- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সিবিএ নেতারা ডুবিয়েছে টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প

বিশেষ প্রতিনিধি
‘লোকসান তো অইবোই, এক কোয়ারি থেকে একবার পাথর উত্তোলন করে একাধিকবার বিল করা হয়েছে। তেল চুরি, দায়িত্ব পালন না করা, যন্ত্রপাতি চুরি করে বিক্রি করা এসব নানা ধরনের অনিয়ম হয়েছে। আমি ওখানে মাটি কাটার শ্রমিকের কাজ করেছি। আমি মনে করি প্রকল্পের ১২ টা বাজিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।’
‘প্রত্যন্ত এলাকায় প্রকল্পটি হওয়ায় জবাবদিহিতা একেবারেই ছিল না। অডিট কম হতো। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ৫-৬ মাসে একবার পরিদর্শন করতেন। পাথর উত্তোলন করে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির নামে     চালান হলেও পথে গিয়ে চালান বদলে চুনাপাথর বোঝাই কার্গো অন্য স্থানে চলে যেত (বিক্রয় হতো) । ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি আরো বেড়ে যায় ১৯৯৮ সালে লোকসানের বোঝা নিয়ে প্রকল্পটি মুখ থুবরে পড়ে। অর্থাৎ চুনাপাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। পরে চুনাপাথর আমদানী করে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে সরবরাহ করা হলেও এই কার্যক্রমেও দুর্নীতি ছিল।’
সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পটি কীভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল এটি বোঝাতে গিয়ে পর্যায়ক্রমে এ ধরনের মন্তব্য করেন প্রকল্পের এক সময়ের মাস্টার রোলের মাটিকাটা শ্রমিক তাহিরপুরের দুধের আওটা গ্রামের বাদশা মিয়া ও প্রকল্পের এক সময়ের শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধা রৌজ আলী।  
পরিত্যক্ত চুনাপাথর খনি প্রকল্প প্রায় ১৬ কোটি টাকার সম্পদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা’র গাফিলতি ও অবহেলায় লুটপাট এবং খোয়া গেছে বলে সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধারা অভিযোগ করেছেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে সম্প্রতি ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা এই অভিযোগ দায়ের করেন। এদিকে, এই প্রকল্পের ১৯৯ একর জমিও বেহাত হবার পথে।
অনেকেই এই জমি দখল করে পাথর ও কয়লা ডাম্পিং এর কাজে ব্যবহার করে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব খাতে জমি’র ভাড়া’র টাকা জমা হয়েছে বলে কোন তথ্য কারো কাছে নেই।
মুক্তিযোদ্ধা রৌজ আলীসহ স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান শাসনামলে পাক-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটলে ভারত থেকে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির মালামাল আনা বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থায় ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি কাঁচামাল সংকটে পড়ে। ঐ সময় টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের অবকাঠামোসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৯৬৬ সালে প্রকল্পে চুনাপাথর উত্তোলন শুরু হয়। শুরু’র সময় এখানকার চুনাপাথর ছিল মাটির উপরে। ২০-২৫ বছর তোলার পর চুনাপাথর খনির গভীরতা বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধা রৌজ আলী দাবি করেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ভূ-তত্ববিদরা যে জরিপ করেছিলেন সেই জরিপ মোতাবেক এখনো তাহিরপুর সীমান্ত এলাকার টেকেরঘাটে ৩৫ লাখ মে. টন, ভাঙারঘাটে ১৫ লাখ মে.টন, লামাকাটায় ২০ লাখ মে.টন এবং লালঘাট এবং ভাগলি এলাকায় ৮০ লাখ মে.টন চুনাপাথর মওজুদ রয়েছে।
রৌজ আলী’র মতে চুনাপাথর প্রকল্প চালু’র সময় এবং পরবর্তীতে চুনাপাথর আমদানী কার্যক্রমের সময়ও নানাভাবে দুর্নীতি হয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খরচ দেখানো হয়েছে অস্বাভাবিক বেশি। এখানকার চুনাপাথর বা আমদানী করা চুনাপাথরের চালান দেওয়া হয়েছে ছাতকে। পথে চালান বদল হয়ে চুনাপাথর অন্যত্র চলে গেছে। তখনকার কর্মকর্তা ও সিবিএ নেতারা এসব দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এ কারণে এতো বড় একটি প্রকল্প ধ্বংস হয়েছে।
১৯৯১-৯২ এবং ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবু মো. সেলিম।
টেকেরঘাট চুনাপাথর প্রকল্পের এমন অবস্থা প্রসঙ্গে আবু মো. সেলিম বললেন,‘ টেকেরঘাট চুনাপাথর প্রকল্প ও ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আলাদা দুটি প্রতিষ্ঠান। টেকেরঘাট চুনাপাথর প্রকল্পের দুর্নীতির সঙ্গে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের যুক্ত হবার সুযোগ নেই। চুনাপাথর আনা নেবার দায়িত্ব সিমেন্ট ফ্যাক্টরির প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের। এখানে সিবিএ নেতাদের দোষ দেওয়া ঠিক হবে না।’
জানা গেছে, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বিএমআরই কার্যক্রম শুরু করার জন্য কারখানা পরিদর্শন করবেন। একই সময়ে টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প এলাকার পরিত্যক্ত সরকারী সম্পদ ঘুরে দেখবেন তিনি।
ছাতক- দোয়ারাবাজারের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক এ প্রসঙ্গে বলেন,‘অনেকগুলো বিদেশী কোম্পানী ছাতক, দোয়ারাবাজার এবং তাহিরপুর সীমান্তে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই বিষয়ে মাননীয় শিল্পমন্ত্রী’র সঙ্গে আমিও কথা বলেছি। তিনি এসব বিষয় সরেজমিনে দেখতে শীঘ্রই ছাতক এবং তাহিরপুর সীমান্তে আসবেন বলে জানিয়েছেন।’

  • [১]