হারিকেন নিয়া আওন লাগে না। সৌর বিদ্যুতের ফরে (আলোতে) রাইতও দিনের মতই লাগে।’ সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্ধকারের পরিবর্তে সৌর বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হওয়ায় নিজের অভিব্যক্তি জানালেন উপজেলার বাহারা ইউনিয়নের সুকলাইন গ্রামের কৃষক বিজন চন্দ্র দাস (৩২)। গত ২ ফেব্রুয়ারি তিনি তার প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন।
বিজন চন্দ্র দাস আরো বলেন,‘আমরার হাসপাতাল কারেন্ট থাকে না,ইতা সবাই জানে। রাইত আন্দাইর থাকে ইতা জাইন্নাও আমার বউরে ডেলিভারীর লাগি হাসপাতালও লইয়া যাই। গিয়া দেখি সবতাই বদলি গেছে। সারা হাসপাতালে সৌর বিদ্যুৎ লাগানি অইছে। রাইত আর অকন মমবাত্তি ও হারিকেন লাগে না। সৌর বিদ্যুতে কি যে উপকার অইছে শাল্লার মানুষ ছাড়া কেউ বুঝত নায়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দ্বিতীয় লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রজেক্ট (এলজিএসপি-২) এর অর্থায়নে ও ইউনিয়ন পরিষদ সাপের্ট প্রজেক্ট (ইউজিপি) এর কারিগরি সহায়তায় ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে শাল্লা উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন (শাল্লা, বাহারা, হবিবপুর ও আাটগাঁও) পরিষদের যৌথ অর্থায়নে ৭০ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে যৌথ প্রকল্পে শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সৌর বিদ্যুৎ সংগ্রহের প্রয়োজনীয় সকল সামগ্রী (সোলার প্যানেল) স্থাপন করা হয়েছে।
উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে পুরো হাসপাতালে সৌর বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের বিষয়টিকে যুগান্তকারী উন্নয়নমূখি একটি প্রকল্প বলে মন্তব্য করেছেন এলাকার সকল শ্রেণি পেশার মানুষ।
জানা যায়, ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ১৩০ ওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ৬ টি সোলার প্যানেলের মাধ্যমে শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কপ্লেক্সের ভেতর ৪২ টি বাতি, ৪ টি ফ্যান স্থাপন করা হয়। পুরো হাসপাতালে সোলার প্যানেল স্থাপন করায় উপজেলাবাসীর কয়েক যুগের অন্ধকার দূর ও দুর্ভোগের অবসান হয়েছে। সৌর বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হচ্ছে হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড, ডেলিভারী কক্ষ, প্রসব পরবর্তী পরিচর্চা কক্ষ, হাসপাতালের অফিস কক্ষ, চিকিৎসকের বসার কক্ষ, বিভিন্ন রুমসহ পুরো হাসপাতাল।
শাল্লা উপজেলা সদরের ঘুঙ্গিয়ার
গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী বরুণ চন্দ্র সরকার (৩৮) বলেন,‘গত রবিবার রাতে রোগী নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। উপজেলায় বিদ্যুৎ না থাকলেও হাসপাতালে দেখি আলো জ্বলছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উদ্যোগে নাকি সৌর বিদ্যুৎ দেয়া হয়েছে। এ জন্য বিশেষ ধন্যবাদ। ’
শাল্লা উপজেলা সদরের ঘুঙ্গিয়ারগাঁও সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক সুব্রত কুমার দাশ বলেন,‘আমাদের উপজেলা সারা দেশের মধ্যে একটি অবহেলিত এলাকা হিসাবে পরিচিত। এখানে একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে, দিনের পর দিন অন্ধকারে থাকতে হয়। এই অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কপ্লেক্সে রাতে মোমবাতি ও হারিকেনই ছিল ভরসা। এমনকি হারিকেনের আলোতে মহিলাদের ডেলিভারী পর্যন্ত করা হত। অতীতে যারা হাসপাতালে ভর্তি হতেন, বাড়ি থেকে হারিকেন বা বাজার থেকে মোমবাতি কিনে সঙ্গে নিয়ে যেতেন তাদের দুর্ভোগের অবসান হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের এই কাজটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার’।
উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এমদাদুল হক বলেন,‘হাওর অধ্যুষিত দেশের দুর্গম এলাকা হিসাবে পরিচিত শাল্লা। আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ থাকত না। যার কারণে উপজেলাবাসীর একমাত্র চিকিৎসার ভরসাস্থলটি অন্ধকারাছন্ন থাকত। জনগুরুত্বপূর্ন ও জনস্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা চার ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে এলজিএসপি ২ প্রকল্পের অর্থায়নে সম্পূর্ন হাসপাতালে সোলার প্যানেল স্থাপন করেছি। আমাদের এই উদ্যোগের ফলে হাসপাতালে এখন হারিকেন জ্বালাতে হয় না। এলাকার ধনী-গরিব সকলই এর উপকারভোগী’।
শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পা কর্মকর্তা ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন,‘ উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে হাসপাতালে অন্ধকার দূর করতে সোলার প্যানেল স্থাপন করে দেয়ার বিষয়টি একটি যুগাস্তকারী পদক্ষেপ। হাসপাতালে সৌর বিদ্যুৎ প্রদান করায় খুবই উপকার হয়েছে। আগে বিদ্যুতের অভাবে হারিকেন ও মোমবাতি দিয়ে সকল কর্মকা-ের সঙ্গে ডেলিভারী পর্যন্ত করতে হতো। এখন বিদ্যুৎ না থাকলেও আমাদের কোন সমস্যা হয় না। পুরো হাসপাতাল সৌর বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত থাকে।’
এলজিএসপি-২ ও ইউপিজিপি প্রকল্পের সুনামগঞ্জ জেলা সহায়ক খন্দকার রবিউল আওয়াল নাসিম বলেন,‘প্রকল্প দু’টির শুরু থেকেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপকারে আসে এবং সহ¯্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হয়, (এমডিজি) বাস্তবায়ন হয়, এমন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় শিক্ষা,স্বাস্থ্য, কৃষি উন্নয়ন ও দারিদ্র দূরিকরণে নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কপ্লেক্সে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে। আমার জানামতে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলোর ব্যবস্থা করা শাল্লায়ই দেশের প্রথম। এই প্রকল্পের সুফল সারা উপজেলাবাসী ভোগ করছেন।’
সুনামগঞ্জ জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ পরিচালক দেবজিৎ সিংহ বলেন,‘শাল্লায় অতীতে দিনে ৪-৫ ঘণ্টার বেশী বিদ্যুৎ থাকত না। অধিকাংশ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অন্ধকারছন্ন হয়ে থাকত। চারটি ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এলজিএসপির-২ প্রকল্পের অর্থায়নে দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ সবার সেবা নিশ্চিত করতে আমরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা করেছি। এখন হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীরা আলোতে সেবা পাচ্ছেন। রাতে সার্বক্ষণিক আলোর ব্যবস্থা করায় হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগীদের আগের চেয়ে এখন বেশী সেবা প্রদান করছেন। স্থানীয় সরকার এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ করছে বলেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। ’
তিনি আরো বলেন,‘ইউনিয়ন পরিষদের কাছে স্থানীয় জনগণের কাঙ্খিত চাওয়া-পাওয়া, কাজের স্বচ্চতা ও জবাবদিহীতা অনেকগুণ বেড়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে জনগণের কাছাকাছি যাচ্ছেন’।