১৭ বছর যাবৎ ধর্মপাশা উপজেলা সদর হাসপাতালের এক্সরে মেশিন নষ্ট থাকা সরকারি স্বাস্থ্য পরিসেবার করুণ অবস্থার একটি প্রতীকী চিত্র মাত্র। স্বাস্থ্য পরিসেবার করুণ চিত্র আরও অনেক খারাপ আরও অনেক হতাশাজনক। বলা যেতে পারে নিতান্ত সঙ্গতিবান কেউ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা নিতে যান না। একেবারেই যারা কপর্দকহীন, তারা অন্তত মরার আগে চিকিৎসা করিয়েছেন এমন একটি আত্মপ্রসাদ পাওয়ার জন্য ওখানে যান এবং আরও অসুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। সরকারি হাসপাতাল সম্পর্কে সাধারণের মনোভাব যখন ওইরকম তখন হাসপাতালের একটি সাধারণ এক্সরে মেশিন ১৭ বছর বিকল থাকবে তাতে আর আশ্চর্য কি। খবরটি তো ধর্মপাশা উপজেলার। খোদ জেলা সদরের খবর কি? রেডিওলজিস্ট নেই বলে এক্সরে করা যাচ্ছে না এখানে। একথা সত্য,বিভিন্ন হাসপাতালে বহু যন্ত্রপাতি রয়েছে। ক্রয় কর্মসূচীর বিপুল স্বাদ গ্রহণে পারঙ্গম উচ্চপদস্থ আমলাদের অতিআগ্রহে বিশাল বিশাল মূল্যবান যন্ত্রাদিতে অনেক হাসপাতাল ভরা। কিন্তু ওগুলো কেনার পর আর বাক্স থেকে খোলা হয়নি। খুললে ব্যবহার করতে হবে, ব্যবহার করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ জনবল লাগবে। এরকম জনবল নেই তাই বাক্স খোলার কষ্টকর কাজটিও কারতে হয় না। আর এরকম উপকরণসমৃদ্ধ হাসপাতালগুলোতে গ্যাসট্রিকের বেদনা নিয়ে গেলে সিলেট পাঠিয়ে দেয়া হয় কোন চিকিৎসা না দিয়ে। এই যে সেবাকেন্দ্রে সেবাহীনতা এর বিস্তৃতি উপজেলা থেকে রাজধানী পর্যন্ত। রাজধানীর কোন এক নাম করা হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দ্বারা চিকিৎসা সেবা দেওয়ায় রোগীর মৃত্যুসংবাদ জানা গেছে এই আজ-কাল-পরশুর মধ্যেই। আমরা ঈদের পর চিকিৎসকদের কর্তব্যপালন বিষয়ে রিপোর্ট করার জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে দেখা গেল সদর হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স কনসালটেন্ট খোলার চার দিনেও কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তন করেননি। তিনি যে নেই সে বিষয়েও স্বাস্থ্য প্রশাসনের কোন ভ্রƒক্ষেপ রয়েছে বলে আমাদের মনে হয়নি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এমন বেহাল অবস্থায় যারা পয়সা খরচ করে বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে যান তাদের অভিজ্ঞতা কি খুব সুখকর? মাসখানেক আগেই সিলেটের আলরাইয়ান হাসপাতালে এক নবজাত শিশুকে নিয়ে চিকিৎসা-বাণিজ্যের নির্দয় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। অসুস্থ শিশুটিকে কি চিকিৎসা দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে প্রচুর সন্দিহান রোগীর অভিভাবক, কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির করুণ মৃত্যু ঘটলেও টাকার জন্য তার লাশ আটকে রাখার চরম অমানবিক ঘটনা ঘটেছিল সেদিন ওই হাসপাতালে। তাহলে টাকা দিয়েও চিকিৎসা পাওয়া যাবে না? এই আমাদের কপাল?
দেহ থাকলে দেহের রোগ থাকবে, মানুষ রোগ সারানোর জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। মানবসভ্যতার এই চিরন্তন চাহিদাটিকে যেভাবে আমাদের দেশে মুদি দোকানের পণ্যে পরিণত করা হয়েছে তা পীড়িত করে যেকোন বিবেকবান মানুষকে। শুনেছি ্আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ কিউবায় নাকি শতভাগ নাগরিকের বিনা পয়সায় যাবতীয় চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসা সুযোগসংক্রান্ত বৈশ্বিক সূচকে কিউবার অবস্থান একেবারেই শীর্ষে। কিউবা একটি জনমুখী চিকিৎসাসেবা কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছি। তারা পারলে আমরা পারছি না কেন? ওরকম না হোক অন্তত কিছুটা মানবিক তো হতেই হয় জীবনের কারিগরদের। সেই দিন কবে আসবে আমাদের দেশে?