বোরো ধানের চারা ভাল হয়েছে বলে আত্মতুষ্টির কোন সুযোগ নেই। অনুকূল আবহাওয়া থাকায় কৃষকরা বোরো ধানের চারা ভালভাবে প্রস্তুত করতে পেরেছেন। এই ভাল চারা থেকে ধান গোলায় তুলা পর্যন্ত আরও অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। এই ধাপগুলোর মধ্যে কিছু যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক তেমনি কিছু রয়েছে মনুষ্য-উদ্যোগ। মনুষ্য-উদ্যোগের সর্বাগ্রে এই মুহূর্তে বড় কাজ হলÑ বাঁধ নির্মাণ। ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কয়েকটি উপজেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বাঁধে কাজের আন্ষ্ঠুানিকতা শুরু করলেও মূলত সর্বত্র এখনও পিআইসি গঠন শেষ হয়নি। পিআইসি শেষ করে বাঁধের কাজ যখন শুরু হবে তখন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার শংকা দেখা দিবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষার প্রধান অবলম্বন বাঁধের কাজে যেকোন বিচ্যুতি কৃষকদের মহাসর্বনাশের কারণ হতে পারে। সরকার বছর বছর বাঁধের জন্য প্রচুর অর্থ দেন। বাঁধের কাজ সম্পন্ন করার নীতিমালাও করেছেন কৃষক-বান্ধব। কিন্তু গল্পের ঢেউ গোণা থেকেও উৎকোচ আদায় করে নেয়ার মত দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্যারিসমায় এমন কৃষক-বান্ধব নীতিমালা থেকেও নিজেদের লাভ বের করার পথ তৈরি করে নেয়া গেছে বলে আমরা দেখতে পাই। বাঁধের কাজকে এমন নেতিবাচক প্রবণতা থেকে মুক্ত করতে হবে সর্বাগ্রে।
এখন বোরো আবাদে প্রচুর সার ও সেচের প্রয়োজন পড়ে। সার নিয়ে কেলেংকারির খবর ইতোমধ্যে প্রকাশ হতে শুরু করেছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চাইতে বেশি দামে সার বিক্রির কারণে কয়েকটি উপজেলায় কয়েকজন সার ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সংবাদ এসেছে। সার ডিলারদের এই ধরনের অসাধু প্রবণতা সামনে আরও বাড়বে। তাই কৃষি বিভাগকে আরও সতর্ক ও কার্যকর থাকতে হবে সারের বাজার নিয়ে। সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা উচিৎ। ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দেবার কারণে সেচের ব্যয় নিঃসন্দেহে বেড়ে যাবে। সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেল ক্রয়ে কৃষকদের কোনভাবে প্রণোদনা দেয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। বোরো ধান উৎপাদনের সমস্ত ব্যবস্থাকে কৃষকের জন্য উপযোগী করে তুলতে পারলেই কেবল কাক্সিক্ষত সফলতা পাওয়া যেতে পারে।
বিভিন্ন বৈশি^ক সংস্থার প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, দেশে এখন প্রচুর খাদ্য সংকট রয়েছে। চাল আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়। যেকোন দেশের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা একটি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেবল আমদানি নির্ভর হয়ে যা অর্জন করা যায় না। খাদ্য উৎপাদনে আমরা স্বযংসম্পূর্ণতা অর্জনের যে গল্প প্রচার করি এইসব পরিসংখ্যান তার বিপরীত। সুতরাং বাস্তবের মাটিতে পা রেখে চলতে হবে। স্বপ্নবিলাসে মজে বাস্তবতাকে পাশ কাটানো হলে ভবিষ্যৎ সুখকর হবে না। অন্যসব খাতের উন্নয়ন সত্বেও কেবল খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির জন্য দেশের মানুষকে বিপর্যয়ের সামনে পড়তে হতে পারে। বাংলাদেশে জমির উৎপাদনশীলতা এখনও পৃথিবীর বহু দেশের চাইতে কম। সম পরিমাণ জমিতে বাংলাদেশের চাইতে তিনগুণ বেশি শস্য উৎপাদন করতে পারে জাপানের চাষীরা। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ সহ্য করার ক্ষমতাও আমাদের ধানের কম। কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি করার তাই বহু সুযোগ রয়েছে। আমাদের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থে সৃজনশীল হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। একমাত্র আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরাই পারেন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঠিক পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করতে। তাঁদের সেই ধরণের কর্মপরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।
কৃষি সেক্টরকে উপেক্ষা করে নয়, মুখে মুখে এই সেক্টরের গুরুত্ব প্রকাশ করেও নয়; অন্তরে কৃষক ও কৃষির উন্নতির বিষয়টিকে ধারণ করতে হবে নীতি নির্ধারক এবং মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নকারীদের। তবেই আজ হাওরাঞ্চলে অনুকূল আবহাওয়ায় বোরো ধানের যে পরিপুষ্ট চারা হয়েছে তার সোনালী ছড়া আমাদের খাদ্য-নিরাপত্তার আধার হয়ে উঠতে পারবে।