- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

কষ্টে আছেন রেস্টুরেন্ট শ্রমিকরা

সাইদুর রহমান আসাদ
বঞ্চনা থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা নিয়ে সারাদেশের শ্রমিকেরা প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস তথা মে দিবস পালন করেন। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন এটি। কিন্তু এবার এমন এক সময়ে দিবসটি এলো যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সারাদেশে মতো সুনামগঞ্জে কঠোর লকডাউনের বিধি নিষেধের চাদরে মোড়া। এতে রেস্টুরেন্টের শ্রমিকরা সবচেয়ে কষ্টের মধ্যে পড়েছেন। অনেক শ্রমিক ইতিমধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
জেলা শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, লকডাউনের কারণে হোটেলের মালিকরা অনেক শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে। যে হোটেলে ৪০ জন শ্রমিক ছিলো সেখানে আছে এখন আছে ১০ জন। কারণ মালিকের দোকান বন্ধ। এতো শ্রমিকের বেতন দিতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়ে তারা এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিক পক্ষ।
জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের জগদিশপুর গ্রামের হোটেল শ্রমিক মো. লিটন মিয়া বলেন, এক মাসের উপর হয়েছে কোনো বেতন পাই না। এখন হাত পাতার মানুষও নেই। সবারই এক অবস্থা, হাত খালি।
জানা যায়, একটি রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের কাজ করেন তিনি। হোটেলে কাজ করে সামান্য উপার্জনে ভালই চলছিলো। ২ বছর আগে বিয়ে করেছেন। নতুন বউয়ের হাতের মেহেদীর রং শুকানো আগেই করোনার থাবায় তার পরিবারে অন্ধকার নেমে আসে। করোনার প্রথমদিকে টানা লকডাউনের সময় পরিচিত স্বচ্ছল আত্মীয় স্বজনদের থেকে সহযোগিতায় চালিয়েছে সংসার। অনেক সময় ধারদেনাও করেছেন। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবারও হোটেলে কাজ করে পরিবারের হাল ধরেন। কিছু ঋণ পরিশোধও করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় আবারও লকডাউনে হোটেল রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ায় পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি।
তিনি বললেন, হোটেলে সামান্য বেতনে এমনিতেই পোষায় না। ওয়েটারের কাজ করি। সার্ভিসে খুশি হয়ে মানুষ বকশিস দেয়। এই টাকায় পরিবার কোনো রকম চলে যায়। দ্বিতীয় দফায় লকডাউনের সময় অনেকদিন না খেয়ে ছিলাম। মানুষের কাছে হাত পাততে পারি না লজ্জায়। নিজের একটা ছোট গরু ও ছাগল ছিলো। গরুটার বেচার বয়স হয়নি। তবু ১৬ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করেছি। আর ছাগলটা সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। এই সাড়ে ১৯ হাজার টাকায় পরিবার চালাইতাছি এখন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরো সুনামগঞ্জ জেলা প্রায় ১২শ’ এরকম হোটেল শ্রমিক রয়েছে। এদের মধ্যে কারিগর, বাবুর্চি, ওয়েটার ও ম্যানেজার রয়েছেন। বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রভাবে লকডাউনে সব রকমের হোটেল বন্ধ হওয়ায় বেতনও পাচ্ছেন না তারা। অনেকের লকডাউনের আগে থেকেই বেতন বন্ধ।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের বাসিন্দা মো. মানিক মিয়া ৫ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি শহরের মৌল্লা হোটেলের বাবুর্চি। তার ২ মেয়ের একজন সুনামগঞ্জ শহর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েরর ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। আরেকজন পিটিআই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। এমনিতেই সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হয় তাকে। লকডাউনে হোটেল বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনি।
মানিক মিয়া বললেন, লকডাউনে হোটেল বন্ধের সঙ্গে আমাদেরও বেতন বন্ধ হয়েছে। এতে আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এ পর্যন্ত কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। নিজের পরিবার নিয়ে সমস্যায় পড়েছি।
কারিগর কাজল দাস বললেন, আমি সিলেটের আল-মদিনা হোটেলে কাজ করতাম। হোটেল বন্ধ হওয়ায় পর অনেক শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে মালিক। আমাকেও ছাঁটাই করেছে। কাজ হারিয়ে বাড়িতে আইছি। এখন বেকার। কিছু জমানো টাকা ছিলো সেটা ভেঙে চলতাছি। নিজের কিছু বেইচ্ছা দিমু সেরকম কোনো সম্পদও নাই। এরকম থাকলে ক’দিন পরে না খাইয়া থাকতে হইবো।
বাংলাদেশ হোটেল মিষ্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়নের সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো. লিলু মিয়া বললেন, পুরো জেলায় প্রায় ১২শ’ হোটেল মিষ্টি বেকারির শ্রমিক রয়েছে। লকডাউনে সব বন্ধ। কারো বেতন হচ্ছে না। সামনে ঈদ। সবার বউ-বাচ্চা রয়েছে। তারা কিভাবে ঈদ করবে? সরকারের বিধি নিষেধ আমরা মানছি। কিন্তু আমাদের পরিবারগুলো যে রয়েছে তাদের নিয়ে কী ভাবে চলবো সেটা কেউ ভাবেন না। সরকার কয়েক দফায় লকডাউন দিয়েছে। অনেক সেক্টরের মানুষকে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু আমাদের জন্য কিছুই দেয়নি। আমাদের শ্রমিকরা খেয়ে না খেয়ে জীবন যাপন করছে। এসময় তিনি সরকারের কাছে সুনামগঞ্জের হোটেল মিষ্টি বেকারি শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা সুনামগঞ্জ পৌরসভার ভেতরে প্রায় সাড়ে সাতশ’ বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকদের ত্রাণ সহায়তা দিয়েছি। এরপরেও যারা পাননি তাদেরকেও দেয়া হয়েছে। এই তালিকা করেছেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র। তবু কেউ যদি বাদ পড়েন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা সহায়তা করবো।

  • [১]