মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
স্বপ্ন দেখি আমার সন্তানেরা বেড়ে উঠুক দশটি জীবন দক্ষতা নিয়ে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সে যেন অর্জন করে জীবন দক্ষতা। কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করে এ+ নিয়ে পাস করুক সেটি আমি চাই না। সকল পিতা মাতা আমার সাথে এ ব্যাপারে একমত হবেন কি না জানি না। আমি চাই আমার সন্তান যেন শেখে আত্মসচেতন হতে। সে যেন তার অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়। আর্ত-মানবতায় সহমর্মি হতে। আমি চাই, সে যা বিশ্বাস করে, দৃঢ়তার সাথে তা প্রকাশের সৎ-সাহস নিয়ে বেড়ে ওঠে। সে যেন অন্যের মতামতকেও মূল্যায়ন করতে শেখে। সে যেন সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে শেখে। সত্যকে ভালবাসে। সত্যের সাথে থাকে। সে যে রবীন্দ্রনাথের নীল নারানের কুলের সেই পংক্তিগুলো ভালবাসে, সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম, যে কভু করেনা বঞ্চনা। আমি চাই সে যেন যুক্তি দিয়ে, সমস্যার গভীরে যেয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। আবেগ থাকবে, কিন্তু তা যেন তাকে বিভ্রান্ত না করে। সে যেন আবেগ সামলিয়ে যৌক্তিক কাংখিত লক্ষে পৌঁছাতে পারে। যে কোন বিষয়ের সৃজনশীল চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে। প্রয়োজনে বৃত্তের বাইরে চিন্তা করার শক্তি বা যোগ্যতা যেন তার হয়। সে যেন জগৎ বিচ্ছিন্ন কেউ না হয়। সবার সাথে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক আর যোগাযোগ যেনো সে রক্ষা করে চলে। মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সে যেন ভালবাসে। সে যেন এটা জানে এই দেশের মাটিতে আমার জন্ম, মাতৃদুগ্ধের মত এর জল, ফুল, ফলে আমার বেড়ে ওঠা। এর প্রতি ঋণ আমার জন্মের। এ ঋণ শোধের চেষ্টা আমাকে করতেই হবে। আমার সন্তানের প্রেস্টিজের থলি যেন শেয়ালে না টানে। সে যেন কায়িক শ্রমে কুন্ঠা বোধ না করে। সে যেন হয় শ্রম ও শ্রমিকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এ ভাবেই চেষ্টা করি সাজাতে আমার প্রতি দিনের পাঠদান। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক দিন ধরে বিদ্যালয় বন্ধ। ২২ বছর ধরে অহর্নিশ যাদের নিয়ে ভাবনা আমার, তাদের সাথে দেখা নাই দীর্ঘদিন। অভ্যাসের ছন্দপতন। মন ভালো নেই। চেয়ে ছিলাম অনলাইনে কিছু কাজ করব। কিন্তু এখনো স্বচ্ছন্দ বোধ করছিনা। জানি না বাচ্চারা কেমন আছে! আশা করছি পরম করুণাময়ের দয়ায় সবাই ভালো আছে। আমার এই লেখাটা যারা পড়বেন তারা উপযুক্ত মনে করলে সন্তানদের সাথে শেয়ার করবেন। এই দীর্ঘ ছুটিতে আমি চাই বাচ্চারা পড়াশোনা করুক তাদের পাঠ্যবই। তাদের সময়কে ভাগ করে নিক। প্রয়োজন মতো রুটিন করে নিক। সময়ের যথাসম্ভব সদ্ব্যবহার করুক। কেননা সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময়ের প্রয়োজনেই আজ আমরা ঘরে। অথচ এমন ঘরে বন্দী থাকাটা কখনোই কাম্য ছিলো না। যে কোনো অবস্থাকেই নিজের অনুকূলে ব্যবহার করা যায় সৃজনশীলতা থাকলে। সংসদ টিভিতে কিছু পাঠ প্রদান এর ব্যবস্থা করা হয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের রুটিন অনুযায়ী সেগুলো ফলো করা উচিত।
এ সময় ছাত্র ছাত্রীগণ পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি একঘেয়েমির দূর করতে পড়তে পারে গল্পের বই, নৈতিক উপদেশ সমৃদ্ধ ধর্মীয় পুস্তক, লিখতে পারে ডায়েরি। করতে পারে নিয়মিত ধর্মীয় অনুশীলন। শরীর চর্চা। যোগ ব্যায়াম । পবিত্র মাহে রমজানে মুসলিম ছাত্র ছাত্রীদের ধর্ম চর্চার খুবই মোক্ষম সময়।
জীবন দক্ষতায় সত্যি সত্যি দক্ষ করে তুলতে প্রয়োজন সত্যি সত্যি জীবনের মুখোমুখি হওয়া। আমার মনে হয় এখন যাচ্ছে আমাদের সেই সময়। বাড়িতে নিজের কাজ গুলো অবশ্যই নিজে করা উচিত। যথাসম্ভব সংসারের কাজে পিতা-মাতাকে সহযোগিতা করা যায় তা করা উচিত। এটা ছেলেদের কাজ এটা মেয়েদের কাজ এমন আলাদাভাবে দেখার কোনো যো নেই। প্রবাদ আছে বিদ্যালয়ে আগে পাঠ শেখানো হয়, তারপর নেয়া হয় পরীক্ষা। আর জীবন আগে পরীক্ষা নেয়, তারপর শিক্ষা দেয়। এই জীবনের শিক্ষা বিদ্যালয়ে সেভাবে সম্ভব হয় না। তাই আজ সময় এসেছে তাদেরকে বাড়িতে এমন জীবনমূখী শিক্ষা দানের। কিছু কাজ বা দায়িত্ব তাদের দিতে হবে যা তারা করতে পারে। কিছু সমস্যা সমাধানের দায়িত্বও তাদের দিতে হবে। যোগ্য করে তুলতে হবে যেন যে কোন চাপে সে ভেঙে না পরে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন বিদ্যালয় যা কিছু শেখানো হয় তার সবটুকু ভুলে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তাই শিক্ষা। তাই বলি কেবল পাঠ্যবইয়ে ডুবে থাকা নয়। চিন্তা করতে হবে আমরা যাদের সাথে আছি তাদের নিয়েও। তারা কেবল আমাদের নিয়ে ভাববে আমাদের কিছুই করার নেই তাদের জন্য। তা যেন না হয়। গ্রামে যারা আছি এসময়ই অবশ্যই উচিত ফসল তোলার কাজে সহযোগিতা করা। অন্তত নিজে করতে না পারলেও পরিবারের অন্যরা যারা এ কাজটা করছে তাদেরকে যথাসম্ভব সাহায্য করা। অন্তত আমার কাজে এ যেন প্রকাশ পায় আমরা তাদের প্রতি সহমর্মী, সহানুভূতিশীল। আমরা অলস নই, কর্মঠ। আমরা উদাসীন নই। তবে যা-ই করি না কেন, করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। সাবধানতার সাথে। স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে। করোনার এই বৈশ্বিক মহামারী থেকে বাঁচতে কী করনীয় আমার মনে হয় এখন আর নতুন করে বলার নেই। সবাইকে পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ সর্দি কাশি হলে গরম জল খেতে হবে। গরম জলের ভাপ নিতে হবে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবুর সরবত বেশি খেতে হবে। আদা, মধু, কালিজিরা এগুলোতেও বেশ উপকার মেলে। সর্দি কাশির স্বাভাবিক ঔষধ খেতে হবে। অনলাইনে অনেক ডাক্তার সাহেবদের নাম্বার দেয়া আছে প্রয়োজনে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। ঘরে থাকতে হবে। নিরাপদে। সর্বোপরি স্রষ্টা কাছে সব সময় প্রার্থনা করতে হবে। নিজের জন্যে। অন্যের জন্য। সবার জন্য। নিশ্চয়ই কেটে যাবে করোনার অন্ধকার। উদিত হবে নতুন সূর্য। আবার আসবে আলোক উজ্জ্বল দিন। আবার হবে দেখা কলকাকলীতে মুখরিত সবুজ শ্যামল প্রান্তরে। প্রিয় বিদ্যালয়ে। সেদিনের প্রতিক্ষায়।
লেখক : সহকারী শিক্ষক, ইংরেজি, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় সুনামগঞ্জ।
২৭.০৪.২০২০