বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জের ফসলহারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) এর ১৫ টাকা কেজির চাল ও ১৭ টাকা কেজি দরে আটা বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল হওয়া ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ডিলার না থাকায় গ্রামের দরিদ্র লোকজন এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানা গেছে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে গ্রামের অনেকেই জানিয়েছেন প্রতিটি উপজেলায় মাত্র তিনটি পয়েন্টে চাল-আটা বিক্রি করায় উপজেলা সদরের দূরের লোকজন চাল-আটা ক্রয় করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৫ টাকা কেজি দরের চাল কিনতে ভোর ও সকাল থেকেই সরকারি ডিলারের দোকানে ভিড় করেন দরিদ্র লোকজন। একজন ডিলার প্রতিদিন ১ মে. টন (১০০০ কেজি) চাল ও ১ মে. টন আটা (১০০০ কেজি আটা) বিক্রি করেন। প্রত্যেক ব্যক্তি ৫ কেজি করে চাল আটা ক্রয় করায় ২০০ জনের বেশী লোক চাল আটা পান না। যার ফলে চাল আটা নিতে আসা ২০০এর বেশী হলে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। গ্রামের লোকজন আটার চেয়ে চাল বেশী কিনতে চান। প্রতিদিনই ডিলারদের দোকানে চালের সংকট দেখা দেয়। চাল না পেয়ে শত শত দরিদ্র মানুষ প্রতিদিনই খালি হাতে বাড়ি ফিরেন। চাল না পেয়ে গ্রামের লোকজন চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ হচ্ছেন। এছাড়া উপজেলা সদরে এসে
চাল নিতে গিয়ে চালের চেয়ে কয়েকগুন বেশী টাকা যাতায়াত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। তাই অনেকেই সরকারি চাল-আটা কেনার সুযোগ পাচ্ছেন না।
মধ্যনগর থানার বংশিকুন্ডা দক্ষিণ ইউপির বাট্টা গ্রামের কৃষক অখিল বিশ্বাস বলেন,‘ কম দামের সরকারি চাউল আডা বেচা অইতাছে মধ্যনগর বাজারও। বাজার তাইক্কা চাউল-আডা আনতে ট্রলার ভাড়া আওয়া-যাওয়া ৮০ টেকা লাাগে। ভাড়ার টেকা পাইমু কই। ট্রলারে গিয়া লাইনও যাওয়ার আগেই চাউল বেচা শেষ অইয়া যাইব। গেরামের কাছে চাউল না বেচলে আমরা কিনমু কেমনে। ’
একই থানার বংশিকুন্ডা উত্তর ইউপির রুপনগর গ্রামের কৃষক খাজা হারুল বলেন,‘ আমরার সব ধান পানিত তলাই গেছে। সরকারিভাবে কোন সাহায্য অকনও পাইছিনা। সরকারি ৫ কেজি চাউল-আটা কিইন্না আনতে ২০০ টেকা ট্রলার ভাড়া দেওন লাগব। এছাড়া ট্রলার ডুইব্বা মরনের ডরও রইছেই।’
দিরাই উপজেলার তাড়ল গ্রামের কৃষক নাজিম উদ্দিন বলেন,‘ হাওরের সব ধান অকালে তলিয়ে গেছে এখনও সরকার থেকে কোন ধরনের সহায়তা পাওয়া যায়নি। ওএমএসের চাল আটা উপজেলা সদরে বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রামের লোকজন এসব চাল আটা কেনার টাকা ও ভাড়ার টাকা কোথা থেকে পাবে। এছাড়া দূর থেকে যাওয়ার আগেই চাল আটা বিক্রি শেষ হয়ে যাবে। ’
শাল্লা উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবুল চৌধুরী বলেন,‘ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামের কৃষকরা। আর খোলাবাজারের কম মূল্যের চাল আটা বিক্রি করা হচ্ছে উপজেলা সদরের বাজারে। গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও গরিব লোকজন তা কেনার সুযোগ পাচ্ছে না। যারা আগে লাইনে দাড়ানোর সুযোগ পায় তারাই চাল কিনছে। ওয়ার্ড পর্যায়ে চাল বিক্রি শুরু না করলেও গ্রামের লোকজন চাল কেনার সুযোগ পাবে না।’
তাহিরপুর উপজেলার বড়দল গ্রামের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন,‘ক্ষতিগ্রস্ত আমরা গাঁয়ের মানুষ আর চাউল বেচা অয় থানার ধারের বাজারও। আমরা ৭-৮ জন মানুষ দুই দিন আইয়া ঘুইরা গেছি, চাউল নিতাম পারছি না। ধারের মাইনষে সকল থাইক্কা লাইনের আগেই খাড়াইয়া চাউল লইলায়। ধারের মাইনষে লাইন একটা ইট রাইক্কা কও ইকান অমুকের জায়গা। চাউল যদি গাঁ’র ধারে কাছে বিক্রি না করে আমরা পাইতাম না।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বেতগঞ্জ বাজারের ডিলার সোলেমান রশিদ বলেন,‘ চাল আটা বিক্রয় নিয়ে আমরা ঝামেলায় আছি। আটার চাহিদা কম, চালের চাহিদা খুব বেশী। চাল নিতে প্রতিদিন প্রায় হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা ২০০ জনের বেশী দিতে পারিনা। প্রতিদিনই অনেক মানুষ খালি হাতে বাড়ি ফিরে। আমাদের কষ্ট লাগে। চাল বেশী দেয়ার জন্য আমরা দাবি জানিয়েছি।’
ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুর রউফ বলেন,‘ বর্তমানে জেলার সকল এলাকায়ই খোলা বাজারের চাল ও আটার চাহিদা খুব বেশী। অনেকেই চাল পান না বলে খবর পাওয়া যায়। চালের সরবরাহ বৃদ্ধি ও প্রতিটি ইউনিয়নে ৪ জন করে ডিলার নিয়োগের জন্য আমরা গত ৯ ও ১৩ এপ্রিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। একই সাথে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কার্ডের সংখ্যা দ্বিগুন করার জন্য অনুরোধ করেছি।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘ খোলাবাজারে চাল আটা বিক্রি ও ডিলারের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আমি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছি। বেশ কয়েকবার খাদ্য মন্ত্রাণালয়ের সচিব সাহেবকে অনুরোধ করেছি।’
উল্লেখ্য, হাওরের বোরো ফসলহানির ঘটনায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ৯ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জ জেলার ১১ উপজেলার প্রতিটির ৩টি পয়েন্টে খোলাবাজারে প্রতিদিন ১ মে. টন চাল ও ১ মে. টন আটা বিক্রয় করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ এক মাস নিয়মিত চলবে বলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে। তবে জেলার সাধারণ মানুষের দাবি ওএমএসের চাল ও আটা বিক্রির পরিমাণ ও ডিলারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ওয়ার্ড পর্যায়ে ডিলার নিয়োগ করতে হবে।