এস ডি সুব্রত
বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় আতংকের নাম করোনা ভাইরাস । ভাইরাসকে আটকানো বেশ জটিল ।কারণ এটা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে অতিক্রম করা শিখে গেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অণুজীব বিজ্ঞানী, সার্স ভাইরাসের কিট উদ্ভাবক ও করোনাভাইরাস শনাক্তের ‘জি র্যাপিড ডট ব্লট’ কিট উদ্ভাবক ড. বিজন কুমার শীল বলেন এটা মিউটেশন পরিবর্তন করে। তাই যত বেশি এন্টিবডি আসবে, তত বেশি চেঞ্জ করবে। এন্টিবডির প্রতিরোধে বেশিরভাগ ভাইরাস মারা যাবে । তিনি বলেন — এই করোনা প্রতিরোধে মাস্কের বিকল্প নেই। সরকারকে মাস্ক রেশনিংয়ের মাধ্যমে দেয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে টিকা ও মানুষের আচরণ পরিবর্তন জরুরি।
ডাক্তার ও বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে জানা যায় যে ভাইরাসের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা খুবই কঠিন। যখনই সে বাধা পাবে, তখনই সে তার রূপ পরিবর্তন করবে। তাঁরা বলেন , বাংলাদেশে যে মিউটেশন হচ্ছে, একবার হয়েছে আবার যে হবে না বা হচ্ছে যে না, তা বলা যাবে না। বারবার মিউটেশন হচ্ছে । এর থেকে পুরোপুরি মুক্তির উপায় বলা খুব জটিল। করোনা বা ওমিক্রন থেকে মুক্তির নিরংকুশ কোনো উত্তর এই মুহুর্তে নাই। ভাইরাস নিয়ে যে সকল ডাক্তার ও বিজ্ঞানী কাজ করেছেন তাঁদের মতে ভাইরাস জীবন্ত কোষ ছাড়া বাঁচে না। সুতরাং তাকে যদি জীবন্ত কোষের বাইরে রাখা যায়, তাহলে মারা যাবে। তাই তাদের হোমলেস করতে পারলে সফলতা আসবে । ডাঃ বিজন কুমার শীল এর মতে — হোমলেস করার এখন একটাই পথ- করোনা হোক বা না হোক, টিকা দিক বা না দিক, সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। সরকারকে মাস্ক বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাজারে এখন পর্যাপ্ত মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে । এছাড়া রেশনিংয়ের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে মাস্ক দেয়া যেতে পারে । মাস্ক ব্যাতীত কোন জায়গায় কাউকে এলাউ করা যাবে না । আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে ।মাস্ক পরতে আইন করতে হবে। মাস্ক না পরলে শাস্তি দিতে হবে। কোনরকমে শৈথিল্য দেখানো যাবে না । মাস্ক না পরলে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে । এব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে সরকারকে। এবং দেশের প্রতিটি নাগরিককে সচেতন হতে হবে । মাস্ক পরার বিষয়টা আইনত তো বটেই, ব্যক্তিগতভাবে বুঝতে হবে যে, মাস্ক না পরলে আপনি আক্রান্ত হবেন, আপনার পরিবার আক্রান্ত হবে, পরিবারের সদস্যকে হারাবেন। ডাঃ বিজন কুমার শীল বলেন , করোনাভাইরাসের মূল জিনিসটা হচ্ছে তার স্পাইক। মানে ভাইরাসটা যে দু’টি হাত দিয়ে ঢুকে জিনের ভেতরে, ওইখানে তার স্ট্রাকচার চেঞ্জ করে ফেলে। চেঞ্জ করে তার বন্ডিংটা আগের চেয়ে আরও টাইট হচ্ছে। এবং এই ভাইরাসটা এর প্রতিরোধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার মতো শক্তি সঞ্চয় করেছে। এই শক্তি সঞ্চয় করায় তার গতিপথ সরল নয়, বাঁকা হয়ে গেছে। সে প্রতিরোধ পেলেই তা অতিক্রম করতে পারবে। যার জন্য এটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বলা খুব দুষ্কর। টিকার দেয়ার পরও মাস্ক পরতে হবে। যারা একবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছেন, তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা টিকার চেয়ে অনেক বেশি। কেউ যখন করোনা থেকে সেরে উঠেন, তখন তার মধ্যে যে পরিমাণ এন্টিবডি তৈরি হলো, সেই সঙ্গে যে মেমোরি সেল তৈরি হবে, সেটা শ্বাসতন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের পাশে থাকে। টিকা দেন আর না দেন, করোনায় আক্রান্ত হন আর না হন, নাক দিয়ে ভাইরাস ঢুকলে তা বেড়ে উঠবেই। ভাইরাস যখন মুভ করে রক্তে প্রবেশ করবে, তখন সে প্রতিরোধের মুখে পড়বে। করোনা থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের এন্টিবডি দ্রুত গড়ে উঠবে, যারা টিকা দিয়েছেন তাদের এন্টিবডি হতে দেরি লাগবে। এই সময়ে ভাইরাস যখন নাকে বেড়ে উঠবে, তখন হাঁচি দিলে সে করোনা ছড়াবে। এজন্য ভ্যাকসিন দেয়ার পরও মাস্ক পরা উচিত। নিজের নিরাপত্তাসহ অন্যের জনও মাস্ক পরা উচিত।
সাংবাদিক ও লেখক এস এম মুকুল গত কয়েকদিন পূর্বে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন মাস্ক বাধ্যতামূলক করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে । আমি তাঁর সাথে সম্পূর্ণ একমত । কারণ বাংলাদেশে বার বার লকডাউন দেয়া খুবই কঠিন কাজ। করোনায় মধ্যবিত্ত সমাজ ও দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের এমনিতেই করুন অবস্থা । তাছাড়া বেসরকারি ও কোম্পানির চাকুরেদের অবস্থাও নাজুক । এ অবস্থায় লকডাউনের বিকল্প অবশ্যই ভাবতে হবে । এক্ষেত্রে মাস্ক হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঔষধ । এর কোন বিকল্প নেই এখন । মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা ছাড়া এখন বিকল্প নেই । এর পাশাপাশি টিকা অব্শ্যো দিতে হবে ।
করোনার আজকের যে অবস্থা তার জন্য ভাইরাস নয়, মানুষের ব্যবহার দায়ী।
আজকে করোনাভাইরাসের যে ঢেউ বয়ে যাচ্ছে, তার জন্য ভাইরাস নয় মানুষ দায়ী। মানুষের অসচেতনতা দায়ী ।তারা গৃহ ছাড়া বাঁচে না। তাদের গৃহ হচ্ছে মানুষের শরীর। সুতরাং একে যদি শরীরে ঢুকতে না দেয়া হয়, তাহলে সে বেঁচে থাকতে পারবে না। শরীরে ঢুকতে না দেয়ার উপায় হলো মাস্ক পরা ও টিকা দেয়া।
ইনোভেশনস ফর পোভার্টি অ্যাকশনের ওয়েবসাইটে গবেষণার এক ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে যার অংশীদার ছিল স্থানীয় এনজিও গ্রিনভয়েস এবং ইনোভেশনস ফর পোভার্টি অ্যাকশন বাংলাদেশ। গবেষকদলের প্রধান আহমেদ মুশফিক মোবারক বলেন, ‘সঠিকভাবে মাস্ক পরলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সীদের মধ্যে উপসর্গযুক্ত সংক্রমণের হার ৩৪ শতাংশ কমে যায়।’ আরও দেখা গেছে, মুখ ও নাক ঢেকে সার্জিক্যাল ফেস মাস্ক পরা কোভিড-১৯ সংক্রমণ কমানোর একটি কার্যকর উপায়।
ইনোভেশনস ফর পোভার্টি অ্যাকশন বাংলাদেশের সিনিয়র অপারেশন ম্যানেজার কবির বলেন, ‘ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হলে করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, মাস্ক পরার বিকল্প নেই। প্রত্যেককে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। এমনকি টিকা নিলেও । পরিশেষে বলা যায় যে , করোনার সংক্রমন প্রতিরোধে এই মুহুর্তে মাস্ক পরার কোন বিকল্প নেই । প্রত্যেক জায়গায় প্রত্যেককে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে । চেনা বিশ্ব ফিরে পেতে সবাই কে সচেতন হতে হবে , স্বাস্থ্য বিধি মানতে হবে এবং অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে । সরকার এবং জনতা সবাই মিলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে যার যার অবস্থান থেকে ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।