মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি এতদঞ্চলের এক বীর নারী। এই নারী দেশের টানে সংসারের বন্ধন ছিন্ন করেছিলেন। গৃহবধূ থেকে সৈনিকে পরিণত করেছিলেন নিজেকে। নিতান্তই অশিক্ষিক সহজ সরল গ্রামীণ উপজাতীয় এই মেয়েটি সেলা সাবসেক্টরে কতই না সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যেমন ছদ্মবেশ ধারণ করে শত্রুশিবিরের ব্যুহ মধ্যে ঢুকে যেয়ে শত্রুর অবস্থান ও শক্তিমত্তা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে গোয়েন্দা দায়িত্ব পালন করতেন তেমনি সমান দক্ষতায় বিভিন্ন অপারেশনেও অংশ নিতেন। সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হেলালের ভীষণ ভরসা ছিলেন কাঁকন বিবি। পাকবাহিনি তাকে ধরে অমানুষিক নির্যাতন করেছিল। কিন্তু দমে যান নি এই নারী। বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে আবারও ফিরে গেছেন রণাঙ্গনে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই সাহসী নারীর কথা জনসমক্ষে তেমন প্রচারিত হয়নি। সম্ভবত সমাজে অন্তজ অবস্থানের কারণে তিনি নিজের ঢোল ভালভাবে বাজাতে পারেন নি, অন্যরা নাক কুঁচকিয়ে তার ঢোল বাজান নি। কারণ এই বাজারে কার দরকার পড়েছে নিজের বদলে আরেকজনকে নায়ক বানানোর। সুতরাং অন্তরালে অবজ্ঞাতই ছিলেন এই সাহসিকা মুক্তিযোদ্ধা। পরিচয়ের পর্দা সরে ১৯৯৭ সনে। স্থানীয় ২ গণমাধ্যমকর্মীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এই নারী মুক্তিযোদ্ধার অসম সাহসের কথা। দেশময় নাম ছড়িয়ে পড়ে তাঁর। পত্রিকায়, সংবর্ধনায় ডাক পড়ে তাঁর। অবজ্ঞাত থেকে বিখ্যাত হয়ে উঠেন তিনি। সরকারি সহায়তাও প্রাপ্ত হন। বেসরকারি সহায়তাও পেয়েছেন প্রচুর। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা এখন রোগশয্যায় শায়িত। বয়সের ভারে ন্যুব্জ কাকন বিবি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে এখন ভীষণ পীড়িত। তাঁর সুস্থতা অর্জনের বিষয়টি নিঃসংশয় না হলেও পীড়িত এই সাহসিকার সুস্থতা কামনা করি আমরা। কামনা করি তাঁর বাকি জীবন যন্ত্রণাহীনভাবে কাটুক।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। সেখানে একটি নতুন তথ্য পাওয়া গেল। এই তথ্যটি এতদিন কারও জানা ছিল না। কাঁকন বিবির মেয়ে সখিনা বেগম দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, ‘আমার মায়ের সার্টিফিকেটে কাঁকন বিবি বীরপ্রতীক লিখা হয়েছে।’ অর্থাৎ সখিনা বলতে চাইছেন কাঁকন বিবিকে যুদ্ধোত্তরকালে বীরপ্রতীক খেতাবে সম্মানীত করা হয়েছিল। সনদে এই খেতাবের কথা লিখা থাকলেও গেজেটে বীরপ্রতীক হিসাবে কাঁকন বিবির নাম নেই উল্লেখ করে সখিনা দাবি জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগেই যাতে তাঁকে এই পদকে ভূষিত করা হয়। কোন সম্পদ নয়, কোন ক্ষমতা নয় নিতান্তই সম্মানের জন্য আকুতি জানিয়েছেন তিনি। দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ছাতক-দোয়ারাবাজারের সংসদ সদস্যও পদক প্রাপ্তির সরাসরি উল্লেখ না করে তাঁর সম্মান প্রাপ্তির দাবিকে যথাযথ বলেছেন। আমরা জানি না, সত্যিই কাঁকন বিবি বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন কিনা। খেতাবপ্রাপ্তদের গেজেটে তাঁর নাম না থাকা আবার সনদপত্রে নামের শেষে বীরপ্রতীক উল্লেখ করা বিষয়টিকে জটিল করে তোলেছে। দ্রুত এই ভ্রান্তির নিরসন ঘটানো দরকার।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, উপজেলা প্রশাসন ও সংসদ সদস্যকে এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। যদি কাঁকন বিবি সত্যিকারভাবেই বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন তাহলে সেটি যেন দ্রুতই তাঁকে দেয়া হয়। কাঁকন বিবি আর ক’দিন বেঁচে থাকবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। জীবদ্দশায় যদি তিনি জেনে যেতে পারেন এই দেশটি তাঁকে খেতাব দিয়ে সম্মান জানিয়েছে তাহলে শান্তিতে স্বস্তিতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ছাড়তে পারবেন।