বিন্দু তালুকদার
সিরাজ মিয়া (৭২) পেশায় প্রবীণ কৃষক। হাওরে বোরো জমি চাষ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছিলেন মধ্যনগরের দ. বংশিকুন্ডা ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামে।
প্রতি বছরের ন্যায় গত বোরো মৌসুমে সল্টুবাড়ি ও গজতলা হাওরে ২৪ কেদার বোরো জমি চাষাবাদ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাঁধ ভেঙে কাঁচা ধান অকালে পানিতে তলিয়ে গেছে।
বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন বোরো ধান হারিয়ে ১৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে অসহায় সিরাজ মিয়া দিশেহারা হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকার গাজিপুরে চলে যান। সময় গড়িয়ে আবারো বোরো মৌসুম শুরু হলেও গ্রামে ফিরেননি সিরাজ মিয়া ও তার পরিবার। সিরাজ মিয়া এই বছর গ্রামে ফিরবেন না এবং জমি চাষ করবেন না বলে জানিয়েছেন।
শুধু সিরাজ মিয়াই নয় বোরো ফসলহানির কারণে হাওর এলাকার অনেক কৃষক পরিবার বাঁচার তাগিদে বাপ দাদার ভিটে ও হাওর ছেড়ে শহরে পাড়ি দিয়েছেন। চলতি বোরো মৌসুমে কিছু কৃষক পরিবার আবারো জমি চাষাবাদের প্রস্তুতি নিলেও অনেকেই আবার হাওরমুখি হচ্ছেন না।
কৃষক সিরাজ মিয়া বলেন,‘ ২ হাল (২৪ কেদার) জমি করেছিলাম একটা ধানও কাটতে পারিনি। চৈত মাসের ১৬ তারিখ হাওর তলিয়েছে। উপায় না পেয়ে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছি। এইবার জমি করার মত টাকা নেই, তাই নিজের ৪ কেদার জমিও বর্গা দিয়েছি। আমার মত গ্রামের গিয়াস উদ্দিনও একইভাবে ১২ কেদার জমি করে নিঃস্ব হয়েছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামালগঞ্জের হালীর হাওরপাড়ের বেহেলী ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের আক্তার আলীর ছেলে রাজা মিয়া, সিরাজুল
হকের স্ত্রী শামরাজ বেগম, দুলা মিয়ার স্ত্রী মাহমুদা বেগম, আব্দুস সাত্তারের ছেলে আলী আকবর, মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে তাজমহল বেগম, আব্দুল মনাফের ছেলে বোরহান মিয়া, বাদশা মিয়ার ছেলে আব্দুল বারিক, সহদেবপুর গ্রামের সন্দীপ তালুকদারের স্ত্রী রূপালী তালুকদার, মানিক সরকারের স্ত্রী জ্ঞানদা রানী সরকার, মৌরচাঁদ সরকারের ছেলে রনজন সরকার, সতীশ ভৌমিকের ছেলে উৎপল ভৌমিক, দুর্গাপুর গ্রামের গরিন্দ্র দাসের ছেলে চিনু দাস, ফটি সরকারের স্ত্রী ভগবতি সরকার, রাধারমন সরকারের ছেলে রাধিকা সরকার, ব্রজেন্দ্র সরকারের ছেলে যতি সরকার, হিজলা গ্রামের হরিচরন বর্মণের ছেলে কিরন বর্মণ ও কঞ্চলাল বর্মণ, নয়াপাড়া গ্রামের মনমোহন সরকারের ছেলে চঞ্চল সরকার, মদনাকান্দি গ্রামের নরেশ বিশ্বাসের ছেলে অনিল বিশ্বাস বোরো ফসলহানির পর পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে রাজধানী শহর ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় পাড়ি জমান। ওইসব কৃষক পরিবার নিজেরা হাওরে বোরো জমি চাষ করতেন, কেউ বা অন্যের জমির উপর নির্ভরশীল।
এসব কৃষক পরিবার বোরো ফসল হারিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বেহেলী ইউপির ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্যানেল চেয়ারম্যান মশিউর রহমান।
মশিউর রহমান বলেন,‘হাওরে বেঁেচ থাকার একমাত্র অবলম্বন বোরো জমি। সেই জমির ফসল তলিয়ে বা কোন কারণে নষ্ট হয়ে গেলে বাঁচার আর কোন পথ থাকে না। তাই বাধ্য হয়েই অনেক কৃষিজীবী পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গেছেন। আমার জানা মতে এসব পরিবার এখনও গ্রামে ফিরেননি। এছাড়া পাশ্ববর্তী হরিনাকান্দি, বদরপুর, আলীপুর, আছানপুর গ্রামের অন্তত অর্ধশত পরিবার গ্রাম ছেড়েছে। ’
হরিনাকান্দি গ্রামের কৃষক বাদল মিয়া বলেন,‘আমাদের গ্রামের অন্তত ৪০টি পরিবার গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় গেছে। ওই পরিবারগুলোর মধ্যে কেউ কেউ গ্রামে ফিরবে; আবার অনেকেই ফিরবে না। বোরো জমি চাষাবাদে মানুষের আগ্রহ কিছু কমে গেছে।’
তবে ঢাকার মিরপুরে অবস্থানরত হরিনাকান্দি গ্রামের কৃষক রোকন মিয়া মোবাইল ফোনে বললেন,‘আমি গত বছর ২ হাল (২৪ কেদার) জমি করেছিলাম; সব পানিতে তলিয়ে গেছে। উপায় না পেয়ে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলাম। জমি করার সময় চলে আসছে তবে টাকা পয়সা না থাকায় আসতে পারছি না। যেভাবেই হোক বাড়িতে আসব, আবারো জমি চাষ করব। জমি করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। ’
মধ্যনগরের কালীহানি হাওরপাড়ের মাছিমপুর গ্রামের ২৫টি পরিবার ফসলহানির পর গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গিয়েছিল। ওই পরিবারগুলো আজও বাড়িতে ফিরেনি। তবে ওই পরিবারগুলো ঢাকা থেকে আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে নতুন করে আবারও জমি চাষাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এই বিষয়টি জানিয়েছেন মাছিমপুর গ্রামের বাসিন্দা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট আনিসুল ইসলাম। তিনি জানান, ধান হারিয়ে ২৫টি পরিবার ঢাকায় চলে গিয়েছিল; পরিবারগুলো ফিরবে কিনা জানি না। তবে টাকা-পয়সা পাঠিয়ে তারা জমি চাষের জন্য বীজতলা তৈরি করছেন।
মধ্যনগরের চামরদানী ইউপির চেয়ারম্যান জাকিরুল আজাদ মান্না বলেন,‘ বোরা ধান হারিয়ে মানুষ দিশেহারা হয়েছে। আমার ইউনিয়নের অন্তত ৪-৫’শ পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গিয়েছিল; ওই পরিবারগুলো এখনও গ্রামে ফিরেনি। সরকার থেকে সার, বীজ ও নগদ টাকা দিলেও অনেকেই বাড়ি ফিরছেন না। হাওরের বোরো চাষাবাদ নিয়ে আবারও আশায় আছি; কিন্তু অনেক কৃষক নিরাশ হয়েছেন।’
দিরাইয়ের কালিকুটা হাওরপাড়ের মির্জাপুর গ্রামের কৃষক এনামুল হাসান বলেন, ‘আমাদের গ্রামের ২০-২৫ টি কৃষক পরিবার হাওর ডুবির পর শহরে চলে গিয়েছিল। তারা এখনও গ্রামে ফিরেনি। তাদের অনেকেই জমি করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন; তারা এবছর জমি করবেন কিনা সন্দেহ আছে।’
শনির হাওরের ৩০ কেদার জমির মালিক তাহিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন,‘বার বার ফসলহানির কারণে কৃষকরা বোরো চাষাবাদে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। অনেকের জমি চাষ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। জমি করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও কৃষকদের হাতে নেই। এইবার কৃষকেরা ভাবছেন হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ ভাল হবে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কৃষকরা কিছুটা ভীত। কারণ হাওরের পানি নামতে দেরি হওয়ায় এবার জমি চাষাবাদ অন্তত ১৫ দিন পিছিয়ে যাবে। ’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন,‘ হাওরের বোরো ফসলহানির পর কিছু পরিবার এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন শহরে গিয়েছিল। আমরা আশা করি জমি চাষ করতে তারা বাড়ি ফিরে আসবেন। সরকারিভাবে কৃষকদের সার, বীজ ও নগদ টাকা দেয়া হচ্ছে। হাওরের বোরো জমি কোন সময়ই পতিত থাকবে না। কৃষকরা তাদের জমি চাষাবাদ করবেন।’