- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জলাবদ্ধতা

স্টাফ রিপোর্টার
টানা ২ দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এই জলাবদ্ধতার জন্য শহীদ মিনারের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে। পানি সরাতে নেই প্রশাসনের কোনো তৎপরতা। এতে ক্ষোভ জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক সচেতন মানুষ।
জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীমুক্ত হলে মুক্তিযোদ্ধারা এই শহীদ মিনারটি নির্মাণ করেন। এই শহীদ মিনারে ১৬ ডিসেম্বরে প্রথম বিজয় দিবস উদযাপন করেন জেলার সর্বস্তরের মানুষ। পরবর্তীতে সকল আন্দোলন সংগ্রাম ডিএস রোডের পাশে অবস্থিত শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হয় শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে।
শহরের সাস্কৃতিককর্মীরা বলছেন, সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি সারা বছর অযতœ-অবহেলায় পড়ে থাকে। শুধু শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের আগে শুরু হয়ে যায় ধোয়া-মোছা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। আর বছরের বাকি সময় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে দেখা যায় ময়লা-আবর্জনা ও পানি জমে থাকতে।
সাধারণ মানুষ বলেছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা বিকৃত হচ্ছে শহীদ মিনার অযতেœ অবহেলায় থাকার ফলে। এতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা প্রকাশ পাচ্ছে। বৃষ্টি হবে, ময়লা আবর্জনা জমবে। তা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অযতœ অবহেলার কারণেই শহীদ মিনারে একটু বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে নতুন প্রজন্মের ধারণা তৈরি হচ্ছে শহীদদের স্মরণে নির্মিত এই স্থাপনাটি অবহেলায় থাকে, গুরুত্ব কম এটির। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শ্রদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস জানার কৌতহল সৃষ্টি হচ্ছে না তাদের। স্থানীয় প্রশাসন এই দায় এড়াতে পারে না।
সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়ামের নাট্য বিভাগের দলনেতা দেবাশীষ তালকদার শুভ্র বললেন, একবার ১৬ ডিসেম্বর রাতে দেখি শহীদ মিনারে লাইট নেই। অথচ সারা শহর আলোকিত। এটা নিয়ে প্রতিবাদ করেছি আমরা। পরে আলো এসেছে। বলতে গেলে প্রশাসন এটি কোনো সময়ই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখেনা। শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সামাজিক সংগঠন এটি পরিষ্কার করে রাখে।
জেলা উদীচী’র সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বললেন, শহীদ মিনার আমাদের চেতনার সঙ্গে মিশে রয়েছে। বাঙালির অহংকার, আবেগ এই শহীদ মিনারকে ঘিরে। শহীদ মিনারে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হবে সেটা আমরা মানবো না। শহীদ মিনার পবিত্র স্থান। কিন্তু পবিত্রতা রক্ষা হচ্ছেনা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সকল অনিয়ম, অন্যায়ের প্রতিবাদ করি শহীদ মিনারে গিয়ে। বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতার কারণে শহীদ মিনার কেন্দ্রিক প্রোগ্রাম করতে পারছি না। ফলে নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কিছুই অজানা থেকে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে তৈরি হচ্ছে না তারা।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও সাংবাদিক শামস্ শামীম বললেন, বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার আমাদের। এটার প্রতি অবহেলা মানে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবহেলা। শহরের রাস্তাঘাটে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে শুধু আমাদের চেতনার বাতিঘর শহীদ মিনার থাকে অবহেলায়। একটু বৃষ্টি হলে পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
জেলা সিপিবি’র সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, শহীদ মিনারকেও মানুষের কাছে অশ্রদ্ধার পাত্র করে গড়ে তোলার আরেকটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে। তরুণ প্রজন্ম দেখছে শহীদ মিনার হলো ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরে দামি ফুলের তোড়া দেয়া।
জেলা মুক্তিযুদ্ধ সংসদের সাবেক কমান্ডার নুরুল মোমেন বললেন, নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে না। জানার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না তাদের। কারণ তারা দেখছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ অযতœ অবহেলায় পড়ে আছে। তিনি আরও বলেন, আমরা ৩ বছর আগে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছি। এখন প্রশাসন শহীদ মিনারের দেখভাল করার কথা। কিন্তু তারা সে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। বৃষ্টি হলে পানি জমে যায়। তবে আগে পৌরসভা দেখাশুনা করতো। এখন তারাও সেটি করেন না।
এবিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, এটা দেখাশুনা করে পৌরসভা, কিন্তু পৌরসভা এটা নিয়ে কোনো কাজ করতে পারছে না। কারণ জায়গাটি নিয়ে আদালতের একটি মামলা রয়েছে। এজন্য খুব তাড়াতাড়ি সুনামগঞ্জে একটি আধুনিক দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

  • [১]