এস ডি সুব্রত
২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়। চীনের উবেহ প্রদেশের উহান শহরে উৎপত্তি হওয়া নভেল করোনা ভাইরাস মহাপ্রাচীর ডিঙিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশও এর কবল থেকে রেহাই পায়নি। ২০২০ সালের মার্চে বাংলাদেশ এ করোনা ভাইরাস সনাক্ত হয়। জীবন যাত্রায় পড়ে বিরাট প্রভাব। ধনী, মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র, কেউ বাদ যায়নি এর থাবা থেকে। সরকার সাধ্যমত চেষ্টা করে এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে। মহামারী নভেল করোনা মোকাবেলায় সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হাতে নেয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার জন্য ব্যবস্থা নেয়। অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রথমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, পরবর্তীতে অফিস আদালত বন্ধ করে দেয়। অবস্থার আরো অবনতি হলে সারা দেশে অঘোষিত লক ডাউন, পরে লকডাউন ঘোষণা করে। এতে জনজীবনে পড়ে বিরুপ প্রভাব। মানুষের আয় রোজগারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ও কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে আসে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে।
ধনীরা প্রণোদনা পায়, দরিদ্ররা পায় সরকারি বেসরকারি সাহায্য। কিন্তু মধ্যবিত্তরা পায় না প্রণোদনা, পায় না ত্রাণ, মুখ ফোটে কিছু বলতে পারে না, দাঁড়াতে পাড়ে না লাইনে। নীরবে চোখের জল ফেলে ঘরের কোণে। লোকলজ্জার ভয়ে জনসম্মুখে যেতে পারে না সাহায্যের আশায়। করোনার ভয়াল থাবায় নাভিশ্বাস উঠে মধ্যবিত্তের।
যাদের নিয়ে কথা বলছি তারা হল মধ্যবিত্ত। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে মধ্যবিত্ত কারা। কাদের বলা হয় মধ্যবিত্ত।সাধারন ভাবে বলা যায় ধনী আর গরীবের মধ্যবর্তী যে শ্রেণী তারাই মধ্যবিত্ত। প্রকৃতপক্ষে মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা নিরুপন করা কঠিন। সাধারণত মধ্যবিত্ত বলতে বুঝায় যারা নির্ধারিত আয়ের মানুষ, মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কাজ করে, যাদের বেতনের বাইরে বাড়তি আয় নেই, উচ্চ বিত্ত বাদ দিলে দারিদ্রসীমার উপরে যারা বাস করে তারা মধ্যবিত্ত।
মধ্যবিত্তের হার কেমন আমাদের দেশে। বিআইডিএস এর পরিচালক অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেনের এক প্রতিবেদনে জানা যায় আমাদের দেশে এখন মধ্যবিত্তের হার মোট জনসংখ্যার বিশ শতাংশ। তার মতে দেশের ষোল কোটি মানুষের বিশ শতাংশ অর্থাৎ চার কোটি মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে। তার মতে— বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন ব্যক্তির ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে দৈনিক দুই থেকে তিন ডলার পর্যন্ত আয় করলে তাকে তাকে মধ্যবিত্তের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিদেশের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ আরেকটু বেশি। ড. নেহাল করিমের মতে —- মধ্যবিত্ত বলতে তাদের বুঝায় যারা নিদেনপক্ষে মৌলিক চাহিদা গুলো পূরণ করতে পারে। তাদের কোন জৌলুস নেই, বেতন যা পায় তা দিয়ে চলে যায়। তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকে না।তাদের জীবন সাদামাটা। হোসেনের জিল্লুর রহমানের মতে —– বেতনের বাইরে যাদের বিকল্প আয়ের সুযোগ নেই, সন্তানের স্কুল খরচ স্বাস্থ্য খরচ বেড়ে গেলে যাদের সমস্যা হয় তারাই মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত তারাই যারা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানী রওনক জাহানের মতে —- যাদের আয় মাঝামাঝি, এবং যারা মাসওয়ারী আয় করে তারাই সমাজে মধ্যবিত্ত। বিত্ত যাদের বেশি বা কম নয় তারাই মধ্যবিত্ত।
তবে আমো লেখায় মধ্যবিত্ত বলতে যাদের বুঝাতে চাচ্ছি তারা অবশ্যই সরকারি চাকুরজীবি ব্যতীত যারা বেসরকারি চাকুরী যেমন স্কুল কলেজ সহ প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করেন, প্রাইভেট চাকুরী করেন, ক্ষুদ্র ব্যাবসা করেন তারা।কারন আমার অভিজ্ঞতা থেকে জানি সরকারি যেকোনো চাকুরী জীবী মাস শেষে যে বেতন পায় তা দিয়ে খুব ভালো না হলেও ডালভাত খেতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
মধ্যবিত্তেরা কোনরকমে টিকে থাকে, বিলাসিতা না থাকলেও ডালভাত খেতে সমস্যা হয়না। কিন্তু মহামারী করোনা সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। মহামারী তে কেউ চাকুরী হারিয়ে, কেউ ব্যবসা বন্ধ হয়ে বিপদে আছে। কেউ চাকুরী না হারালেও আয় কমে যাওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে। মধ্যবিত্তেরা এখন সবচেয়ে কষ্টে আছে। দরিদ্ররা পাচ্ছে সরকারের সাহায্য, ধনীরা পাচ্ছে সরকারি প্রণোদনা। কিন্তু মধ্যবিত্তরা কিছুই পাচ্ছে না। আত্মসম্মানের ভয়ে কাউকে সাহায্যের কথা বলতে পারছেনা। পারছে না হাত পাততে। গরীবের আছে সরকার, ধনীর আছে ধন আর মধ্যবিত্তের আছে নাভীশ্বাস, একবুক হাহাকার। আছে নীরব কান্না। বেসরকারি চাকুরী জীবী, প্রাইভেট ফার্মে চাকরীরতরা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গাড়ী চালকরা দিনের খাবার যোগাড় করতে যেখানে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে বাসা ভাড়া দেওয়া দুরূহ ব্যাপার। কেউবা বাসা ভাড়া দিতে না পেরে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শংকা নিয়ে ফিরছে গ্রামে। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা যারা শহরে টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালায় করোনায় আয় না থাকায় ফিরে যাচ্ছে গ্রামে। তাতেও স্বস্তি নেই। আমরা দেখতে পাচ্ছি বাসা ভাড়া মেটাতে না পারায় বাড়িওয়ালা বই খাতা পত্র সার্টিফিকেট ফেলে দিচ্ছে রাস্তায়। এমন চিত্র খোদ রাজধানীতেই দেখা যাচ্ছে। কেউ বাসা ভাড়া দিতে না পেরে জিনিস পত্র রেখেই রাতের আঁধারে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে গ্রামে। উন্নত দেশে মধ্যবিত্তদের জন্য সরকারি সহযোগিতা থাকলেও আমাদের দেশে এটা নেই, এ নিয়ে তেমন কোন চিন্তাও নেই। তবে এ বিষয়ে চিন্তা করা এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে মধ্যবিত্তের জন্য হটলাইন খোলা যেতে পারে। যাদের দরকার আবেদন করবে। যাচাই বাছাই শেষে যাদের দরকার তাদের সহায়তা দেয়া যেতে পারে। মধ্যবিত্ত রা সব সময় একটা চাপে থাকে। তাদের কে কম সুদে দীর্ঘ মেয়াদি ঋণ দেয়া যেতে পারে। সরকারি চাকরি যারা করে তাদের তেমন কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু যারা ব্যাক্তিগত চাকরি করে তাদের মালিকদের আয় না থাকলে তারা বেতন পায় না প্রায়শই, থাকে চাকুরী হারানোর শংকা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যত। মধ্যবিত্তের জন্য রেশনিং এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
মধ্যবিত্তের ছাপোষা জীবন। মধ্যবিত্তের জীবনে পজেটিভ মানে ভালো। জীবনভর যে মধ্যবিত্ত নেগেটিভ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন, মহামারী করোনা কালে সেই মধ্যবিত্তের নেগেটিভ শব্দটাই বেশী পছন্দের। সবকিছু চলে গেলেও মধ্যবিত্ত শুধু মর্যাদা ও মূল্যবোধ ধরে বেঁচে থাকতে চায়। ঢাকা শহরে বাস করা মধ্যবিত্তের নিজের বাসা থাকে না, গ্রামে বাড়ি থাকে। ঈদ এলে গ্রামে ফিরে যায় নারীর টানে। এ বছর করোনার থাবায় শহুরে মধ্যবিত্ত বাসা ছে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যত সঙ্গে করে।
মহামারী করোনার কালে দেখা যায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বেতনের আশায় অথবা চাকরি বাঁচাতে গ্রাম থেকে চরম ঝুঁকি নিয়ে তার পাচশ মাইল হেঁটে ফিরে কর্মস্থলে। কেউবা বেতন অথবা চাকরি কোনটাই না পেয়ে আবার ফিরে যায় গ্রামে।
উঠতি মধ্যবিত্তের আয়ের পঞ্চাশ শতাংশ চলে যায় বাড়িভাড়ায়। তিন মাসের অধিক স্থায়ী করোনার প্রভাবে বাসা মেটাতে না পেরে মধ্যবিত্ত পাড়ি জমাচ্ছে গ্রামে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করতে বাড়ি ভাড়া কমিয়ে টুলেট টাঙ্গিয়েও ভাড়াটে পাচ্ছে না। এই সমস্ত বাসা বাড়িতেই ছিলেন আটপৌরে মধ্যবিত্তরা। যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা করতেন তারা টিকতে পারেনি। আয় বন্ধ।ভাত কাপড়, বাসা ভাড়ার টাকা নেই, সোজা পথ বাড়ি ফেরা।
চাকুরী চলে যাওয়াদের সাথে যুক্ত হচ্ছে চাকুরী প্রত্যাশীদের চাপ। তাদের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। উঠতি মধ্যব চাল, ডাল, নুন বাসা ভাড়ার টাকা মিলছে না। মাস্ক, স্যানিটাইজার, ঔষধ, করোনা পরীক্ষার টাকা কোথা থেকে আসবে। তদুপরি রয়েছে অনেক রোগীর এ হাসপাতাল ও হাসপাতাল ঘুরে গলদঘর্ম হয়ে মরে যাওয়ার ঘটনা। শিক্ষার্থী না থাকা শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের আবাসস্থলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিক্রির বিজ্ঞাপন এখন চোখে পড়ছে।
মধ্যবিত্তরা চ্যানেলের পর্দায় কিংবা ফেসবুকে করোনার বুলেটিন আর খবর দেখে মনোযোগ দিয়ে কবে যাবে করোনার প্রভাব আর বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা একটো সুন্দর স্বপ্ন কবে এদেশ আবার স্বাভাবিক হবে, কর্ম কোলাহল আবার ফিরে আসবে। চিরচেনা শহরে আবার ফিরে যাবে। নতুন করে আবার বাঁচবে। স্বামীর নির্বাক অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে ঘরের বধু তুলে দিচ্ছে তার অনেক সাধের গহনা দু’মুঠো ভাতের জন্য। সন্তানের পড়াশোনা চালাতে কেউ বিক্রি করছে শেষ সম্বল জমিটুকূ ভবিষ্যত নিশ্চয়তার আশায়। গত ঈদে মধ্যবিত্তের ঘরে আসেনি নতুন কাপড়, সামনের কোরবানির ঈদে হয়তো অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সম্ভব হবে না কোরবানির পশু কেনা। মধ্যবিত্তের মানসিক দৃঢ়তা আর ধৈর্য্য র পরীক্ষা আর কতদিন চলবে কেউ বলতে পারে না।
মানুষের জীবনের কথা ভেবেই লকডাউন, আর লকডাউনের ফাঁদে পিষ্ট হয় মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন যাপন। লক ডাউনের যাঁতাকলে থেমে গেছে মধ্যবিত্তের হাসি, শুধু টিকে থাকার চিন্তা। মধ্যবিত্ত শ্রেণী হচ্ছে উদার গণতন্ত্রের সমর্থক, সমাজের ভারসাম্য রক্ষাকারী। মধ্যবিত্তের এমন বিপর্যস্ত দশায় দেশের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় আসবে চরম আঘাত। এ যেন শুধু ই অনিশ্চয়তা, করোনর থাবায় মধ্যবিত্তের উঠেছে নাভিশ্বাস। বেঁচে থাকার এক প্রাণান্তকর চেষ্টা। এ সংগ্রামে কি জয়ী হতে পারবে মধ্যবিত্ত ? উত্তর জানা নেই, শুধু ই অধীর অপেক্ষা।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক। পরিদর্শক, জেলা সমবায় কার্যালয়, সুনামগঞ্জ।