এনামুল হক এনি
কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে সুনামগঞ্জের কৃষক ও কৃষি জাতীয় অর্থনীতিসহ খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ধানের পাশাপাশি মাছ, বালু, পাথরের জন্যও রয়েছে সুনামগঞ্জের অনেক সুনাম। কিন্তু প্রতি বছর এ জেলায় বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এর উদাসীনতা, অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষি ও কৃষক।
গেল কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে পাউবো’র নিয়োজিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শুরু ও শেষ করতে পারেনা। পরবর্তীতে সময়সীমাও বৃদ্ধি করা হয় কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। শুধুমাত্র বিল উত্তোলনের জন্য নির্ধারিত সময়ের পর নামমাত্র কাজ করে দেখান পিআইসি। কত শতাংশ কাজ হলো তা সরোজমিনে না দেখেই সংশ্লিষ্টরা নিজেদের পকেট ভারী করে বিল ছাড় দেন। পিআইসি ও পাউবো’র কর্মকর্তারা এ সময় আনন্দে আত্মহারা থাকলেও কৃষকের চোখে মুখে থাকে অকাল বন্যার পানিতে বাঁধ ভেঙ্গে বা ডুবে ফসল হারানোর ভয়। কৃষকেরা তখন বাধ্য হয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষা ও মেরামত কাজ শুরু করেন এবং রাত জেগে পাহারা দেন সেই বাঁধ। কৃষকের অবুঝ সন্তানসহ গ্রামের সকল মানুষ যোগ দেয় সে কাজে। তবুও শেষ রক্ষা হয় না কৃষকের। পানিতে বাঁধ ভেঙ্গে চোখের সামনে তলিয়ে যায় স্বপ্নের সোনার ফসল। তখন ধান কাটার শ্রমিকেরা সেই ফসল ‘নয়ন ভাগা’য় (কৃষক শুধু চেয়ে দেখবে কিন্তু কোনো ভাগ পাবেনা) যতটুকু পারেন ততটুকু কেটে নেন। ফসল হারানোর সাথে সাথে একজন কৃষকের সীমাহীন কষ্টের পাশাপাশি সমস্ত স্বপ্ন ও পরিকল্পনার মৃত্যু ঘটে।
এবারো নির্ধারিত সময়ে সুনামগঞ্জের ৪২টি হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি। ফলে গেল বছরের মত এবারো নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে না এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাওরে ফসল ডুবির ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বিদ্যমান। চলতি বোরো মৌসুমে এ জেলায় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ১০ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে এবং এ কাজের জন্য ২৩০টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। গত ১৫ ডিসেম্বর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কোনো পিআইসি নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে পারেনি।
গেল বোরো মৌসুমে অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙ্গে ফসল ডুবে ও শীলাবৃষ্টিতে এ জেলায় কয়েক হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি হয়। তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জেলার ১১টি উপজেলায় ৪২ টি হাওরে ২ লাখ ২০ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমির মধ্যে সদর উপজেলার জাউয়া, দেখা ও কানলার হাওর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দেখা ও জামখলার হাওর, দোয়ারাবাজারের নাইন্দা, দেখা, কানলা হাওর, বিশ্বম্ভরপুরে করচা, শনি, আঙ্গারুলি ও হালীর হাওর, জগন্নাথপুরের নলুয়া ও মইয়ার হাওর, জামালগঞ্জের শনি, মিনি পাগলা ও পাগনার হাওর, তাহিরপুরের শনি, কলমা, নওহাল, ওলান, গলগলিয়া, সন্নাসীর ডোবা, লতিবপুর ও গুনিয়ারকুড়ি হাওর, ধর্মপাশার সাতারিয়া, পাথারিয়া, ডুবাইল, কলমা, ধারাম ও চন্দ্রসোনারথাল হাওর, ছাতকের বলাই, নাইন্দার ও জল্লার হাওর, দিরাইয়ের চাপতি, বরাম ও কালিয়াকোটা হাওর, শাল্লার বরাম, ছায়া ও জোয়ারিয়া হাওরে ৭২ হাজার ২৬২ জন কৃষকের ৩৩ হাজার ২১৯ হেক্টর বোরো জমির ফসল নষ্ট হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করে। এ তথ্যে ক্ষয়-ক্ষতির আর্থিক মূল্য ধরা হয় ৪৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা। এতে মাত্র ১৫% ক্ষয়-ক্ষতির হিসেব ছিল সম্পুর্ণ বাস্তবতা বিবর্জিত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কার্যালয়ে বসে যে মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করেছিল তার সাথে স্থানীয় কৃষকেরা দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। প্রকৃত ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ও ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা সঠিকভাবে প্রণয়ন না করার বিষয়টি ছিল দুঃখজনক। এতে সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে কৃষকদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সঠিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে কিসের ভয় আমরা বুঝিনা।
হাওরাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকদের রক্ষায় আমাদের সকলকে আন্তরিক হতে হবে। পাউবো’র কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঠিকভাবে প্রতিটি প্রকল্পের কাজ সরোজমিনে দেখতে হবে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পিআইসি’কে কোনো কিছুর বিনিময়ে বিল ছাড় দেওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। এ কাজে সরকারের বরাদ্ধকৃত কোটি কোটি টাকার হালাল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
হাওরের ফসল রক্ষায় স্থায়ীভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে স্লুইসগেট নির্মাণ করতে হবে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা মানুষের হএত নেই তবে নিজেদের সৃষ্ট দূর্যোগ মোকাবেলায় আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারি। অন্তত এ বছর ফসল রক্ষা বাঁধ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্টদের সততা, নিষ্ঠা এবং কৃষি ও কৃষকের প্রতি ভালবাসা দেখতে চাই। এতে একদিকে যেমন সুনামগঞ্জের সুনাম রক্ষা পাবে অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
লেখক: সাংবাদিক [email protected]