ব্রজেন্দ্র কুমার দাস
ভাটির মাটি যেমন উর্বর তেমনি ভাটির মানব জমিনই যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন অনেক ক্ষণজন্মা পুরুষ । যদিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চল তবুও এখানকার মানুষ চিন্তা-চেতনা, মননে-মগজে প্রগতি ভাবনায় দেশ বিদেশ থেকে কখনো তারা বিচ্ছিন্ন নয়। এখানে হাছন রাজা সিংহাসন ছেড়ে জনতার পাশে মিশে জনতার সুরে গান গায়। গান গায় রাধারমণ মাটির গন্ধ কণ্ঠে ধারণ করে। এই ক’দিন আগেও নতুন আঙ্গিকের অন্যরকম এক বাঊল আব্দুল করিম জনতার ঘুম ভাঙ্গাতে ভাসিয়ে ছিলেন তার ময়ূর পঙ্খী নাও। কৃষক বান্ধব করুণাসিন্ধু ; জীবন সায়াহ্নে এসে তাঁরই রক্ত বরুণ রায় আজও কৃষকের-শ্রমিকের-জেলের গায়ের গন্ধ শুকে শুকে আরো ক’টা ডীণ বাঁচতে চেয়েছিলাম। তারই ভাবশিষ একজন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ। চলে গেলেন ১৯ নভেম্বর ২০০৯। শাল্লা উপজেলার আঙ্গারুয়া গ্রামের সেই সকলের একান্ত চেনামুখ শ্রীকান্ত দাশ। অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগবে, কে সেই শ্রীকান্ত দাশ।
শ্রীকান্ত দাশ এ ঘুণেধরা সমাজের হোমরা-চোমরা কেউ নন। নিতান্ত সহজ সরল সাদা মনের মানুষ তিনি। চলনে-বলনে-নিত্যদিন সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত হলেও তিনি যে সব সময় মিত্র পরিবেষ্টিত ছিলেন তা কিন্তু নয়। তাঁর চারপাশের কৃষক ভাইদের যারা শোষণ করতো, নানাভাবে নিপীড়ন নির্যাতন করতো তাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সদা-সর্বদা এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। ভাটি অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনের তিনি ছিলেন পুরোধা, নিবেদিত প্রাণকর্মী। জোতদারগোষ্ঠী তাঁকে কখনো ভালো চোখে দেখেনি। শাল্লা উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মেও তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, আজীবন তিনি ছিলেন আপোষহীন। বিপ্লবী জীবনের অধিকারী শ্রীকান্ত দাশ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বীরমুক্তিযুদ্ধা, গণসংগীত শিল্পী, উদীচীর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ম-লীর সদস্য অসাধারণ নির্লোভ চরিত্র বৈশিষ্টের ঋদ্ধ এক বিরল ব্যক্তিত্ব। আজকের রাজনৈতিক পরিম-লে এমন নির্লোভ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর দেখামেলা খুবই কষ্ট। শ্রীকান্ত দাশ অর্থের পেছনে কখনো ঘুরেননি। প্রয়াত শ্রীকান্ত দাশ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হৃদয়ে লালিত আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুতি হননি। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক চরম সংকটময় মুহূর্তেও প্রয়াত শ্রীকান্ত দাশ তথাকথিত তাঁর সঙ্গী সাথী কমরেডদের মতে ব্যক্তিগত হীন স্বার্থে নীতি-আদর্শ বিসর্জন দেননি। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা না বললেই নয়। এটা তো সত্য যে, কিংবদন্তি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কমরেড বরুণ রায় জীবনের অনেক সময় দিরাই-শাল্লায় রাজনৈতিক বং শেষে এসে বাংলাদেশে আমলের প্রথম দিকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় কমরেড বরুণ রায় সৃষ্টি করেছিলেন দিরাই-শাল্লায় অগণিত অনুসারী। এক সময় তারাও ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। অনেক ত্যাগী পুরুষ আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন সে অঞ্চলে। কমিউনিস্টদের ঝা-া তখন গ্রামে গ্রামে ওড়তো।
তারপর এলো ১৯৭৮ সাল জিয়ার আমল। এলো জাতীয় নির্বাচন। কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নির্বাচনে প্রতিদন্দ্বী হোলেণ কমরেড বরুণ। ভাটির জনপদের কৃষক সমাজের দুঃখ-দুর্দশা-বঞ্চনার কথা সংসদে দাঁড়িয়ে কমরেড বরুণ রায় বলিষ্ঠ কণ্ঠে উত্থাপন করবেন এমন প্রত্যাশা কৃষককূলের ছিল কিন্তু সেটি সেদিন হয়ে ওঠেনি। অবহেলিত কৃষক সমাজ তাদের প্রতিনিদি পাঠাতে পারলো না সংসদে। কিন্তু কেন ? এ কেন এর উত্তর আজো খুঁজতে ইচ্ছে হয়। এর উত্তর কেউ জানেনা, কেউ জানে; জেনেও কেউ উত্তর দিতে রাজি নয়। কিন্তু এর একটি উত্তর হয়তো ছিল এমন সেদিন বরুণ রায়ের অনেক অনুসারীই তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কেন ছেড়ে গেলেন পরবর্তী ইতিহাস বা ঘটনাবলী টা বলে দেয়। বুঝতে চাইলে বুঝা কারো পক্ষেই খুব একটা কঠিন নয়। কিন্তু না। এমন দুর্যোগ মুহূর্তেও কোন ব্যক্তিগত লাভ লোকসানের হিসেব করেননি প্রয়াত শ্রীকান্ত দাশ। লাল ঝা-া হাতে তখনো দুরন্ত সাহসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর আদর্শ কমরেড বরুণ রায়ের পাশে। সেদিনের সেই ভাঙ্গনের মুখে আদর্শ নিয়ে টিকে থাকা কিন্তু সহজ কাজটি নয়। বড়োই কঠিন। সেই কঠিনের আখড়ীয়ে ধরে ছিলেন বিপ্লবে বিশ্বাসী শ্রীকান্ত দাশ। সেদিন বরুণ রায় পাশ করবেন কি করবেন না সে প্রশ্ন প্রয়াত শ্রীকান্ত দাশের ধারে কাছে আসতে পারতো না। নির্বাচনী লড়াই করতে হবে সেটাই বড়ো কথা। কোন লোভ-লালসা-প্রলোভন বা রাজনৈতিক কোন উচ্ছ্বাসা শ্রীকান্ত দাশকে আদর্শ থেকে টলাতে পারেনি। তাইতো তিনি হারিয়েও যাননি অনেকের মতো।
প্রয়াত শ্রীকান্ত দাশ কখনো বিবৃতির রাজনীতিতে বিশ্বাস করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন কাজে। অনীহা ছিলো না কখনো। তিনি কখনো কখনো শহরে থাকতেন কিন্তু তাঁর কর্ম জীবনের বেশীরভাগ সময়ই গ্রামে-গঞ্জে কাটিয়েছেন। গ্রামের কৃষকদের সাথে তাঁর ছিলো নিবিড় সম্পর্ক। যাকে বলা চলে একান্তই আত্মীক সম্পর্ক। তিনি গরীব কৃষকদেরকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই ছিলেন মনে প্রাণে কৃষক বান্ধব। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক ফাটানো আওয়াজে কৃষক দরদি আর বাস্তবে কৃষকের খাসের গন্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা কমরেড শ্রীকান্ত দাশের চরিত্রে কখনো স্থান পায়নি। তাইতো তিনি রণে-মনে-প্রাণে-গানে কৃষকের দুর্ভাগ্য দুর্দশার কথাই আজীবন বলে গিয়েছেন। জীবনের শেষ অধ্যায়েও তিনি ছিলেন এক চির তরুণ। মনের বার্ধক্যে কখনো শ্রীকান্ত দাশ ভোগননি। মানসিক বার্ধক্যে আক্রান্ত হবার মানুষ ছিলেন না প্রয়াত শ্রীকান্ত দাশ।
পার্টির কাজে শ্রীকান্ত দাশ সব সময়ই ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘একতা’ পার্টির কর্মী, সমর্থক এবং জনগণের মধ্যে পৌঁছে দেয়া ছিলো তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আশির দশকে এই সিলেট শহরে দেখেছি শ্রীকান্ত দাশ তা ‘একতা’ পত্রিকার বা-িল নিয়ে শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পায়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে পত্রিকা বিতরণ করতে। সেদিনের শ্রীকান্ত দাশকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসতো। এ ত্যাগ এতো পরিশ্রম স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করাও কঠিন।
আজ তিনি আমাদের কাছে নেই কিন্তু রেখে গিয়েছেন তাঁর দীর্ঘ জীবনের কর্ম। মানুষ কে ভালোবাসার ধর্ম। তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর মরদেহ ওসমানী মেডিকেল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জীবদ্দশায় ক’জন পারে এমন ইচ্ছা প্রকাশ করতে ? কমরেড শ্রীকান্ত দাশরাই এমনটি করতে পারেন। আমাদের গ্রামাঞ্চলে একটা কথা আছে ‘থাকলে কাঁচি হারালে কুড়াল’।
আজ কমরেড শ্রীকান্ত দাশের মৃত্যুর পর তাঁর কর্মজীবন নিয়ে অনেকেই বিশেষ বিশেষ মূল্যায়ন করছেন। প্রশ্ন আসে, তাঁর জীবদ্দশায় কি আমরা সঠিকভাবে তাঁর কর্মের মূল্যায়ন করতে পেরেছি ! কমরেড শ্রীকান্ত দাশকে হারিয়ে আমরা তাঁর স্মৃতি তর্পণ করতে তাঁর কর্মের মূল্যায়ন করছি। বেঁচে থাকতে এমন স্বীকৃতি দিলে তিনি হয়তো আরো শাস্তিতে মরতে পারতেন। ত্যাগী মানুষেরা যেন মৃত্যুর আগেও কর্মের স্বীকৃতি পান। কমরেড শ্রীকান্ত দাশ, তোমাকে লাল সালাম।