- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

কাঠের বিশেষ সেতু দৃষ্টি কাড়ছে মানুষের

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাঁশের চাটাই সরিয়ে বগিয়ারকুড়ি নদীর উপর এবার কাঠ ও সিমেন্টের পিলারে একটি অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এতে হাওরপাড়ের প্রায় ২৫টি গ্রামের মানুষের দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার অন্তত বিশ-পঁচিশ হাজার মানুষ মোটরসাইকেল ও টমটমযোগে বগিয়ারকুড়ি সেতু দিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা সদরে নিয়মিত যাতায়াত করে। এছাড়া কৃষি কাজেও এই সেতুটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কাঠের এই বিশেষ সেতু এলাকার মানুষের দৃষ্টি কাড়ছে।
উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ব্রিজ কালভার্ট নির্মিত হলেও জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের ইনাতনগর-বদরপুর গ্রামের মধ্যস্থলে বগিয়ারকুড়ি মড়া নদীর উপর স্থায়ী সেতু নির্মিত না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম অসন্তোষ কাজ করছে। এ বছর জনগুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় কাঠ ও সিমেন্টের পিলারে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। স্থানীয়রা এতে কিছুটা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে জরুরী যাতায়াতসহ কৃষিক্ষেত্রে এ সেতুটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হওয়ায় এখানে স্থায়ী সেতু নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
‘বর্ষায় নাও হেমন্তে পাও’ এই হচ্ছে হাওর জনপদের অন্যতম অবলম্বন। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা এক যুগেরও বেশি সময়ের শাসনামলে দেশে অনেক উন্নয়ন অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তবে হাওরপাড়ের প্রান্তিক মানুষগুলো এখনও অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিতই থেকে গেছে। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বেশি অবহেলার শিকার হচ্ছে হাওরাঞ্চলের মানুষ।
জানা যায়, ইনাতনগরের বগিয়ারকুড়ি সেতু দিয়ে তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের আছানপুর, হরিপুর, দুর্গাপুর, মদনাকান্দি, হিজলা, নওয়াপাড়া, সুলেমানপুর, রামজীবনপুর, হরিনাকান্দি, পৈন্ডুপ, মামুদপুর, হাওড়িয়া আলীপুর, বদরপুর, ইনাতনগর, বেতাল আলীপুর, শরীফপুরসহ প্রায় ২০-২৫টি গ্রামের অন্তত ২৫ হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত যাতায়াত করে। এরা মূলত কৃষিজীবী। তারা বর্ষাকালের কয়েক মাস নৌকায় যাতায়াত করলেও হেমন্তে তাদের চলাচলের একমাত্র ভরসা এই বগিয়ারকুড়ি সেতু।
উপজেলার বৃহৎ হালি ও শনি হাওরের একাংশের চাষাবাদ, ধান উত্তোলন, হাওর রক্ষা বাঁধ কাজের যাতায়াতসহ স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চলাচলে এ সেতুর বিকল্প নেই। স্থানীয়রা এতদিন ঝুঁকি নিয়েই বাঁশের চাটাইয়ের লক্কড়ঝক্কর সেতু দিয়ে চলাচল করে এসেছে। চলতি মৌসুমে এ স্থানে একটি কাঠের সেতু নির্মিত হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মাঝে স্থায়ী সেতু নির্মাণের আকাক্সক্ষা ঠিকই রয়ে গেছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিমেন্টের পিলারে দ-ায়মান কাঠের সেতু দিয়ে সিএনজি, টমটম, মোটরসাইকেল যাতায়াত করছে। সেতু পার হতে গিয়ে আগের মতো এখন আর যাত্রীসাধারণকে উঠা-নামার কষ্ট করতে হয় না। এর আগে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের চাটাই পার হতে গিয়ে যাত্রী-চালক উভয়কেই ঝুঁকির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হতো। এখন অনেকটা নিশ্চিন্তেই যাত্রীবাহী যানবাহনকে সেতু পার হতে দেখা গেছে।
এই পথে নিয়মিত যাতায়াত করা মোটরসাইকেল চালক আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ‘বাঁশের পুল সরিয়ে এখন কাঠের পুল করায় চলাচলে আগের চেয়ে কিছুটা সুবিধা হয়েছে। এখন নির্ভয়ে যাতায়াত করা যায়। এখানকার মানুষের জন্য যেহেতু এই পুলটা জরুরী তাই স্থায়ী একটা ব্যবস্থা করলে সবার জন্যই ভালো হইত।’
বদরপুর গ্রামের মো. খোকন মিয়া জানিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত ও কৃষিকাজসহ সর্বক্ষেত্রে এই সেতুর ব্যবহার জরুরী। বর্তমানে এখানে কাঠের একটা সেতু তৈরি করা হয়েছে। এতে গাড়ি থেকে উঠানামার ভেজালটা অন্তত দূর হয়েছে। এ জন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। তবে বগিয়ারকুড়ি নদীর উপর স্থায়ী একটা ব্রিজ নির্মাণ করলে হাজার হাজার মানুষের উপকার হবে।
বেহেলী ইউনিয়নের নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান ও সেতুসংলগ্ন ইনাতনগর গ্রামের বাসিন্দা সুব্রত সামন্ত সরকার বললেন, এ ইউনিয়নের পশ্চিম প্রান্তের বেশ একটা অংশ এ সেতু দিয়ে নিয়মিত চলাচল করে। কৃষিকাজেও বগিয়ারকুড়ি সেতুটি ব্যবহার করেন কৃষক। বর্তমানে কাঠের যে সেতুটি তৈরি করা হয়েছে এটা সাময়িক কাজ হবে। তবে বৈশাখ মাসে কৃষকেরা মারাত্বক সমস্যার সম্মুখীন হবে। এখানে স্থায়ী একটি সেতু নির্মাণ জরুরী।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ^জিত দেব বললেন, এখানে একটি স্থায়ী সেতু প্রয়োজন। ২০-২৫ টি গ্রামের মানুষ হেমন্তকালে এই বাঁশের ছাটাই পাড় হয়ে আসা যাওয়া করেন, কষ্ট হয় তাদের। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসও এই সেতু করার ক্ষমতা রাখে না। এলজিইডি’র সঙ্গে কথা বললাম, তারা বললেন এই পথে বর্ষায় নৌ চলাচল করে, এখানে সেতু করা সময় সাপেক্ষ বিষয়, ১০০ ফুটের উপরে সেতু করতে হবে। সেজন্য আমার নিজস্ব চিন্তায়, এখানে হেমন্তকালীন কাঠের সেতুটি করেছি। বাঁশের ছাটাই দিয়ে পাড়াপাড়ের ব্যবস্থা করতে প্রতি বছর দুই-আড়াই লাখ টাকা ব্যয় হয়। আবার এভাবে করলে কমপক্ষে ৫ বছর আরেকটু স্বাচ্ছন্দে ব্যবহার করা যাবে। ব্যয় হবে ৫-৬ লাখ টাকা। আরসিসি পিলারের উপরে কাঠগুলো নাটের মাধ্যমে দেওয়া হবে। পানি আসলে কাঠ খুলে ইউনিয়ন পরিষদের হেফাজতে রাখবে, হেমন্তে আবার সেগুলো বসিয়ে মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

  • [১]