২০২০ সালের মধ্যে শিক্ষার্থীদের ২০ ভাগকে কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। শুক্রবার সকালে ঢাকা মহিলা টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে আয়োজিত চাকরি মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলেন, ২০০৮ সালে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল যেখানে এক দশমিক দুই শতাংশ, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ১১ শতাংশে। শিক্ষামন্ত্রী কারিগরি শিক্ষার চাহিদা প্রসঙ্গে বলেছেন, কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে দক্ষতা অর্জন করতে হলে কাউকে চাকুরির পিছনে দৌঁড়াতে হবে না বরং চাকরিই তার পিছনে দৌঁড়াবে। কারিগরি শিক্ষা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ভবিষ্যত পরিকল্পনা, সংখ্যাগত পরিসংখ্যান এবং মূল্যায়ন খুবই যুক্তিযুক্ত এবং প্রাসঙ্গিক। এ কথা সকলেরই জানা যে, তাত্ত্বিক জ্ঞানের চাইতে ব্যবহারিক জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা প্রায়োগিক জীবনে বেশি প্রয়োজন হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষের ভোগ-বিলাসের চাহিদা বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে উৎপাদন সেক্টরের সম্প্রসারণ হচ্ছে এবং অবধারিতভাবে এই বিশাল উৎপাদন সেক্টর সচল রাখতে একটি বিপুল দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন রয়েছে। পৃথিবীর সকল দেশেই তাই কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমাদর বেশি। মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব দেশ বিদেশ থেকে জনশক্তি আমদানি করে তারা দক্ষ জনশক্তিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়। আমরা যখন জনসংখ্যাকে সম্পদ বিবেচনা করে দেশে এবং বিদেশে এই জনশক্তিকে অর্থনৈতিক উপকরণ হিসাবে ব্যবহারের চিন্তা করছি তখন দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুসারে দেশের ২০ ভাগ শিক্ষার্থী যদি কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে তবে এর সুফল হিসাবে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড অনেক বেশি মজবুত হতে বাধ্য। সুতরাং আমরা শিক্ষামন্ত্রীর এই শুভ অভিপ্রায়কে স্বাগত জানাই।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের উল্টো দিকেরও দর্শন মিলে আমাদের দেশেই। মাত্রই কিছুদিন আগে প্রশিক্ষিত নার্সরা চাকুরির দাবিতে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছিলেন। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যে পরিমাণ ডিপ্লোমা নার্স বেরিয়ে এসেছেন তাদের সকলের কর্মক্ষেত্রের সংস্থান করা সম্ভব হয়ে উঠেনি এখনও। বাস্তবতার এই চিত্রটি প্রমাণ করে কোন কিছুতেই আমাদের কোন পরিকল্পনা নেই। আমরা প্রতিবছর কি পরিমাণ নার্স বের করে আনব সেটি পূর্বে স্থির করা হয়নি। ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা প্রতিষ্ঠান থেকে দেদারসে ডিপ্লোমা নিয়ে নার্সরা বেরিয়ে আসছেন। এজন্য সেক্টরভিত্তিক জাতীয় চাহিদা নিরুপণ করে তার আলোকে একটি উপযুক্ত শিক্ষা নীতি থাকা আবশ্যক ছিল। তাহলে শিক্ষা জীবন শেষ করে কাউকেই নিজের কর্মসংস্থানের জন্য রাজপথে নামতে হত না। শিক্ষামন্ত্রীকে তাই সবার আগে জাতীয় চাহিদার আলোকে কোন সেক্টরে কী পরিমাণ লোক প্রয়োজন তার সংখ্যা নিরুপণের জন্য ব্যাপক সমীক্ষা চালানো উচিৎ। এই সমীক্ষায় অন্তত সামনের ২০ বছরের চাহিদার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা দানের অনুমতি দেয়ার সময়ে এই সমীক্ষার তথ্যকে বিবেচনায় নিতে হবে।
এখন দেশের এখানে-ওখানে নামসর্বস্ব কিছু প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে যারা বিভিন্ন বিষয়ে সার্টিফিকেট বিতরণের ব্যবসা করছে। এদের প্রতিহত করতে হবে। এইসব পরিচয়হীন সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেটের কারণে মেধাবী কর্মীরা চাকুরির বাজারে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠান আজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিষফোড়ার মতো অবস্থান করছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বিষফোড়া অপসারণ না করা হলে যেমন এটি মানব জীবনকে চরম হুমকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে তেমনি এইসব তথাকথিত প্রতিষ্ঠানকে দমন না করতে পারলে এগুলো এক সময় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল কাঠামোটিকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিবে।