- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

কৃষকের অভিযোগ উপমন্ত্রীর সামনে

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন বাণিজ্যের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ্যে এনেছেন ফসল হারানো ধর্মপাশার আব্দুল মালেক নামের এক বিক্ষুব্ধ কৃষক। গত বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনার থাল হাওরে ভেঙে যাওয়া ডুবাইল ও সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের নির্মাণাধীন ঘোড়াচক্কর বাঁধ পরিদর্শন শেষে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম দৌলতপুর ফেরীঘাট সংলগ্ন এলাকায় এলে উপমন্ত্রীর পথ আগলে দাঁড়ান আব্দুল মালেক। তিনি স্থানীয়ভাবে পিআইসি সিন্ডিকেট বাণিজ্যের সাথে জড়িতদের নাম প্রকাশ করে উপমন্ত্রীর কাছে তাদের বিচার দাবি করেন। এই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এরপর থেকে হাওরের পাড়ে পাড়ে পিআইসি গঠন ও বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। রোববার বেলা দুই টায় জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ—পরিচালককে আহ্বায়ক করে কিছু হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনা এবং পিআইসি গঠন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দিয়েছেন।
সুনামগঞ্জে ৭২৭ টি পিআইসি এবার ৪২ টি বড় হাওরের ৫৩৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজ করেছে। এই মাসের প্রথম দিকে উজানের বৃষ্টিতে এই বাঁধের ১২৬ টি অংশ দিয়ে পানি ঢুকা শুরু হয়। এরমধ্যে কয়েকটি স্থান ভেঙে যায় এবং দুটি বড় হাওরসহ ১৫ টি হাওরে পানি ঢুকে। ১২৬ অংশের মধ্যে ৩৮ অংশ দিয়ে এখনো পানি চুঁইছে। এই বাঁধগুলো ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য কৃষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন। অসংখ্য কৃষক রাত জেগে বাঁধে অবস্থান করছেন। কৃষকরা বাঁধের কাজে অনিয়মের জন্য স্থানীয় কিছু রাজনীতিবিদদের উপরও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মন্ত্রীর সামনে অভিযোগকারী কৃষক আব্দুল মালেকের বাড়ি ধর্মপাশার রাজাপুর বড়হাটি গ্রামে।
ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, আব্দুল মালেক পানিসম্পদ উপমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন, ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রোকন (স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন’র ছোট ভাই), উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ বিলকিস ও তার বেয়াই সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর কবির, সাধারণ সম্পাদক বদরুল হুদা রাসেলসহ কয়েকজন নেতা ১ লাখ করে টাকা নিয়ে প্রতিটি পিআইসি বিক্রি করেছেন। উপমন্ত্রী ঘোড়াচক্কর বাঁধ থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আব্দুল মালেক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দোষারুপ করে জোর গলায় এসব অনিয়মের কথা বলতে থাকলে সেখানে উপস্থিত থাকা উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এবং পাউবোর উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ ক্যাটাগরির সদস্য গোলাম আযহারুল ইসলাম পিকে রেগে গিয়ে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে ওই কৃষককে ধমকাতে থাকেন। তবুও আব্দুল মালেক দমে যান নি। তিনি তার অভিযোগ বলতেই থাকেন। বিষয়টি দেখে উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক আরিফুর রহমান মজুমদার দিলীপ এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ট শাহজাহান মিয়া আব্দুল মালেকের দিকে তেড়ে গিয়ে শাসাতে থাকেন। আব্দুল মালেক সেখান থেকে সরে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলীর নামেও এমন অভিযোগ করেন। কিছুক্ষণ পর উপমন্ত্রী এলে মালেক এগিয়ে গিয়ে পিআইসি সিন্ডিকেটের সাথে জড়িতদের নাম প্রকাশ করেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত থাকা স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সংরক্ষিত আসনের এমপি শামীমা আক্তার খানম, জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনসহ পাউবোর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে উপমন্ত্রী কৃষক মালেককে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে শান্ত করেন। কিন্তু অভিযুক্তদের অনুসারীরা মালেককে পাগল বলে আখ্যা দেন এবং এটি কারও শেখানো কথা বলছে বলেও মন্তব্য করেন। কৃষক মালেক তাৎক্ষণিক বলেন, ‘তিনি কারও শেখানো কথা বলছেন না।’

৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন


স্থানীয় কৃষকেরা জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ বিলকিস পাউবোর উপজেলা কমিটির সদস্য। তিনি তার মেয়েকে সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর কবিরের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এবং পাউবোর উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির (গণ্যমান্য ব্যক্তি ক্যাটাগরির সদস্য) সদস্য গোলাম আযহারুল ইসলাম পিকে বললেন, কৃষক মালেককে আমি ধমক দেই নি। আমি কেবল বলেছি, কারো নাম না বলতে পারলে কেন চিৎকার করছেন। শুনা কথা বলে লাভ নেই বলে উনাকে থামানোর চেষ্টা করি।
সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর কবিরের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এই বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায় নি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ বিলকিস বললেন, ‘ কৃষক মালেককে কেউ পরিকল্পিতভাবে পাঠিয়েছে। সত্য ডাকার জন্য একটি চক্র পানিসম্পদ উপমন্ত্রীর সামনে মিথ্যা বলিয়েছে। মালেক নামের ওই ব্যক্তিকে কেউ বলে কৃষক, কেউ বলে অর্ধপাগল। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর বা সাধারণ সম্পাদক রাসেলের পিআইসি পাইয়ে দেবার ক্ষমতা নেই। আমিও সুপারিশ করতে পারি, দেবার ক্ষমতা নেই। চন্দ্র সোনার থাল হাওরের ৭৫ ও ৯২ নম্বর পিআইসি’র করা বাঁধ ভেঙেছে এ নিয়ে তদন্ত হতে পারে। যেসব পিআইসি বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের হোক আমি চাই। আমার বিরুদ্ধে যারা পিআইসি বিক্রির অভিযোগ করছে তারা মিথ্যাচার করছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনতাসির হাসান বলেন, কৃষক মালেক প্রথম উপমন্ত্রীর কাছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান নি। পরে ওখানে উপস্থিত কয়েকজন যখন বলেছেন, পিআইসি গঠন ইউএনও সাহেব করেন, তখন এসে আমার কথা বলেছেন কৃষক। আমি স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছি, যেহেতু মন্ত্রীর সামনে অভিযোগ জানিয়েছে, এ বিষয়ে তদন্ত হলে সত্যতা বেরিয়ে আসবে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রোকন বললেন, ওই কৃষক মানসিক ভারসাম্যহীন। তদন্ত হলে ওই কথাগুলো কেন বললো, সত্যতা বেরিয়ে আসবে, আমি মনে করি কেউ তাকে এসব কথা শিখিয়ে দিয়েছে। ওই কৃষক এটিও বলেছে, তিন মাস হয় সে দলে যোগদান করেছে। কৃষক মালেক মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট অভিযোগ করেছেন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি এবং পিআইসি গঠনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেনকে আহ্বায়ক করে রোববার ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন মিয়া, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান ও জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হারিবুর রহমান খান । এই তদন্ত কমিটি তদন্ত সাপেক্ষে রিপোর্ট দেবার এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  • [১]