বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের পূর্বাঞ্চল, শাল্লা উপজেলা, জগন্নাথপুরের কলকলিয়া ইউনিয়নের ভাটি অঞ্চলের প্রায় ৪ লাখ মানুষের স্বপ্নের সড়ক কালনী-জগদল-কলকলিয়া সড়কের বাস্তবায়ন হচ্ছে না। একারণে কালনী নদীর উপর ৬ বছর আগে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুও মানুষের কাজে লাগছে না। পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি ও দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা পৃথকভাবে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীকে অনুরোধ পত্র দেবার পরও এই সড়কটির প্রকল্প তৈরির কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। এই সড়ক না হওয়ায় দিরাই-শাল্লা এবং জগন্নাথপুরের ভাটি অঞ্চলের অঞ্চলের মানুষ যোগাযোগ বিড়ম্বনায় রয়েছেন। এখনো ওই অঞ্চলের মানুষকে বছরের বেশিরভাগ সময় ট্রলারেই চলতে হয়।
কালনী-কলকলিয়া সড়কের জমি অধিগ্রহণ করে দখল এলজিইডিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে গেল জানুয়ারি মাসেই। কিন্তু প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজ এখনো শেষ করতে পারে এলজিইডি।
এই সড়কের কাজ না হওয়ায় দিরাই শহরের পাশ দিয়ে বহমান কালনী নদীর উপর ৬ বছর আগে প্রায় ২২ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কালনী সেতু এখনো মানুষের কাজে আসে নি। এই সড়ক বাস্তবায়ন না হওয়ায় দিরাই-শাল্লাবাসীর স্বপ্নপূরণ হচ্ছে না। দিরাই-শাল্লার একাংশের মানুষের, জগন্নাথপুরের কলকলিয়া ইউনিয়নের ভাটি অঞ্চলের মানুষের রাজধানী ঢাকায় যেতে ৩ ঘণ্টার পথ ঘুরতে হয়। বিভাগীয় শহর সিলেটে যেতেও দেড়ঘণ্টা সময় বেশি লাগছে। এই সড়ক হলে পূর্ব দিরাইয়ের দেড় লাখ মানুষের উপজেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হতো। দিরাই-শাল্লার প্রায় চার লাখ মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হতো।
দিরাই শহরের পাশ দিয়ে যাওয়া কালনী নদীর উপর প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে কালনী সেতু নির্মিত হয়েছে। ২০১৩ সালে এই সেতুর কাজ শুরু হয়ে ২০১৫ সালে শেষ হয়।
২০১৩ সালে কালনী সেতুর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করে প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেছিলেন,‘পূর্ব দিরাইয়ের জগদল- হোসেনপুর-কলকলিয়া সড়কের কাজ শেষ হলে এই সেতু দিয়েই আঞ্চলিক মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে দিরাই-শাল্লা। সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেছিলেন, ‘এই সেতু এবং সড়ক হলে ভাটির জনপদ দিরাইয়ের উৎপাদিত কৃষিপন্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার নিশ্চয়তা হবে। উত্তরাঞ্চলের যেভাবে মঙ্গা দূর হয়েছে, টিক একইভাবে দিরাইয়ের দরিদ্র কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পন্যের ন্যায্যমূল্য পাবে, মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের কাছে কৃষিপন্য বিক্রি করতে হবে না।’
কিন্তু গত ৮ বছরেও প্রয়াত সাংসদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এবং দিরাই-শাল্লাবাসীর সেই স্বপ্নের সড়কের প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজই শেষ হয় নি।
দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় বললেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য বার বার স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। অনুরোধপত্র দিয়েছেন, কিন্তু কোন কিছুতেই অগ্রগতি হচ্ছে না। ৬ বছর আগে হওয়া কালনীর উপর সেতু কার্যত কোন কাজেই আসছে না।
দিরাই পৌরসভার সাবেক পৌর মেয়র মোশারফ মিয়া বললেন, এখন দিরাই থেকে সিলেট যেতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে, এই সড়ক হলে দিরাই থেকে দেড় ঘন্টায় সিলেট এবং ঢাকা যেতে ৩ ঘণ্টা সময় কম লাগবে। এই বিষয়ে গত ২৮ এপ্রিল মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এলজিইডি মন্ত্রীকে এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে অনুরোধপত্র দিয়েছেন। কিন্তু কাজে ধীরগতি থাকায় মানুষ কষ্টে আছে।
জগন্নাথপুর- দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান গত ২৮ এপ্রিল স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এমপিকে দেওয়া অনুরোধপত্রে লিখেছেন, জগন্নাথপুরের ভাটিতে এবং দিরাই ও শাল্লায় হাওরকেন্দ্রীক পর্যটন, মৎস সম্পদ ও ধান চাল ভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠার বিপূল সুযোগ কেবলমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বিশেষ করে দিরাই- কলকলি সড়ক না হওয়ায় দিরাই উপজেলার করিমপুর ও জগদল ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। দিরাই পৌরসভার কালনী নদীর উপর নির্মিত ২২০ মিটার সেতুর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই সড়কটি জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন।
দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা বললেন, দিরাই-হুসেনপুর-জগদল-কলকলিয়া সড়কের জন্য স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এবং এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীকে আমি কয়েকবার মৌখিকভাবে বলেছি, তারা বললেন ডিও লেটার দিয়ে পাঠান। আমি সেটিও করেছি। এই সড়কটির জমি অধিগ্রহণের কাজ জানুয়ারিতেই শেষ হয়েছে। এখন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে একনেকে পাঠানো হবে। প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, দ্রুতই সেই কাজটি করা হবে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বললেন, এই সড়কে ৭ টি সেতু করা লাগে। আড়াই কিলোমিটার উড়াল সড়কও করা লাগতে পারে। ২০০ কেটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। এলজিইডি’র সদর দপ্তর থেকে একনেকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে প্রকল্প প্রস্তাবনা। একনেকে অনুমোদনের পর সেটি দরপত্র প্রক্রিয়ায় যাবে। জেলা প্রশাসনের জমি অধিগ্রহণ শাখা এই সড়কের জমি অধিগ্রহণ করে ইতিপূর্বে এলজিইডিকে বুঝিয়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি।