বিশ্বজিত রায়
প্রকৃতি আজ উতলা। বইছে শরতের শুভ্রতা। মাথার ওপর নীলাকাশ, চরণতলে মৃত্তিকা এবং মধ্যস্থলে মেঘবালিকার ধবল নৃত্য। পথের ধার, নদীর তীর, পুকুর-ঝিল, বন-বাদাড়, বাড়ির আঙিনা, দিগন্তজোড়া মাঠ সবখানেই মিষ্টি শরতের ডামাঢোল। অপরূপ ঋতুরাণী। ঠোঁটের কোণে তার রঙিন হাসি। ঘুমটা মাথায় লজ্জালাল রূপবতী। মনে হয় যেন সুন্দরের প্রতিমূর্তি। প্রকৃতি তাই বলে ওঠে তুমি কত সুন্দর! কে-গো সাজিয়েছে তোমায়? জানার বাসনা জাগে যে মনে। উত্তরে শরৎ কণ্ঠ।
আমায় মোহনীয় করেছে ওরাÑ শিউলি, জবা, শাপলা, পদ্ম, জুঁই, কাশ, কামিনী, জারুল, বেলি, মল্লিকা, মাধবী, ছাতিম, মালতি, দোলনচাঁপা, ধুতরা, টগর, বকুল, গোলাপ আর নয়নতারা। রাতের নিশাচর, ভোরের ফিঙে, শিশির¯œাত সকালের ঘাস, দুপুরের তপ্ত রোদে আক্রান্ত ঘুঘু, শেষ বিকেলের গোধূলি লগ্ন এবং মানব হৃদয়ে মাধুর্য্যতা বিলিয়েছে এসব ফুল। শরতের সারা অঙ্গে জড়িয়ে আছে অলংকারের ন্যায়। প্রতিটি পুষ্প পাপড়ির নিজ নিজ রঙ নিলীমা, সুগন্ধি গুণ আর বাচনভঙ্গি শরতকে সমর্থন যুগিয়েছে ঋতুরাণীর মোহনীয় মর্যাদায় আরোহণে। অনেক ক্ষেত্রে ঋতুরাজ বসন্তকেও পেছনে ফেলেছে এই সিজন কুইন। আড়মোড়া ভেঙে প্রকৃতি জেগে ওঠে শরৎ¯œানে। এই সময়টিতে হাসিখেলায় মত্ত থাকে চারপাশ। যেন সাজ সাজ রব, মনে হয় নতুন অতিথি বরণের মাহেন্দ্রক্ষণ। হ্যাঁ, সত্যিই অতিথি আসবেন এই মধুর লগনে। শরৎ মানেই জগজ্জননী দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। তাইতো অসুর নাশকারী দেবীর পৃথিবীস্পর্শে পূর্ণতা পায় ঋতুরাণী শ্বেত শরৎ। কিন্তু এবারকার আগমন একটু ভিন্ন। দেবী আসবেন শরতের মাঝবেলায়। তাই ঋতুভাস্কর শরৎ বিশ্বময়ীর শুভাগমন সংক্রান্ত নিমন্ত্রণ পত্রটি আগেভাগেই পড়ে শুনিয়েছে দুর্গা জননীর আশীর্বাদ প্রত্যাশী প্রকৃতি ও মানুষকে।
হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয়
উৎসব শারদীয়া দুর্গাপূজা। বছর ঘুরে বছর আসে। প্রতিবারের ন্যায় দেবী বরণে এবারও প্রস্তুত হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। সবাই সমবেত হবেন তাঁর চরণতলে। জগজ্জননীর সন্তুষ্টি লাভে পাঁচদিনব্যাপী পূজার্চ্চনায় মাতবে সনাতন বিশ্বাসী মানুষজন। উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়বে সবখানে। প্রার্থনা থাকবে কলুষমুক্ত সমাজ, সুন্দর দেশ ও সুস্থ পৃথিবী গড়ার। মানবধরা আজ অন্যায়-অবিচার, পেশিশক্তি, জোর-জবরদস্তি, অত্যাচার-নির্যাতন, লোভ-লালসাসহ নানা বিশৃঙ্খলায় আক্রান্ত। বাড়ছে মানুষে মানুষে হানাহানি ও রক্তপাত। মানুষের মধ্যে ভর করেছে পশুত্ব। অনেক ক্ষেত্রে অত্যাচারী অসুরদেরকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে তারা। তাই জগৎমাতা দেবী দুর্গার সুদৃষ্টি সর্বাগ্রে একান্ত প্রয়োজন। মায়ের আশীর্বাদ পর্যবসিত হোক এই বসুন্ধরায়। দূর হোক অন্ধকার, ছড়িয়ে পড়–ক আলো। মানুষের মাঝে উদয় হোক শুভ বুদ্ধি। বিরাজ করুক শান্তির সুবাতাস। এমন প্রার্থনাই রইল আনন্দময়ীর কাছে।
হিন্দু ধর্মে দেবী দুর্গা পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে তিনি শিবের স্ত্রী পার্বতী, কার্তিক ও গণেশের জননী এবং কালীর অন্যরূপ। হিন্দুশাস্ত্রে ‘দুর্গা’ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছেÑ
‘‘দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।
উকারো বিঘœনাশস্য বাচকো বেদসম্মত ॥
রেফো রোগঘœবচনো গশ্চ পাপঘœবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘœবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত ॥’’
অর্থাৎ, ‘দ’ অক্ষরটি দৈত্য বিনাশ করে, উ-কার বিঘœ নাশ করে, রেফ রোগ নাশ করে, ‘গ’ অক্ষরটি পাপ নাশ করে এবং অ-কার শত্রু নাশ করে। এর অর্থ, দৈত্য, বিঘœ, রোগ, পাপ ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা। অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম বলেছে, ‘দুর্গয় নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা।’ অর্থাৎ, যিনি দুর্গ নামে অসুরকে বধ করেছিলেন, তিনি সব সময় দুর্গা নামে পরিচিত। শ্রীশ্রীচ-ী অনুসারে যে দেবী ‘নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যাঃ’ (সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি), তিনিই দুর্গা। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে শারদীয়া এবং চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে বাসন্তী দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। শারদীয়া দুর্গাপূজাকে ‘অকালবোধন’ বলা হয়। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। শাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাঁদের পূজার যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে এই পূজার নাম হয় ‘অকালবোধন’। রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর রামায়ণে লিখেছেন, রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। এই জন্য স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে শরৎকালে দুর্গাপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে শ্রীকৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছেÑ
‘‘প্রথমে পূজিতা সা চ কৃষ্ণেন পরমাত্মনা।
বৃন্দাবনে চ সৃষ্ট্যাদ্যৌ গোলকে রাগম-লে।
মধুকৈটভভীতেন ব্রহ্মণা সা দ্বিতীয়তঃ।
ত্রিপুরপ্রেষিতেনৈব তৃতীয়ে ত্রিপুরারিণা ॥
ভ্রষ্টশ্রিয়া মহেন্দ্রেন শাপাদ্দুর্বাসসঃ পুরা। চ
তুর্থে পূজিতা দেবী ভক্ত্যা ভগবতী সতী ॥
তদা মুনীন্দ্রৈঃ সিদ্ধেন্দ্রৈর্দেবৈশ্চ মুনিমানবৈঃ।
পূজিতা সর্ববিশ্বেষু বভূব সর্ব্বতঃ সদা ॥’’
অর্থাৎ, সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসম-লে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শিব বিপদে পড়ে তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গাপূজা। এরপর থেকেই পৃথিবীতে মুনিঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মানুষেরা নানা দেশে নানা সময়ে দুর্গাপূজা করে আসছে।
এছাড়াও শাক্তধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীর শাসক হয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে দুর্গার মাটির মূর্তি তৈরি করে পূজা করেন। এই সময় তিনি ‘বাগ্ভব’ বীজ জপ করতেন এবং আহার ও শ্বাস গ্রহণ ত্যাগ করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে একশো বছর ধরে ঘোর তপস্যা করেন। এর ফলে তিনি শীর্ণ হয়ে পড়লেও, কাম ও ক্রোধ জয় করতে সক্ষম হন এবং দুর্গানাম চিন্তা করতে করতে সমাধির প্রভাবে স্থাবরে পরিণত হন। তখন দুর্গা প্রীত হয়ে তাঁকে বর দিতে আসেন। মনু তখন দেবতাদেরও দুর্লভ একটি বর চাইলেন। দুর্গা সেই প্রার্থনা রক্ষা করেন। সেই সঙ্গে দুর্গা তাঁর রাজ্যশাসনের পথ নিষ্কণ্টক করেন এবং মনুকে পুত্রলাভের বরও দেন।
দুর্গা ও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যতগুলি পৌরাণিক গল্প প্রচলিত আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি পাওয়া যায় শ্রীশ্রীচ-ী বা দেবীমাহাত্ম্যম্-এ। দেবীমাহাত্ম্যম্ আসলে মার্ক-েয় পুরাণ-এর একটি নির্বাচিত অংশ। শ্রীশ্রীচ-ী গ্রন্থে বর্ণিত কাহিনি অনুসারেÑ পুরাকালে মহিষাসুর দেবগণকে একশতবর্ষব্যাপী এক যুদ্ধে পরাস্ত করে স্বর্গের অধিকার কেড়ে নিলে বিতাড়িত দেবগণ প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাঁকে মুখপাত্র করে শিব ও নারায়ণের সমীপে উপস্থিত হলেন। মহিষাসুরের অত্যাচার কাহিনি শ্রবণ করে তাঁরা উভয়েই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলেন। সেই ক্রোধে তাঁদের মুখম-ল ভীষণাকার ধারণ করল। প্রথমে বিষ্ণু ও পরে শিব ও ব্রহ্মার মুখম-ল হতে এক মহাতেজ নির্গত হলো। সেই সঙ্গে ইন্দ্রাদি অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হয়। সু-উচ্চ হিমালয়ে স্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজঃপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করল। প্রত্যেক দেবতা তাঁদের আয়ূধ বা অস্ত্র দেবীকে দান করলেন। হিমালয় দেবীকে তাঁর বাহন সিংহ দান করলেন। এই দেবীই অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মী রূপে মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন (শ্রীশ্রীচ-ী অনুসারে, মহালক্ষ্মী দেবী মহিষাসুর বধ করেন। ইনিই দুর্গা। তবে বাঙালিরা এঁকে দশভূজারূপে পূজা করে থাকেন)। দেবী ও তাঁর বাহনের সিংহনাদে ত্রিভুবন কম্পিত হতে লাগলো। মহিষাসুর সেই প্রকম্পনে ভীত হয়ে প্রথমে তাঁর সেনাদলের বীরযোদ্ধাদের পাঠাতে শুরু করলেন। দেবী ও তাঁর বাহন সিংহ প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করে একে একে সকল যোদ্ধা ও অসুরসেনাকে বিনষ্ট করলেন। তখন মহিষাসুর স্বয়ং দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেন। যুদ্ধকালে ঐন্দ্রজালিক মহিষাসুর নানা রূপ ধারণ করে দেবীকে ভীত বা বিমোহিত করার প্রচেষ্টায় রত হলেন; কিন্তু দেবী সেই সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিলেন। তখন অসুর অহঙ্কারে মত্ত হয়ে প্রবল গর্জন করল।
দেবী বললেনÑ ‘‘গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধু যাবৎ পিবাম্যহম। ময়া ত্বয়ি হতেহত্রৈব গর্জিষ্যন্ত্যাশু দেবতাঃ ॥’’ অর্থাৎ, রে মূঢ়, যতক্ষণ আমি মধুপান করি, ততক্ষণ তুই গর্জন করে নে। আমি তোকে বধ করলেই দেবতারা এখানে শীঘ্রই গর্জন করবেন। এই বলে দেবী লম্ফ দিয়ে মহিষাসুরের উপর চড়ে তাঁর কণ্ঠে পা দিয়ে শূলদ্বারা বক্ষ বিদীর্ণ করে তাকে বধ করলেন। অসুরসেনা হাহাকার করতে করতে পলায়ন করল এবং দেবতারা স্বর্গের অধিকার ফিরে পেয়ে আনন্দধ্বনি করতে লাগলেন। [সূত্র : উইকিপিডিয়া]
বিশ্বজিত রায়, কলামিস্ট