ইয়াকুব শাহরিয়ার, দ. সুনামগঞ্জ
বাসস্ট্যান্ড আছে, নেই বাস। নেই লেগুনা, নেই যানজট। বাস কিংবা লেগুনা-সিএনজির হেল্পার কিংবা ড্রাইভারের সিলেট, সুনামগঞ্জ, ছয়হারা-আক্তাপাড়া বলে নেই যাত্রী উঠানোর হাঁকডাকও। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালে মনে হয় পিনপতন নিরবতা। দু’চারজন মাস্ক পড়া মানুষ আর সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছাড়া চোখে আর কিছুই পড়ে না। যানবাহনের অযাচিত হুইসেল এখন আর শোনা যায় না নিয়মিত। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে যাত্রীদের গোল্লাছুট দৌঁড় আর এখন নেই। নেই লোকে গিজগিজ করা পুরোনো দৃশ্য। এমন দৃশ্যে গত একমাসেরও বেশি সময় ধরে অভ্যস্ত দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজার।
অভিন্ন এই দৃশ্য উপজেলার প্রাণকেন্দ্র শান্তিগঞ্জ বাজার, নোয়াখালি বাজার, গনিগঞ্জ বাজার এবং পাথারিয়া বাজারেও। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে গণপরিবহণ বন্ধ রাখায় এমন দৃশ্য বাসস্ট্যান্ডগুলোতে। এতে পুরোপুরিভাবেই বদলে গেছে পরিবহন সেবায় নিয়োজিত ও বাসস্ট্যান্ড নির্ভর শ্রমিকদের জীবন ব্যবস্থা। গাড়ির চাকার সাথে থেমে আছে তাদের জীবনও।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কর্মহীন হয়ে হাতগুঁটিয়ে বাড়িতে বসে আছেন উপজেলার সহ¯্র্রাধিক শ্রমিক। গ্রামের অভ্যন্তরে, পুলিশের তাড়া খেয়ে পেটের দায়ে রাস্তায় বের হয়ে দু’চারজন যাত্রীবহন করার চেষ্টা করছেন কিছু সংখ্যক সিএনজি চালকেরা। অধিকাংশরাই গাড়ি বন্ধ করে সময় পার করছেন এক শব্দহীন আহাজারিতে। নিদারুন কষ্টের অজানা শংকা বুকে চেপে অপেক্ষা করছেন কবে ঘুরবে গাড়ির চাকা। কবে কাটবে পরিবহন শ্রমিকের পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাসের সময়। পরিবার ও ব্যক্তিজীবনে এমন দূরুহ প্রভাব পড়ার পরও করোনা মোকাবিলায় সরকারের গণপরিবহণ বন্ধ রাখাকে স্বাগত জানাচ্ছেন তারা। বলছেন, সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন যেনো তাদের প্রতি একটু খেয়াল রাখেন। কারণ তাদের বেশিরভাগ শ্রমিকেরই একমাত্র উপার্জনের পথ হচ্ছে গাড়ি চালানো।
স্থানীয় একাধিক পরিবহন শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বৈশ্বিক এ মহামারি প্রতিরোধে ঘরে থাকার পক্ষে সকল পরিবহন শ্রমিকেরাই। কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় সেসব শ্রমিকেরা খুব কষ্টে দিনানিপাত করছেন। একমাসেরও বেশি সময় ধরে বাড়িতে থাকায় খাদ্য সংকটে পড়েছেন অনেকে। অনেক শ্রমিকই তার ঘরের অন্য সদস্যদের দিয়ে বা নিজেরাই খোঁজ করছেন সরকারি ত্রাণ সহায়তা কিছু পাওয়া যায় কিনা। তবে সরকারি সহায়তা যাই পাচ্ছে তাও সময়ের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। অনেক শ্রমিক আবার প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহন সেক্টরের বড় বড় নেতাদের নিয়ে।
শ্রমিকেরা জানান, তারা যখন গাড়ি চালান তখন শ্রমিক উন্নয়ন চাঁদাও দিতে হয়। এসব ফান্ড থেকেও তো এখন শ্রমিকদের সহযোগিতা করা যায়। নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক পরিবহন শ্রমিক বলেন, ‘শ্রমিক উন্নয়ন ফি বলে অনেক চাঁদাই দেই। এখন যে আমরা অসহায় অবস্থায় আছি, কোনো নেতাই তো শ্রমিকদের উন্নয়নে এগিয়ে আসছেন না। অথচ আমার অর্জন করা টাকা এমন সংগঠনেও আছে। আমাদের নেতারা যদি আমাদের এই বিপদে এগিয়ে আসতেন তাহলে কিছুটা হলেও আমাদের দুঃখ দূর হত।’
ফখরুল আহমদ নামের একজন লেগুনা চালক বলেন, ‘দীর্ঘ একমাস ধরে আমার লেগুনা বন্ধ। আমার আয়ের অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। সন্তানদের নিয়ে খুবই সমস্যায় আছি। এ অবস্থায় সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা না করেন তাহলে আমাদের বেঁচে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে।’
জালাল উদ্দিন নামের অপর এক ড্রাইভার বলেন, ‘আমরা কীভাবে চলবো তা ভেবে পাচ্ছিনা। নিজেকে বড় অসহায় লাগছে। না পারছি কারো কাছে হাত পাততে না পারছি সহ্য করতে। জানিনা এ অবস্থা আর কতদিন চলবে। যদি দ্রুত এই অবস্থার উন্নতি না হয় তাহলে আমাদের বেঁচে থাকা কষ্টকর হবে।’
সুনামগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল হক বলেন, ‘আমি আমার ইউনিয়ন পশ্চিম পাগলার সকল সিএনজি, লেগুনা, বাস-মিনিবাস, রিকশা, বস্তিবাসী, চন্দ ও পিকআপভ্যান-ট্রাক শ্রমিকদের সরকারি জিআর (চাল) প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে জোরালোভাবে আলোচনা করছি স্থানীয় প্রশাসনের সাথে। আশা করছি আমরা এই প্রকল্পটি অনুমোদন করাতে পারবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে সুনামগঞ্জ পৌর মেয়রের মাধ্যমে ২৫০টি বাস শ্রমিক পরিবারের মাঝে জিআরের বরাদ্দ দিয়েছি। জেলার দুইটি বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের ফান্ড থেকে ১৩টি ইউনিটের শ্রমিকদের কিছু নগদ অর্থ দিয়েছি। আরও পরিকল্পনা চলছে। অর্থ সাহায্য করা যায় কিনা তা নিয়ে আমরা ভাবছি। যদি শ্রমিকই না বাঁচে তাহলে আমাদের এই ফান্ড দিয়ে কী হবে। আমরা ভিবিন্ন মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও আলাদা করে শ্রমিকদের জন্য সহযোগিতা কামনা করবো।’