- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

করোনা দমাতে পারেনি সিএনজি চালক জয়কে

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ শহরে সিএনজি চালান জয় আহমেদ। শত প্রতিকূলতার মাঝেও করোনা পরিস্থিতিতে ১৪ সদস্যের পরিবার নিয়ে লড়াই করছেন টিকে থাকার। চেয়েছিলেন পড়াশুনা করে বড় মানুষ হওয়ার। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকটের জন্য পঞ্চম শ্রেণির পরেই স্কুল ছেড়ে পরিবারের হাল ধরেন। নিরলস চেষ্টা করছেন করোনায় পরিবারের ভেঙ্গে পড়া অর্থনৈতিক ভিত্তি ফিরিয়ে আনতে।
জয় সুনামগঞ্জের বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের মথুরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তার ৩ ভাই, ৩ বোন রয়েছে। ২ মেয়ে ও ১ ছেলের জনক তিনি। বাবা মা ও নানী (মায়ের মা) সহ মোট ১৪ জন সদস্য পরিবারে। তার ছোট ২ ভাই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ফসলের ন্যায্য দাম না থাকায় সেখানেও সুবিধা করতে পারছে না তারা।
জয় সিএনজি নিয়ে সকাল ৮ টায় সুনামগঞ্জ আব্দুজ জহুর সেতুর উত্তর দিকের সিএনজি স্টেশনে আসেন। সেখান থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যাত্রী সেবা দেন। প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা উপার্জন করেন। গ্যাস খরচ বাদ দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা থাকে। সিএনজিতে যাত্রী নিয়ে মনের অজান্তেই গান ধরেন, ‘পোড়া দেহ পোড়বি কত, পোড়ার বাকি নাই আমার, তুমি হইলে আমার বন্ধু, আমি হইলাম কার’? গানের মধ্যে এরকম প্রশ্ন রেখেই সারাদিনের উর্পাজন নিয়ে রাতে বাসায় ফিরেন এই সিএনজি চালক।
জয়ের দুই বোনের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। তার ছোট এক ভাইকেও বিয়ে করিয়েছেন। ছোট এক বোনকে মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন। তার বড় মেয়ের নাম প্রেমা আক্তার। কাপনা দাখিল মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। মেঝো ছেলের নাম মো. ফাহিম। ১২ বছর বয়স তার। তাকেও মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন। ছোট মেয়ে সাহিমা আক্তারের বয়স ৩ বছর। নিজে পড়াশুনা করতে পারেন নি, তাই সন্তানদের পড়াশুনা করাতে চান। সন্তানরা যেনো বড় হয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারে সেই চাওয়া জয়ের। কিন্তু অভাবেব সংসারে সেটি করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে।
করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের সময় প্রায় ২ মাস সিএনজি চালাতে পারেন নি জয়। এসময় পরিবার চালাতে বিপাকে পড়তে হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ঋণ করে সংসারের হাল ধরেছেন। লকডাউনের পর আবারো সিএনজি নিয়ে বের হয়েছেন। চেষ্টা করছেন করোনাকালীন সময়ের সকল ধারদেনা পরিশোধ করার।
জয় বলেন, ‘ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি। কোনো ক্লাসে সেকেন্ড হইনি। সব সময় প্রথম হয়েছি। একবার ১০ কিলোমিটার হেঁটে সদরে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সে পরীক্ষায় উপজেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি। কিন্তু পড়াশুনা আমার ভাগ্যে ছিলো না। এতো বড় পরিবার। একা বাবার পক্ষে চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। চিন্তায় পড়ে গেলাম। পরে সিলেট চাচার কাছে চলে আসি। এসে গাড়ি চালানো শিখেছি। পরে টানা ১১ বছর সিলেট শহরে সিএনজি চালিয়ে গ্রামে টাকা পাঠিয়েছি।’
সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ কিভাবে আসলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখলাম সুনামগঞ্জে পরিচিত অনেকে সিএনজি চালায়। রাস্তাঘাটও ভালো হয়েছে। তাই পাঁচ বছর আগে সুনামগঞ্জ চলে আসি। এখন বাড়ি থেকেই সিএনজি চালাতে পারি। এতে প্রতিদিন পরিবারের সবার সঙ্গেও দেখা হয়, কথা হয়।’
জয় বলেন, ‘আমার কোনো ভাই বোনকেই বেশি পড়াতে পারি নি। টাকা নেই। তাই ১ বোন ও সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়াচ্ছি। এখন সবকিছুর দাম বেড়েছে। আমার একার ইনকাম দিয়ে পরিবার চলে না। তাই বৃদ্ধ বাবা ছোট ভাইকে নিয়ে সবজির ব্যবসা দেয়ার পরিকল্পনা করছে।’ এই মহামারি করোনা শেষে সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে, পরিবারের সবাইকে নিয়ে আবারো নতুন করে বাঁচবেন বলে আশা করেন সিএনজি চালক জয় আহমেদ।

  • [১]