- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

কষ্ট নিয়ে এসেছে হাওরপাড়ের ঈদ

বিশেষ প্রতিনিধি ও স্বপন কুমার বর্মণ
সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে এবার নিরানন্দের ঈদ। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বিষন্ন হচ্ছে হাওরবাসীর মন। নতুন কাপড়, নতুন জামা কেনা তো দূরের কথা, সামান্য পিঠা, পায়েশ, সেমাই কেনার অর্থের সংস্থানও হয়নি অনেক পরিবারের। হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে কোন কোন মা সন্তানের শান্তনার জন্য সামর্থবানদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরান কাপড় সংগ্রহ করছেন।
করচার হাওর পাড়ের উপজেলা বিশ্বম্ভরপুর। উপজেলা সদরের লাগোয়া গ্রামের নামও বিশ্বম্ভরপুর, এর পাশেই রাধানগর গ্রাম। দুই গ্রামে ১৫০ পরিবারের বাস। ১৫০ পরিবারের বেশিরভাগেই প্রান্তিক কিংবা বর্গা চাষী। মধ্যবিত্ত এবং বড় কৃষকও রয়েছেন কয়েকজন। গ্রামের কৃষকরা বললেন, এবার কেবল এই দুই গ্রাম নয়, পুরো হাওরবাসী’র একই অবস্থা। ধনী কিংবা প্রান্তিক কৃষক নয়, সকলেই এবার ফসল হারিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত। চৈত্র মাসে হাওর ডুবায় এবার সকলের ধানের গোলা একইভাবে শূন্য। একমুঠো ধানও নেই কৃষকের। কেউ গরু বা গৃহপালিত পশু বিক্রি’র টাকায় চাল কিনছেন। কেউবা ভিজিএফ প্রাপ্তির কল্যাণে বা হাওরে মাছ ধরে বিক্রি করে ওএমএস’র চাল কিনে কোনভাবে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন। রমজান মাসে রোজা শেষে ভালো কোন ইফতারের আয়োজন হয়নি হাওরপাড়ের কোন কৃষক পরিবারেই। ঈদের আনন্দও নেই হাওরজুড়ে। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে কৃষক-কৃষাণীর কষ্টও ততই বাড়ছে।
ঈদের কেনা কাটা করেছেন কী-না? প্রশ্ন করতেই বিশ্বম্ভরপুর গ্রামের মনরুজা বেগম ও তাঁর শ্বাশুরি একসঙ্গে চোখের পানি ফেলতে থাকলেন। মনরুজা বললেন,‘চাইর (চার) বাচ্চা, বাচ্চাদের বাবার চোখে সমস্যা, নিজে জালা খেত থাকি জালা লইয়া হাওরে গেছি, রোয়াত (রূপণে) সাহায্য     
 করছি। ১১ কেয়ার জমিন করছিলাম, একগুটা ধানও পাইছি না। ৩ দিন পরে ঈদ, বাইচ্চাইনতের (ছেলে-মেয়েদের) বায়দি (দিকে) চাইলে (থাকালে) কত কষ্ট লাগে বুঝানি যাইতো নায় (বুঝানো যাবে না)।’
মনরুজা’র মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী হনুফা বেগম বললো,‘ইবারতো ধান অইছে না। বাবাও অসুস্থ ঈদের কাপড় কেমনে দিবা?’
একই গ্রামের রেহেনা বেগম জানালেন, ৯ কেয়ার (৩ একর) জমি পানিতে ডুবেছে। ঝড়ে ঘর ভাঙছে, সৌর বিদ্যুতের প্যানেল ভেঙেছে। এখন অন্যের বাড়ি গিয়া কাজও পাওয়া যায় না। ছেলে-মেয়েদের ঈদের কাপড় দিতে পারবেন না, এই কষ্ট সইতে পারছেন না। গ্রামের দুই ধনী পরিবার থেকে গিয়ে কিছু পুরাতন কাপড় নিয়ে এসেছেন। ছেলে- মেয়েদের দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করবেন।’
একই গ্রামের আলী নূর বললেন,‘মধ্যবিত্তরা বড় বিপদে। না পারতেছি কারো বাড়িতে কাজে যেতে, না সহায়তার লাইনে দাঁড়াতে। ৩ ছেলের জন্য এবারের ঈদে কিছুই কিনতে পারেন নি। ঈদ কেবল নয়, বছরটা কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় দিন কাটছে না।’
গ্রামের মাফিয়া বেগম বলেন,‘পহেলা রোজা থেকে এই পর্যন্ত রোজা রেখে ইফতারি করার জন্য পানি ছাড়া কিছুই আনতে পারিনি। রোজা রেখে ভাত খাওয়া ছাড়া অন্য কিছু খেয়ে দেখিনি। ওএমএস’র চালের উপর বেঁচে আছি। যেদিন ওএমএস’র চালের টাকা’র ব্যবস্থা হয় না সেদিন ভাতও পেট ভরে খাওয়া হয় না।’ এই অবস্থা বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওর পাড়ের ২০ টি গ্রামের সকল কৃষক পরিবারেরই বলে জানালেন স্থানীয় সাংবাদিক কাজী সালেহ্ আহমদ।
হাওরপাড়ের বাজারগুলো’র কেনা কাটায়ও ঈদের আমেজ নেই। বিশ্বম্ভরপুর বাজারের নিপামনি গার্মেন্টেসের মালিক মো. সাঈদ মিয়া বলেন,‘আমার ১৮ বছরের ব্যবসা, ঈদের মুহূর্তে এতো কম বেচা-কেনা এর আগে কখনো দেখা হয়নি। আমরা বসে বসেই কাটাচ্ছি। অন্য বছরে এই সময়ে আসলে আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় থাকতো না আমার। এবার সময় কাটছে না।’
একই মন্তব্য করলেন তুষার এন্টারপ্রাইজের মো, আব্দুল কাইয়ুম। বললেন,‘১৭ বছর ধরে ব্যবসা করছি। ঈদের আগে এমন খারাপ অবস্থা আগে দেখিনি।’
খাদ্য পণ্যের ব্যবসায়ী নিলয় এন্টারপ্রাইজের নান্টু বর্মণ বলেন,‘এই সময়ে আমাদের ঘরে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা এতো বেশি থাকতো যে ঘরে ঢুকতে সমস্যা হতো। এবার কর্মচারীদের কাজ নেই।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ বলেন,‘বয়স ৫০ প্রায়, এমন নিরানন্দের ঈদ আগে দেখি নাই। ফসলহারা মানুষের মধ্যে চাপা কান্না বিরাজ করছে। ঈদ মানেই নতুন কাপড় চোপড়ের সমারোহ। কাপড় কেনাতো বাদই, ঈদের দিনের জন্য সামান্য সেমাই কেনার টাকাও অনেকের কাছে নেই।’
হারুনুর রশিদ জানালেন, তারা উপজেলা পরিষদের একটি অ্যাডুকেশন ট্রাস্টের মাধ্যমে কিছু মানুষকে নগদ অর্থ সহায়তা দেবার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি সকলকে ব্যক্তি উদ্যোগে হলেও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন,‘একজন আরেকজনকে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সহায়তা করলেই কিছু মানুষের ঈদ হয়ে যাবে।’

  • [১]