- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

কেন্দ্রে ব্যালট পেপার পাওয়া নিয়ে উত্তেজনা

বিশেষ প্রতিনিধি ও এনামুল হক
ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের তিনদিন পর একটি কেন্দ্র থেকে ব্যবহৃত তিন প্যাকেট ব্যালট পেপার উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সোমবার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ওই ইউনিয়নে গিয়ে উত্তেজিতদের শান্তনা দিয়েছেন। এই ইউনিয়নের ভোটগ্রহণ, ফলাফল এবং ব্যালট পেপার উদ্ধারের বিষয়টি সোমবার জেলাজুড়ে ছিল আলোচনার বিষয়।
সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন, এই ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আমানুর রাজা চৌধুরীর ভাই সেলিম রাজা চৌধুরী। আমানুর রাজা চৌধুরী ও সেলিম রাজা চৌধুরী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই অঞ্চলের রাজনৈতিক সহকর্মী প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মহারাজ রাজা চৌধুরী’র ছেলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০’এর জাতীয় নির্বাচনে ভাটি অঞ্চলে প্রচারণা চালানোর সময় মহারাজ রাজা চৌধুরীর রাজাপুর বড়বাড়ি হাটিতে এসেছিলেন।
অন্যদিকে, এই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মোকারম হোসেন ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিসের সমন্ধি। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের ঘনিষ্টজনেরা এই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীকে সহায়তা দিয়েছেন।
গত ২৮ ডিসেম্বর ৫ম ধাপের ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী মোকাররম হোসেন ৫৩ ভোট বেশি পেয়ে বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মোকারম হোসেন পান ২২৬১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিম রাজা চৌধুরী ২২০৮ ভোট।
গত রোববার বিকেলে ঘুলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে তিন প্যাকেট সীল মারা ব্যালট পেপার উদ্ধার করা হয়। ঘুলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুর রহমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ধর্মপাশা থানার ওসি ও সংশ্লিষ্ট রিটার্র্নিং কর্মকর্তার উপস্থিতিতে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে ব্যালট পেপারগুলো হস্তান্তর করেন। বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে পুরো ইউনিয়নে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নৌকার সমর্থকরা কেন্দ্রে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। আজ সোমবারও নৌকার সমর্থকরা এলাকায় ও ধর্মপাশা উপজেলা সদরে বিক্ষোভ করেন।
এদিকে, এই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিম রাজা চৌধুরী সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচনী ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ না করার লিখিত আবেদন করেছেন।
তিনি আবেদনে উল্লেখ করেছেন, নির্বাচনের আগেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট ইউনিয়নের ৪ টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে নিরাপত্তা জোরদারের আবেদন করেছিলেন তিনি। নির্বাচনের তিনদিন পর ঘুলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সীল দেওয়া ব্যালট পেপার পাওয়া গেল।
আরেকটি কেন্দ্র দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেরও ভোট পূন:গণনার দাবি জানিয়ে তিনি (সেলিম রাজা চৌধুরী) উল্লেখ করেছেন, ওই কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ৮০২, এরমধ্যে ৮ টি অবৈধ বাতিল ভোটসহ ৭৫৭ ভোট প্রদান করা হয়। যার শতকরা হার ৯৪. ৩৯ শতাংশ। কিন্তু এই কেন্দ্রে মোট ভোটের মধ্যে মৃত ও চাকুরিজীবীসহ ৫০ জন অনুপস্থিত ছিলেন। সেই হিসাবে ৭৫২ ভোটার ভোট দিতে পারেন। ভোট কাস্টিং ৭৫৭ হয়ে থাকলে, অতিরিক্ত ৫ ভোট কিভাবে মেলালেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা প্রশ্ন রেখে তিনি ভোট পূন:গণনার দাবি জানান।
দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ছিলেন মধ্যনগর জামেয়া হাতিমিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী সুপার জয়নাল আবেদীন বললেন, আমার জানামতে যতœসহকারে দায়িত্ব পালন করেছি আমরা, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে, গণনায়ও কোন ভুল হয়েছে বলে জানি না, এরপরও ভোট পূন:গণনার নির্দেশ হলে আমি সহযোগিতা করবো।
ঘুলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক তপন কান্তি তালুকদার।
প্রিজাইডিং কর্মকর্তা তপন কান্তি তালুকদার বলেন, ‘ভোটের দিন যা গণনা করে পেয়েছি তা সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, সকল প্রার্থীর এজেন্টের উপস্থিতিতে গণনা করা হয় এবং সঠিকভাবে ফলাফল দেওয়া হয়। তখন অবৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল ১৮। আমি ওইদিন (বুধবার) ব্যালটগুলো বস্তা গালা করে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে জমা দেই। কিন্তু অজ্ঞতাবসত ব্যালট থেকে গিয়েছিল কি না জানা নেই। উদ্ধার হওয়া তিন প্যাকেট ব্যালটের মধ্যে নৌকা ও ঘোড়া প্রতিকের বৈধ ব্যালট এবং চশমা প্রতিকের ১৩৭ টি ব্যালটে দ্বৈত সিল দেওয়া রয়েছে। ভোটের দিন গণনার সময় চশমা প্রতিকে দ্বৈত সিল ছিল না। ভোটের দিন যে ১৮টি ব্যালট অবৈধ ছিল তাতেও দ্বৈত সিল ছিল না। ভিন্ন কারণে সেগুলো অবৈধ ছিল।’
রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আল মাহমুদ হাছান বলেন, ‘রোববার প্রিজাইর্ডিং কর্মকর্তা ব্যালটগুলো উদ্বার করে থানা হেফাজতে রাখেন। তারপর আমাকে প্রতিবেদন দাখিল করলে আমি সে প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন পাঠাই। পরবর্তীতে নির্বাচনে যে বিধি বিধান আছে সে মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যালট ভর্তি যে বস্তা সেটি অক্ষত রয়েছে। নির্বাচনী ট্র্যাইবুনাল যদি আদেশ কওে, তাহলে আদালতের নির্দেশক্রমে বস্তা খোলা যেতে পারে।’
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ বললেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের নির্দেশে ও তার লোকজনের সহযোগিতায় ঘুলুয়া ও দৌলতপুর কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে।
সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বললেন, কিভাবে ব্যালট পেপার পাওয়া গেলে তদন্ত করে দেখা উচিৎ। ভোটের তিন- চারদিন পর এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে জামায়াত, বিএনপি বা পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরাও ঘটনা সাজাতে পারে। পরাজিত হলে নানা অজুহাত সামনে আনা হয়, আমাকে জড়ানোর বিষয়টিও উদ্দেশ্যমূলক, আমি নির্বাচনী প্রচারণায় থাকতে পারি না, ছিলামও না, ভোটের দিন এলাকায় ছিলাম না, আমাকে উদ্দেশ্যমূলক জড়ানো হয়, যারা জড়ায় তারাই এসব সাজায়, এর আগেও এমন হয়েছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বললেন, আমরা সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নে সোমবার সরেজমিনে এসেছি, সকল পর্যায়ের ভোটারদের আশ^স্ত করে বলেছি, আইন সকলের জন্য সমান, কোথাও আইনের ব্যত্যয় হবে না। কেউ যেন বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি না করেন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ব্যালট পেপার কিভাবে কেন্দ্রে এলো, কাউকে ম্যানেজ করে এটি করা হয়েছে কি-না, তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে। ফলাফল হয়ে গেছে। গেজেট হয়ে গেলে ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন ক্ষতিগ্রস্ত দাবিদাররা, ট্রাইব্যুনাল যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটি প্রতিপালন করা হবে।

  • [১]