‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শুক্রবার সারা দেশে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটিকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জেও সভা-শোভাযাত্রার আয়োজন ছিলো। সুনামগঞ্জের সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়ি চালানোই দুর্ঘটনার মূল কারণ। বছরের একটি দিনে হলেও দেশের সবচাইতে বড় ঘাতক সড়ক নিয়ে আলোচনা করার মধ্যে বিশেষত্ব কিছু না থাকলেও অন্তত এই কথাগুলো বলার একটি উপলক্ষ হয়। দিবসটির তাৎপর্য আপাতত এটুকুই। সড়কের নৈরাজ্য অপ্রতিরোধ্য গতিতেই সারা বছর ধরে চলতে থাকে। মুখে আমরা বা কর্তৃপক্ষ যত ভালো কথাই বলি না কেন এর মধ্য দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা বিন্দুমাত্র কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। গাড়ির নির্ধারিত গতিসীমার বিষয়টি হাইওয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আঞ্চলিক সড়কগুলোর যে হাল-হকিকত তাতে নির্ধারিত গতিসীমায় পৌঁছতে পারা যায় অল্প সময়ই। যানজট, ভাঙা রাস্তা, সড়কের উপর নির্বিচারে বাজার হাট বসা; ইত্যাদি কারণে শম্ভুক গতিতে চলতে বাধ্য হয় যানবাহনগুলো। এই শম্ভুক গতির কারণে দিনে কত কর্মঘণ্টার অপচয় ঘটে এবং এর আর্থিক মূল্যমান কত সেটা কখনও হিসাব করা হয় না। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আসলে অন্তত সড়কে বিরাজিত নানা অনিয়ম ও অবহেলার কথা বলা যায়-শুনা যায়। এইটুকু তৃপ্তির জায়গা থেকে আমরাও দিবসটির জন্য বসে থাকি।
নির্ধারিত গতিসীমা কিংবা অদক্ষ চালকের সাথে অন্য যে প্রধান কারণটি অনুক্ত থেকে গেছে সেটি হলো, পরিবহন ব্যবসায়ীদের সীমাহীন মুনাফামুখী প্রবণতা। দূরপাল্লার প্রতিটি গন্তব্যে পৌঁছার জন্য চালকদের একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হয়। সড়কে যানজট ও অন্যান্য কারণে চালক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। ঘাটতি সময় পোষাণোর জন্য ফাঁকা রাস্তায় গতি বাড়িয়ে দিয়ে এই সময়টুকু উসুল করতে বাধ্য হন চালকরা। এতে দুর্ঘটনা ঘটে। আবার একই চালককে ঘণ্টা দুয়েক পরেই গাড়ি নিয়ে ফিরতি পথ ধরতে হয়। অর্থাৎ একটি দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর পরও চালক পর্যাপ্ত বিশ্রামের কোনো সুযোগ পান না। ফলে ক্লান্ত ও অবসন্ন শরীর নিয়ে গাড়ি চালানোর মধ্যেই তাদের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে। সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ এই ক্লান্ত চালকদের দিয়ে অতিরিক্ত গাড়ি চালানো। আগে আমরা দেখেছি দূরপাল্লার সড়কে দুইজন চালক থাকতেন। কয়েক ঘণ্টা পরপর একজন চালক বিশ্রামে যেতেন। তখন সড়কের মান এখনকার মতো এতোটা উন্নত ছিলো না কিন্তু দুর্ঘটনা ছিলো অনুল্লেখ্য। চালকদের মানুষের পরিবর্তে যন্ত্র ভাবার জায়গা থেকে পরিবহন মালিকরা যতক্ষণ বেরিয়ে না আসবেন ততক্ষণ পর্যন্ত দুর্ঘটনার এই অন্যতম কারণ বর্তমান থাকবে।
সড়কে যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ে গেছে সাম্প্রতিককালে। ব্যক্তিগত যানবাহন, মোটর-সাইকেল, সিএনজি, অটোরিক্সার পরিমাণ এতো বেড়ে গেছে যে, প্রতিটি সড়কে এখন পিঁপড়ার সারির মতো গাড়ির সারি দেখা যায় সবসময়। আমাদের দেশে সেইভাবে পাবলিক পরিবহন বিকশিত হয়নি। বিশেষ করে রাজধানী ছাড়া বড় ও ছোট শহরগুলোতে স্বল্পপাল্লার যাতায়াতের জন্য কোনো কার্যকর পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। এই সুযোগে ব্যক্তিগত ও ছোট যানের চাপ বাড়ে সড়কে। সড়কের উপর যানবাহনের চাপ কমানো না গেলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার স্বপ্ন আমাদের অধরাই থেকে যাবে। যে অদক্ষ চালক কিংবা নির্ধারিত গতিসীমা না মানার কথা বলা হচ্ছে তা দেখ-ভালের জন্য রয়েছে সরকারি বড় বড় সংস্থা। আইনি নিয়ন্ত্রণ থাকলে দুর্ঘটনার এই দানব কখনও সড়কে অস্তিত্ব দেখাতে পারত না। আইন প্রয়োগের শিথিলতার কারণেই এই দানবগুলো সড়ক দাপিয়ে বেড়াতে পারছে।
একটি কার্যকর ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক-ব্যবস্থাপনা দেখাই আমাদের সকলের কাম্য।