- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

করোনাকাল ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

কামরুল জাহাঙ্গীর
করোনা পরিস্থিতি ক্রমাগত আতংক বাড়িয়ে তুলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একদিনে সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার মৃত্যুর রেকর্ড গড়েছে। বিশ্বব্যাপী মৃত্যু সংখ্যা ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৮২ হাজার। পুরো বিশ্ব এখন দিশেহারা। কী করণীয় তাই যেন কেউ বুঝতে পারছে না। দেশে দেশে চিকিৎসা উপকরণের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কিছু দেশে চিকিৎসকরা পেশাগত শপথ ভুলে সেবাদানে বিরত রয়েছেন। পাকিস্তানে অর্ধ শতাধিক চিকিৎসককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। স্বয়ং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বৈশ্বিক এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থাও ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনায় অবস্থাকে এখনই সাংঘাতিক উদ্বেগজনক বলার অবকাশ না থাকলেও মৃত্যুর শতকরা হারটি বিপদজনক বার্তা দিচ্ছে। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা (৭ এপ্রিল পর্যন্ত) ২১৮ ও মৃত্যু ২০। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার ৯.১৭%। বাংলাদেশের এই পরিসংখ্যানের প্রেক্ষিতে বৈশ্বিক পরিস্থিতি কী? ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত লোক সংখ্যা ১৪ লক্ষ ৩২ হাজার ৩২৬ জন। মারা গেছেন ৮২ হাজার ১১৪ জন। বৈশ্বিক পর্যায়ে মৃত্যুহার ৫.৭৩%। বৈশ্বিক মৃত্যু হারের তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুহার প্রায় দ্বিগুন। এবার আসা যাক সুস্থতার পরিসংখ্যানে। বৈশ্বিক পর্যায়ে সংক্রমিতদের মধ্যে সুস্থতা অর্জনের সংখ্যা ৩ লক্ষ ২ হাজার ২৪৭ জন। সুস্থতা অর্জনের শতকরা হার ২১.১০%। বাংলাদেশে সংক্রমিত ২১৮ জনের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩৩ জন। বাংলাদেশে সুস্থতা অর্জনের হার ১৫.১৩%। অর্থাৎ সুস্থতা অর্জনের দিক দিয়েও আমরা পিছিয়ে আছি প্রায় ৬%। উচ্চ মৃত্যুহার ও নিম্ন সুস্থতা অর্জনের হার উদ্বেগজনক। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশে কোবিড ১৯ সংক্রমণ বেড়ে গেলে অবস্থা কী পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে।
করোনা চিহ্নিত ছাড়া প্রতিদিনই বাংলাদেশে জ্বর সর্দি ও শ্বাসকষ্টের লক্ষণ নিয়ে বেশ কিছু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এদের অনেকেই যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। চিকিৎসকরা মানবিক দায়িত্ব পালন করছেন না বলে প্রধানমন্ত্রী ৬ এপ্রিল সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চিকিৎসকদের এমন অমানবিক চেহারা দেখতে হবে বলে কেউ ভাবেনি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কাঠামোর এই কঙ্কাল এতটা স্পষ্ট হত না করোনা না আসলে।
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। আমাদের জনগণ আইন মেনে চলতে অভ্যস্ত নন। আমাদের রয়েছে অনেক কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস। সরকার সকলকে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে না বেরোনোর নির্দেশ দিলেও অনেকেই সেটি মানছেন না। আমাদের জনগণের একটি বড় অংশ আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। এরা প্রতিদিন শ্রম বিনিয়োগ করে যা উপার্জন করেন তা দিয়েই সংসার চালান। এদের হাতে কোনো উদ্বৃত্ত আয় থাকে না। প্রায় ২ সপ্তাহের টানা লকডাউনে এই শ্রেণিটি সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন। এই শ্রমজীবীরা জীবন বাঁচানোর জন্য সুযোগ পেলেই বাইরে বেরিয়ে পড়েন। সরকার ওএমএস, ভিজিডি, রিলিফ প্রভৃতির মাধ্যমে আপাতত অবস্থা সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও দীর্ঘমেয়াদে এই অস্বচ্ছল জনগোষ্ঠীর সংকট বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রী ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এই প্যাকেজে কর্মহীন মানুষরা সরাসরি কী উপকার পাবেন তা স্পষ্ট নয়। বরং শিল্পপতিদের দিকেই হেলে আছে এই প্যাকেজ।
হাওরাঞ্চল সহ দেশে এক সপ্তাহ পর থেকেই শুরু হবে বোরো ধান কাটা। তখন গ্রামাঞ্চলের লকডাউন মূলত মুখ থুবড়ে পড়বে। মাঠের ফসল অরক্ষিত রেখে কোনো কৃষকই ঘরে বসে থাকবেন না। আবার হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত বোরো ধান দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধান ও জিডিপিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে বলে ভালভাবে ফসল গোলায় তোলা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। ফসল কাটার মৌসুৃমটি তাই করোনা সংক্রমণের জন্য অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিদেশে প্রায় ৯৫ লাখ (মতান্তরে ১ কোটি) বাংলাদেশি কাজ করেন। এরা রেমিটেন্সযোদ্ধা। গার্মেন্টস খাতের পর এই রেমিটেন্স যোদ্ধারাই বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিয়ে থাকেন। করোনা পরিস্থিতিতে এই প্রবাসীরাও আক্রান্ত। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তাঁরা। অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেলেও এঁদের অনেকেই চাকুরি হারাবেন। ইতোমধ্যে আমেরিকায় শ’ খানেক বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অন্যান্য দেশ মিলিয়ে এই সংখ্যা দেড় ‘শ ছাড়িয়ে গেছে। বহু বাংলাদেশি করোনা সংক্রমিত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। এঁদের পরিবার এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতে পড়ে গেছে। আশংকা করা হচ্ছে, কয়েক মাসের মধ্যে বহু প্রবাসী স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসবেন। অবশ্য করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর ইতোমধ্যে এক লাখের বেশি প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। দেশে ফেরা এই প্রবাসীরাই বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের প্রাইমারি সোর্স। দেশে ফেরা প্রবাসীদের ক্ষেত্রে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা যায়নি। এদের কোভিড ১৯ টেস্টও করা হয়নি। এই দুর্বলতার কারণে এখন বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের চতুর্থ স্টেজে ঢুকে গেছে। কমিউনিটি স্প্রেড হচ্ছে। সীমিত সংখ্যক টেস্ট থেকেই দেখা যায়, ১৫টি জেলায় করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। পার্শ্ববর্তী সিলেট ও মৌলভীবাজারে পাওয়া গেছে করোনা রোগী। ভয়াবহ তথ্য হলো এখন যারা সংক্রমিত হচ্ছেন তাদের সংক্রমণের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। এটিকেই কমিউনিটি ট্র্যান্সমিশন বলে। টেস্টের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। আরও নতুন নতুন এলাকা এই তালিকায় সংযোজিত হতে থাকবে।
করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে আসবে মহামন্দা। এর আভাস শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশও এই অভিঘাতের বাইরে থাকতে পারবে না। করোনা পরবর্তী বিশ্বের চেহারা হবে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত। অস্থিরতা বাড়বে। অভাব বাড়বে। বৈষম্য তীব্রতর হবে। সমাজের শ্রেণিদ্বন্দ্ব আরও প্রকট হবে। মোড়লিপনা নিয়ে চীন জোটের সাথে মার্কিন জোটের দ্বন্দ্ব বাড়বে। এতে যুদ্ধাশঙ্কাও বাড়বে। সেই পরিবর্তিত বিশ্বে রাজনৈতিক নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেভাবে বহু দেশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেছিল সেই বাস্তবতা আবারও উপস্থিত হতে চলেছে। এরই ইঙ্গিত মেলে মার্কিন কমিউনিস্ট পার্টির আহ্বান থেকে। তারা জনগণকে বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
করোনার মতো এমনকি এর চাইতেও ভয়ানক সংকট মোকাবিলা করেছে মানবসভ্যতা। কোনো সংকটই মানব সমাজের অগ্রযাত্রা রুখতে পারেনি। এখনও বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধে, মতান্ধতায়, অভাবে, বিনা চিকিৎসায় অথবা চিকিৎসা না থাকায় প্রতিদিনই বহু মানুষ মরছে। করোনা মৃত্যুর এই মিছিলের ব্যাপ্তি বাড়িয়েছে মাত্র। মানবিক সৃজনশীলতা ও অদম্যতায় অবশ্যই করোনা পরিস্থিতিও সময়ের ব্যবধানে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তবে কথা শুধু এই, করোনাত্তোর বিশ্বকে হতে হবে আরও মানবিক ও বৈষম্যহীন।
করোনাকে আমরা করব জয়
এই জয়ের পর যেন জেগে উঠে
এমন পৃথিবী
যেখানে মানুষের মৃত্যুর জন্য
মানুষ দায়ী হবে না।

  • [১]