- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

করোনা দমাতে পারেনি তাকে

আসাদ মনি
শহরের একমাত্র নারী ইজি বাইকচালক যাত্রী রাণী দত্ত । জেলা শহরের এমন কেউ নেই তাকে চেনে না। শত প্রতিকূলতার মাঝেও সংগ্রামে অবিচল এই নারী। করোনা পরিস্থিতিতে ৬ সদস্যসের পরিবার নিয়ে লড়াই করছেন টিকে থাকার। ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক ভিত্তি ফিরিয়ে আনতে নিরলস চেষ্টা করছেন।
যাত্রী তাহিরপুর উপজেলার টেকাটুকিয়া গ্রামের দেবেন্দ্র বর্মণ (মৃত) ও শুভা রাণী বর্মণের বড় মেয়ে। বয়স যখন আট বছর তখন তাঁর বাবা মারা যান। সেই থেকে তাঁর সংগ্রাম শুরু হয়। পাথর ভাঙা, অন্যের বাসায় কাজ, মেসে রান্না করা সহ সব কাজই করেছেন যাত্রী। এখন নবীনগরে স্বামী, মা ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকছেন।
করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের সময় প্রায় ২ মাস ইজি বাইক চালাতে পারেন নি তিঁনি। পরিবার চালাতে হিমসিম খেতে হয়েছে। ঋণ কর্জ করে সংসারের হাল ধরেছেন। নিজের রোজগারের জমানো টাকা দিয়ে স্বামীকে একটি ইজি বাইক কিনে দেয়ার পরিকল্পনা ছিলো যাত্রীর। করোনা পরিস্থিতি সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। জমানো ৭৫ হাজার টাকা ষোলঘর এলাকায় ইজি বাইক বিক্রেতা মালিক মিয়ার কাছে রেখেছিলেন। বলেছিলেন ইজিবাইক দেয়ার জন্য। বাকী টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করবেন। কিন্তু ইজি বাইক কেনা আর হয়নি তার।
যাত্রী বলছিলেন, মার্চের প্রথম সপ্তাহে টাকা দিয়েছি ইজি বাইক বিক্রেতা মালেক মিয়ার কাছে। তিনি ১৫ দিনের ভেতর ইজি বাইক দেবেন বলেছিলেন। এরপর আর দেন নি। করোনা পরিস্থিতি শুরু হলে ২ মাস অটো চালাতে পারি নি। তখন মালেক মিয়ার কাছে ইজি বাইক কেনার ৭৫ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা নেই। তাও এক সঙ্গে নয়। ভেঙে ভেঙে দিয়েছেন। সেটা দিয়ে সংসার চালিয়েছি। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তিনি এখনো ইজি বাইক দেন নি। সাত মাস যাবৎ শুধু তারিখ দিচ্ছেন।
এবিষয়ে তিনি আরো বলেন, এখন মালেক মিয়ার কাছে থাকা ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেয়ার জন্য বলেছি। প্রতিদিন একবার করে বলি। তিনি আমাকে টাকাও দিচ্ছেন না, গাড়িও দিচ্ছেন না। এনিয়ে আমি ঝামেলায় রয়েছি।
এ বিষয়ে মালেক মিয়ার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তার মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায় নি।
যাত্রীর স্বামী জামালগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামের হৃদয় দত্ত বাড়ি থেকে অভিমান করে সুনামগঞ্জ পৌর শহরে এসে রিকশা চালাতেন। ৯ বছর আগে হৃদয়কে বিয়ে করেন যাত্রী। কিন্তু তিনি বর্মণ বংশের হওয়ায় শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই হয় নি। এখন শহরতলীর নবীনগরে ২ রুমের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। এই করোনাকালীন সময়েও প্রতিমাসে ৬ হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিতে হয়েছে।
যাত্রী বলেন, আমার ৩ ছেলে মেয়ে। সঙ্গে স্বামী হৃদয় দত্ত ও মা শুভা রাণী বর্মণ থাকেন। লকডাউনের সময় পৌর সভার মেয়র ৫ কেজি চাল দিয়েছেন। আর কোনো সহযোগিতা পাই নি। অনেক সময় না খেয়ে থেকেছি। ৩ বছরের ছোট মেয়ের দুধের টাকা জোগাতে লকডাউনেও ইজিবাইক নিয়ে বের হয়েছি।
এদিকে মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে যাত্রী রাণীর। আবারো ইজি বাইকের স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিয়েছেন তিনি। তবে শহরে ইজি বাইক চালানো নিষেধ থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীকে।
যাত্রী জানান, ‘গেল বছর নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু’ ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। পুরস্কার তুলে দেবার সময় জেলা প্রশাসক মহোদয় ইজি বাইক চালাতে কোনো অসুবিধা হবে না বলে আশ^স্ত করেছিলেন। লকডাউনের আগে ভালোই রোজগার করেছেন তিনি। পুলিশ তাকে বাঁধা দেয় নি। এখন আবার শহরে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। এতে রোজগার কমে গেছে। পরিবার চালাতে কষ্ট করতে হচ্ছে।
যাত্রী রাণী দত্ত ইতিমধ্যে চার চাকা গাড়ি চালানোর নিবন্ধন পেয়েছেন। অন্য সকল পেশার মানুষের মতো অর্থনীতির চাকা পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যেতে লড়াই করছেন। করোনা মহামারি যাত্রী রাণী’র স্বপ্ন ভঙ করেছে। আর্থিকভাবে সমস্যা পড়েছেন, কিন্তু থেমে থাকেন নি। নিরলস প্রচেষ্টা ও শ্রমে তিনি নতুন করে ঘুড়ে দাঁড়াবেন এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এই প্রতিবেদকের কাছে।
জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরী ভট্টাচার্য্য বলেন, সারা বিশ^ যখন করোনায় থমকে গেছে, তখন একজন নারী ¯্রােতের বিপরীতে দাড়িয়ে সংসারের হাল ধরেছেন। কর্মহীন স্বামীর পাশে থেকে সন্তানদের মানুষ করছেন। করোনায় নিজের ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক অবস্থা পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যাত্রী রাণী দত্তের সংগ্রামী জীবন আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার অনুকরণীয়।

  • [১]