- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

কবিগুরুর শিক্ষা ভাবনা

এস ডি সুব্রত
শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম পথপ্রদর্শক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু কাব্য সাহিত্যেই নয়, রাজনীতি, সমাজ কল্যাণ, দর্শন এরকম প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন। সাহিত্য ক্ষেত্রে তাঁর অবদান যেমন অনস্বীকার্য ঠিক তেমনি শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি আমাদের পথ নির্দেশ করে গেছেন বিভিন্নভাবে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা—ভাবনার মূল বিষয় ছিল নান্দনিকতা, মানবিকতা ও আনন্দের সঙ্গে শিক্ষালাভ করা। শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। আমাদের শিক্ষায় মানবিকতা, সহনশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, নান্দনিকতা ও আনন্দযোগের অভাব রয়েছে। মননশীলতাকে সমৃদ্ধ করতে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনার ওপর ব্যাপক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন বলে শিক্ষাবিদগণ মনে করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে শিক্ষা হচ্ছে, ‘তাকেই বলি শ্রেষ্ঠ শিক্ষা, যা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, যা বিশ্ব সত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’ তিনি গতানুগতিক শিক্ষাকে তীব্র আক্রমণ করে বলেছেন, এই শিক্ষা জোর করে বাইরে থেকে চালিয়ে দেওয়া কৃত্রিম শিক্ষা, যার সঙ্গে জীবনের এবং শিক্ষার্থীর কোনো যোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারেরও মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার—কলও তখন মুখ বন্ধ করেন, ছাত্ররা দুই—চার পাত কলে ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে। তার পর পরীক্ষার সময় এই বিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপরে মার্কা পড়িয়া যায়।’
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ও ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে বিশ্বসত্তার মিলনই যথার্থ শিক্ষা। শিক্ষার অর্থ শুধু জ্ঞানের সাধনা নয়, জ্ঞানের সাধনার সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতি বা সৌন্দর্যবোধের বা শিল্পবৃত্তির সাধনা এবং কর্মশক্তির বা ইচ্চশক্তির সাধনা। তিনি শিক্ষাকে জীবনমুখী, আনন্দময়, স্বতঃস্ফূর্ত এক প্রক্রিয়া রূপে ব্যাখ্যা করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে শিক্ষার লক্ষ্য শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশসাধন, শিক্ষার্থীর মধ্যে সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটানো, প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিটি শিক্ষার্থীর সম্পর্ক স্থাপন ও শিক্ষার্থীকে চিরন্তন পরমসত্তার উপলব্ধিতে সহয়তা করা। তাঁর মতে পাঠক্রম হবে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। পাঠক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যাতে নিজস্ব রুচি প্রবণতা অনুযায়ী বিকাশের সুযোগ পায় তাই তিনি পাঠক্রমের মধ্যে ভাষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, কৃষি, কারিগরি, সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রণ, ভাস্কর্য, হস্তশিল্প ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন। এগুলোর পাশাপাশি তিনি পাঠ্যক্রমে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করছেন। শিক্ষা সম্পর্কে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় হইতেও আমরা সেই ডিগ্রীর টাকশালের ছাপ লওয়াকেই বিদ্যালাভ বলিয়া গণ্য করিয়াছি। ইহা আমাদের অভ্যাস হইয়া গেছে। আমরা বিদ্যা পাই বা না পাই বিদ্যালয়ের একটা ছাঁচ পাইয়াছি। আমাদের মুশকিল এই যে, আমরা চিরদিন ছাঁচের উপাসক। ছাঁচে—ঢালাই করা রীতিনীতি চাল—চলনকেই নানা আকারে পূজার অর্ঘ্য দিয়া এই ছাঁচ—দেবীর প্রতি অচলা ভক্তি আমাদের মজ্জাগত। সেই জন্য ছাঁচে ঢালা বিদ্যাটাকে আমরা দেবীর বরদান বলিয়া মাথায় করিয়া লই; ইহার চেয়ে বড়ো কিছু আছে এ কথা মনে করাও আমাদের পক্ষে শক্ত।’
ড. আনিসুজ্জামান বলেন, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা—ভাবনা তাঁর সময়ের চেয়ে অগ্রসর ছিল। প্রকৃতির সঙ্গে ব্যক্তির, ভাবনার সঙ্গে কর্মের, জ্ঞানের সঙ্গে মনুষ্যত্ববোধের, স্থানিকতার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার, আহরণের সঙ্গে প্রকাশনের, আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা লাভের যে চিন্তা তিনি করেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশে এসে এক সেমিনারে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক চেন শিনের বলেছিলেন, ভারতবর্ষের তুলনায় চীনে রবীন্দ্রনাথ চর্চা নেহাত মন্দ নয়। আমাদের শিক্ষাপদ্ধতিতে চিন্তাশক্তি বাড়ানোর ও সৃষ্টিশীল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই শিক্ষাপদ্ধতিতে ভালো শিক্ষার্থী নির্ধারণের মাপকাঠি হলো— পরীক্ষার খাতায় কে কতো ভালোভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তার উপর নির্ভর করে ভালোত্ব নির্বাচন। কিন্তু চিন্তা যে নিরন্তর চর্চার বিষয় ও চর্চায় মাধ্যমেই শিক্ষার্থী উন্নততর ও জটিল চিন্তায় ব্যাপৃত হতে পারে, এ বিষয়টি কখনো বিবেচনায় আনা হয় না। অধিকন্তু প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নোট মুখস্থ করার জোর প্রতিযোগিতা। আর এর মাধ্যমে ঘটে পরীক্ষার পাশের সনদ। মুখস্ত করার এই ভয়ংকর প্রবণতাকে রবীন্দ্রনাথ চৌর্যবৃত্তির সাথে তুলনা করেছেন। ‘শিক্ষা’ নামক গ্রন্থের ‘শিক্ষার বাহন’, এবং ‘শিক্ষার সাঙ্গীকরণ’ নামক প্রবন্ধে পরীক্ষা পাসের জন্য শিক্ষার্থীদের মুখস্থ নির্ভরতার প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি তার ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “কেননা মুখস্থ করিয়া পাশ করাই তো চৌর্যবৃত্তি। যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লাইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই বা কম কী করিল? সভ্যতার নিয়ম অনুসারে মানুষের স্মরণশক্তির মহলটা ছাপাখানায় অধিকার করিয়াছে। অতএব, যারা বই মুখস্থ করিয়া পাশ করে তারা অসভ্যরকমে চুরি করে, অথচ সভ্যতার যুগে পুরষ্কার পাইবে তারাই?” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু ঔপনিবেশিক শিক্ষাদর্শনের বিরোধিতাই করেননি, পাশাপাশি এ শিক্ষাদর্শনের বিপরীতে নতুন শিক্ষা পদ্ধতি বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। যা আজও কালের সাক্ষী হয়ে চারদিকে সুবাতাস ছড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ গতানুগতিক, জীবনের সঙ্গে সঙ্গতিহীন, যান্ত্রিক, পুঁথিগত কোনো শিক্ষাদান পদ্ধতির বিরোধী ছিলেন। তিনি পাঠদানের ক্ষেত্রে ভ্রমণ, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, গল্পের ছলে পাঠদান, বিতর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষা, এবং প্রত্যক্ষ কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, শিক্ষক হবেন প্রাণবন্ত মানুষ। তিনি মনে করেন, শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে আত্মীয়তার সম্বন্ধ থাকা চাই। শিক্ষকের কাজ শুধু পুঁথি থেকে শুষ্ক তত্ত্ব ও তথ্য বিতরণ নয়। শিক্ষক সবসময় আনন্দের সঙ্গে অনন্তের ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীর সামগ্র জীবন ভরে তুলবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন শিক্ষার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা। তিনি মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য ভাবধারার সমন্বয় ঘটানারে কথাও বলেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন ।তিনি গতানুগতিক বিষয়ের সাথে হাতের কাজ, কুটির শিল্প, গ্রামোন্নয়ন মূলক কাজ ,অর্থনৈতিক উন্নয়নয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। শিক্ষাকে তিনি কর্মমুখী করে তোলার ওপর আগ্রহী ছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা ভাবনা ছিল আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার এক অনন্য সংযোজন । তার সে সময়ের শিক্ষা ভাবনা আজকের এই সময়ে এসে বড় প্রাসঙ্গিক।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।

  • [১]