এস ডি সুব্রত
কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি। ধনী গরীব সকল দেশেই এর প্রভাব লক্ষ্যণীয়। ২০১৯ এর ডিসেম্বর এর মাঝামাঝি চীনে উৎপত্তি হওয়া নোভেল করোনা ভাইরাস আমেরিকা, ইউরোপ আক্রান্ত করে বাংলাদেশে থাবা মেলে ২০২০ সালের মার্চে। ৮ই মার্চ ২০২০ প্রথম বাংলাদেশে করোনা সনাক্ত হয়। এর ফলে সারাদেশ ক্রমান্বয়ে সামাজিক দূরত্ব ও লকডাউনের ফাঁদে বন্ধ হয়ে যায় অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। খেটে খাওয়া মানুষের আয় রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। মধ্যবিত্তের জীবনে নেমে আসে দীর্ঘশ্বাস। স্বল্প বিত্ত, মধ্যবিত্ত আর খেটে খাওয়া মানুষ শহর ছেড়ে পাড়ি জমায় গ্রামে। চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ে অনেক বেসরকারি চাকুরে। পোশাক আর শিল্প কারখানায় শুরু হয় শ্রমিক ছাঁটাই। অর্থনীতি আর জীবিকার কথা চিন্তা করে এক পর্যায়ে লকডাউন তুলে নেয়া হয়। খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ২১হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষনা করে সরকার। তা সত্ত্বেও অর্থনীতিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়নি। ২০২০ সালের শেষদিকে এসে দেখা যায় দেশে উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য , ব্যাংক ও আর্থিক খাত ও মুদ্রাস্ফীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে অর্জন হয় প্রত্যাশার চেয়ে কম। করোনা সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও জীবন ব্যবস্থা তছনছ করে দিয়েছে। যদিও উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কম ক্ষতি হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে জিডিপি লক্ষ্য মাত্রা ৮ শতাংশের বেশি থাকলেও অর্জন হয়েছে ৫.৪ শতাংশ আমাদের দেশে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে খুব খারাপ নয়। করোনা পরিস্থিতিতে চাকরি ও কর্ম হারিয়ে শহর থেকে গ্রামে আসা লোকের সংখ্যা ২০ শতাংশ। বিআইডিএস’র জরিপে দেখা যায়, করোনার প্রভাবে ১ কোটি ৬৪ লাখ লোক নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। স্বল্প আয়ের লোকেরা সঞ্চয় ভেঙে অথবা ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছে। পোশাক কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে বিশ্ব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায়। বাংলাদেশে মোট আমদানি র ২৬ শতাংশ আসে চীন থেকে। করোনায় তা নেমে এসেছে ৮.৫৬ শতাংশে। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। করোনার কারনে তা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৬.৯৩ শতাংশ কমে যায়। দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরোক্ষ কর থেকে। করোনায় রাজস্ব আয় কমেছে। করোনা পরিস্থিতিতে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৫ হাজার কোটি টাকা কম।
প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২১ সালে আবার শুরু হয় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। প্রবাসীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা কোভিড ১৯ এর দ্বিতীয় ঢেউয়ে ধেয়ে আসছে মন্দার করাল গ্রাস। বিশ্বের তাবৎ শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধান দের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এ ভাঁজ মৃত্যু আর অর্থনীতির মন্দা নিয়ে । এ মন্দার প্রভাব বাংলাদেশ সহ মধ্যম আয়ের দেশেও কম নয়। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার নানা মুখী প্রচেষ্টায় মৃত্যু যেমন কমিয়ে রাখতে পেরেছে অন্যদিকে নানামুখী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছে মোটামুটি ভাবে।
এই মুহূর্তে অর্থনীতির চেয়ে মানুষের জীবনের কথাই বেশি ভাবা হচ্ছে।কোন কোন অর্থনীতিবিদের মতে আগামী দুই তিন মাসের মধ্যে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে হয়তো আগামী দুই তিন বছরের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকার ৯৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর সফলতা নির্ভর করছে প্যাকেজের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতি র মোট ক্ষতির উপর। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা খাতগুলো হচ্ছে কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত। কৃষি খাতৈ সাথে যুক্ত উপখাতগুলোতে মূল্যের নি¤œ মুখী প্রভাবে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। শিল্প খাতে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১শ ৩১ কোটি টাকা। সেবা খাতে সব ধরনের যোগাযোগ, পর্যটন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রিয়েল এস্টেট সহ সেবা খাতে প্রতিদিনের আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। কৃষি শিল্প ও সেবা খাতে। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে প্রতিদিন মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তিন হাজার তিনশ একত্রিশ কোটি টাকা।
লকডাউন আরো দীর্ঘস্থায়ী হলে ছোট খাট ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গুড়ে দাঁড়াতে পারবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে উৎপাদন ব্যবস্থা। ভ্যাকসিন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধির মাধ্যমে করোনা রোধ করা সম্ভব না হলে বিদেশে শ্রমিক নেয়া বন্ধ হতে পারে। যার প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে। বিদেশের বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় ফলে পোশাক শিল্প বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে বিরাট প্রভাব।
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ মেয়াদি লকডাউন বজায় রাখা কঠিন। একদিকে জনগণকে সচেতন করতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বাস্থ্য খাতের মাধ্যমে, অন্যদিকে অন্যদিকে দিতে হচ্ছে খাদ্য সহায়তা, করতে হচ্ছে প্রণোদনার ব্যবস্থা। এর ফলে অর্থনীতিতে পড়ছে চাপ। এক্ষেত্রে সরকার কে করোনা মোকাবেলায় সামাজিক দূরত্ব ও লকডাউন ব্যাতীত বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে টিকা। অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার উপায় নিয়ে ভাবতে হবে নতুন করে। স্বাস্থবিধির উপর বেশি গুরুত্বারোপ করে কৃষি শিল্প ও কলকারখানা চালু রাখার উপায় খুঁজতে হবে। সরকারের পাশাপাশি জনগণকে দেশপ্রেমের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে,সচেতন হতে হবে। মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে সরকার ও জনগণকে একসাথে কাজ করতে হবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।